• বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads
মালয়েশিয়ায় আতঙ্কে লাখো বাংলাদেশি শ্রমিক

ছবি : ইন্টারনেট

প্রবাস

অবৈধ প্রবাসীদের গ্রেফতারে অভিযান

মালয়েশিয়ায় আতঙ্কে লাখো বাংলাদেশি শ্রমিক

  • আহমদ আতিক
  • প্রকাশিত ১৭ জুলাই ২০১৮

অদক্ষ শ্রমিক নয়, মালয়েশিয়া এখন থেকে স্বাগত জানাবে মেধাবী বিদেশিদের। রাজনীতির ময়দানে ফিরেই আবারো প্রধানমন্ত্রী হওয়া ড. মাহাথির মোহাম্মদ এ ঘোষণা দিয়েছেন। দেশটিতে ইতোমধ্যে বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ সংক্রান্ত নীতিমালা সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্থানীয়দের কর্মসংস্থানের অধিক সুযোগ সৃষ্টির বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে চলছে বিদেশি অবৈধ শ্রমিকদের ধরপাকড়। ইতোমধ্যে গ্রেফতার হয়েছেন বহু বাংলাদেশি, আতঙ্কে রয়েছেন দেশটিতে বসবাসরত লক্ষাধিক অবৈধ শ্রমিক।

শুধু অবৈধ অভিবাসীদের ধরপাকড়ই নয়, দেশটিতে চলছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযানও। অভিযোগ রয়েছে, নাজিব প্রশাসনের সঙ্গে আঁতাতের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেওয়া হয়েছিল। এর মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকা।

দেশটিতে ২০১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয় অবৈধ অভিবাসীদের বৈধকরণ প্রক্রিয়া। একই বছরের ১৫ আগস্ট নিবন্ধনের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হয়। ২০১৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে সর্বশেষ সময় বাড়িয়ে চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত চলে নিবন্ধন প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়া শেষেই অবৈধদের আটকের জন্য ব্যাপক অনুসন্ধান শুরু করে ইমিগ্রেশন বিভাগ। আগামী ৩০ আগস্টের মধ্যে স্বেচ্ছায় নিজ দেশে ফেরত না গেলে আটকদের সর্বোচ্চ ৫০ হাজার রিঙ্গিত জরিমানা বা এক বছরের কারাদণ্ড হতে পারে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

চলতি মাসের ১ তারিখ থেকে মালয়েশিয়ায় অবৈধভাবে বসবাসরত শ্রমিকদের ধরতে ‘মেগা থ্রি-জিরো’ নামে ইমিগ্রেশন ও পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান শুরু হয়েছে। ২০১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে চালু হওয়া বৈধকরণ প্রকল্পে যেসব কর্মী ও নিয়োগকর্তা নিবন্ধন করতে ব্যর্থ হয়েছেন তাদের আটক করাই এ অভিযানের মূল লক্ষ্য। স্থানীয় এক সংবাদমাধ্যমকে মালয়েশিয়ান এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের নির্বাহী পরিচালক শামসুদ্দিন বারদান বলেন, ‘মালয়েশিয়ায় থাকা আট লাখ নিবন্ধিত শ্রমিকের মধ্যে মাত্র তিন লাখের বৈধতা রয়েছে। এর বাইরেও বহু অবৈধ বিদেশি শ্রমিক রয়েছে।’

দেশটির অভিবাসন বিভাগের মহাপরিচালক দাতুক সেরি মুস্তাফার আলি বলেছেন, মালয়েশিয়ায় অবৈধভাবে কর্মরতদের আগামী ৩০ আগস্টের মধ্যে ‘থ্রি প্লাস ওয়ান’-এর আওতায় আউটপাস সংগ্রহ করে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে নিয়োগকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত ৫৩৬ মালয়েশীয় নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ৯ হাজার ৮৫৪ অবৈধ অভিবাসীকে বিচারের সম্মুখীন করা হয়েছে। আটক অভিবাসীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ইন্দোনেশিয়ান। এরপরই রয়েছে বাংলাদেশ, ফিলিপাইন ও মিয়ানমার থেকে যাওয়া শ্রমিকরা।

দেশটির সরকারি নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সমুদ্রপথে অনুপ্রবেশকারীরা বৈধতা পাবেন না। যারা স্টুডেন্ট ভিসায় মালয়েশিয়ায় গিয়ে পড়াশোনা বাদ দিয়ে চাকরিতে ঢুকেছে তারাও বৈধতা পাবেন না। এ ছাড়া যারা সিক্স-পিতে রেজিস্ট্রেশন করেছেন এবং অনলাইন হয়েছে তারাও বৈধতা পাবেন না। নতুন এক নিয়মে বলা হয়েছে, মালয়েশিয়ায় কোনো প্রবাসী ১০ বছরের বেশি ভিসা পাবেন না। ইতোমধ্যে যারা ১১ ও ১২তম ভিসা (স্টিকার) পেয়েছেন সেগুলোও বাতিল করেছে দেশটির ইমিগ্রেশন বিভাগ।

স্থানীয় গণমাধ্যমকে বাংলাদেশি শ্রমিকদের বিষয়ে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ-বিষয়ক মন্ত্রী এম কুলাসেগারান বলেন, ‘প্রবাসী এক বাংলাদেশি ব্যবসায়ীর নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগসাজশে শ্রমিকদের কাছ থেকে দুই বছরে অন্তত ২০০ কোটি রিঙ্গিত হাতিয়ে নিয়েছে। এ অভিযোগ ওঠার পর ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে ১৫ লাখ শ্রমিক নেওয়ার বিষয়ে যে সমঝোতা চুক্তি সই হয়েছিল তা স্থগিত করে রিভিউর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ওই চক্রের বিষয়ে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই স্থগিতাদেশ বহাল থাকবে।’

প্রবাসী ও দূতাবাস-সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মালয়েশিয়ায় ৮-৯ লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মী রয়েছেন। তবে কতজন অবৈধ শ্রমিক রয়েছেন, তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। মালয়েশিয়া-বাংলাদেশ কমিউনিটি প্রেস ক্লাবের সভাপতি এসএম রহমান পারভেজ জানান, মালয়েশীয় সরকারের সব শর্ত পূরণের পর অবৈধদের মধ্যে ১০ শতাংশের বেশি বাংলাদেশি ‘বৈধতা’ পাবে না।

এদিকে মেগা-থ্রি অভিযান শুরুর পর বাংলাদেশি, পাকিস্তানি, ভারতীয় ও মালয়েশিয়ান প্রায় ১০০ প্রতারক এজেন্টের তালিকা তৈরি করেছে মালয় অভিবাসন বিভাগ। জানা গেছে, মালয়েশিয়া সরকার অবৈধ কর্মীদের বৈধ করার জন্য দুটি প্রোগ্রাম চালু রেখেছিল। এর একটি রি-হায়ারিং প্রোগ্রাম, অন্যটি ই-কার্ড। এই দুটি প্রোগ্রামকে ঘিরে দেশটিতে গড়ে ওঠে শক্তিশালী একাধিক প্রতারকচক্র। বৈধ করে দেওয়ার নামে জনপ্রতি ৫ থেকে ১০ হাজার রিঙ্গিত হাতিয়ে নিয়েছে প্রতারকরা। যদিও জনপ্রতি সরকারিভাবে ১২০০ রিঙ্গিত জমা দিতে হতো। কিন্তু প্রতারকচক্রের ফাঁদে পড়ে অনেকেই বিরাট অঙ্কের অর্থ দিয়েও বৈধ হতে পারেননি।

মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের অভিযোগ, রি-হায়ারিং প্রকল্পের সুযোগ নিতে দূতাবাসে নতুন পাসপোর্টের আবেদন করার কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও তা হাতে পাননি অনেক বাংলাদেশি শ্রমিক। আবার পাসপোর্ট থাকলেও দালালচক্রের প্রতারণায়ও রি-হায়ারিংয়ের সুযোগ নিতে পারেননি অনেকে। এ অবস্থায় যেকোনো সময় দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হওয়ার আতঙ্কে রয়েছেন তারা।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে হাইকমিশনের শ্রম কাউন্সিলর মো. সায়েদুল ইসলাম জানান, দীর্ঘ আড়াই বছর মালয়েশিয়া সরকার সময় দিয়েছে। দূতাবাসের পক্ষ থেকে হাইকমিশনার শহীদুল ইসলামের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় এবং ইমিগ্রেশনের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে এতদিন সময় বাড়ানো হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘দূতাবাস থেকে সবসময় বলে দেওয়া হয়েছে কেউ যেন তথ্য গোপন না করে। তথ্য গোপন করলেই তার পাসপোর্ট পেতে সমস্যা সৃষ্টি হবে। এ ছাড়া দালালের শরণাপন্ন না হওয়ার জন্যও বলা হয়েছিল। অবৈধ যারা আটক হয়েছেন তাদের দেশে ফেরত যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।’

রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) পরিচালক ড. সি আর আবরার বলেন, নতুন করে রি-হায়ারিংয়ের সময় আরো বাড়ানো যায় কি না- এজন্য সরকারকে কূটনৈতিকভাবে চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads