• বুধবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১১ আশ্বিন ১৪২৫
ads

বাংলাদেশ

নিরাপদ পানির সঙ্কটে দেশ

  • রানা হানিফ ও নাজমুল হুসাইন
  • প্রকাশিত ২২ মার্চ ২০১৮

জীবনের জন্য বিশুদ্ধ পানি অপরিহার্য। কিন্তু দেশের বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া পানি শতভাগ নিরাপদ নয়। পরিশোধন বা ফুটিয়ে তা খাবার উপযোগী করতে হয়। স্বাধীনতার ৪৬ বছরেও বিশুদ্ধ পানির সঙ্কটে মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে দেশের অধিকাংশ মানুষ। 

নিরাপদ পানির সঙ্কটের জন্য অধিকাংশ মানুষই দেশের রাষ্ট্রীয় সেবা সংস্থাগুলেকে দুষছে। অনেকের অভিযোগ, সংস্থাগুলোর অবহেলা, নজরদারির অভাব, অপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত ও দুর্নীতির কারণে খাবার পানি নিয়ে এত দুশ্চিন্তায় পড়তে হচ্ছে নাগরিকদের।

দেশের উপকূলে লবণাক্ততা, উত্তরাঞ্চল-দক্ষিণাঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানিতে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিকের উপস্থিতি এবং শহরাঞ্চলে রাষ্ট্রীয় সেবা সংস্থার সরবরাহ করা পানিতে ব্যাকটেরিয়াসহ ক্ষতিকর-জীবাণুর উপস্থিতির কারণে নাগরিক জীবন হুমকিতে পড়েছে। সেবা সংস্থাগুলো স্বীকার না করলেও বিভিন্ন গবেষণায় ভয়াবহ তথ্য পাওয়া যায়।

১৯৬৩ সালে ঢাকাবাসীর সুপেয় পানি ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে গঠন করা হয় ঢাকা পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ বা ঢাকা ওয়াসা। ওয়াসার সরবরাহ করা পানিও পানের উপযোগী করতে ব্যয় হয় বাড়তি অর্থ। গবেষণায় দেখা গেছে, ওয়াসার উৎপাদিত পানি গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছাতে তিন ধাপে দূষিত হচ্ছে। আর এ পানি সুপেয় করতে ফোটাতে বা বিভিন্ন পরিশোধন পদ্ধতির প্রয়োজন হয়।

২০১১ সালে জার্নাল অব ইনভারমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ন্যাচারাল রিসোর্সের (ইএসএনআর) এক গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ঢাকা ওয়াসার পানির নমুনা পরীক্ষা করে দেখা গেছে, বাসাবাড়ি পর্যায়ের ৬২ শতাংশ ট্যাপ, ৬০ শতাংশ সরবরাহ লাইন ও ৪৫ দশমিক ৫ শতাংশ উৎপাদন পাম্পের পানি আন্তর্জাতিক মাননিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা (আইএসও) ১২৪০:২০০১ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্ধারিত সুপেয় পানির মান রক্ষা করতে পারেনি।

বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) খাদ্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা খন্দকার রায়হান মাহবুব ও মঞ্জুর মোর্শেদ আহমেদ এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনোলজি ও জেনেটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক এ নাহার ও সহকারী অধ্যাপক অনিন্দিতা চক্রবর্তী ওই গবেষণাটি করেন।

গবেষণায়, ঢাকা ওয়াসার বিভিন্ন পাম্প, সরবরাহ পাইপ ও বাসাবাড়ির পানির ট্যাপ থেকে ৪৫টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়। নমুনাগুলো বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা শেষে দেখা যায়, ৫৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ পানিতে কলিফর্ম ও ৫১ দশমিক ১১ শতাংশ নমুনায় ই-কোলি ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি রয়েছে।

তবে নগরবাসীর বিশুদ্ধ পানির চাহিদা পূরণে ওয়াসা বর্তমানে শতভাগ সফল বলে দাবি করছেন সংস্থাটির পরিচালনা পরিষদের সদস্য ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন। তিনি বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘পুরান ঢাকার কয়েকটি এলাকা বাদে ওয়াসার আওতাধীন সব এলাকায় চাহিদার শতভাগ পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। পানির মান নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। বর্তমান সরকারের আমলে ওয়াসার যত উন্নয়ন হয়েছে, তা আগে কখনো হয়নি।’

ওয়াসার কার্যক্রমের সমালোচনা করে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের খান বলেন, ওয়াসা পানি সরবরাহ করছে, এটা সত্য। কিন্তু সুপেয় পানি সরবরাহ করতে পারছে না। তারা বলতে পারবে না, কোন অঞ্চলের বাসিন্দা সরবরাহকৃত পানি সরাসরি পান করতে পারছে? ওয়াসা যে পানি দিচ্ছে, তা সুপেয় করতে হয়, ফোটাতে হচ্ছে, না হয় অন্য প্রক্রিয়ায় পরিশোধন করে নিতে হচ্ছে। আর গ্রীষ্মের শুরুতেই রাজধানীর অনেক অঞ্চলে পানির চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ হচ্ছে না।

সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ঢাকার ফুটপাথ, বাসাবাড়ি, এমনকি অফিস-আদালতে সরবরাহ করা ৯৭ ভাগ জারের পানিতে রয়েছে ক্ষতিকর উপাদান। এসব পানিতে আর্সেনিক ব্যাকটেরিয়াসহ মানুষ ও প্রাণীর মলের জীবাণু কলিফর্মের উপস্থিতি রয়েছে।

শুধু জারের পানি নয়, বাজারে থাকা বিভিন্ন কোম্পানির বোতলজাত পানিতেও বিএসটিআই নির্ধারিত মান না পাওয়া যায়নি বলে ওই গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। সেখানে বলা হয়, দেশে বাজারজাত শতভাগ বোতলের গায়ে নির্দেশিত উপাদানের মাত্রায় অসামঞ্জস্য রয়েছে। এ ছাড়া বাজারে বিক্রি হওয়া প্লাস্টিকের বোতলের পানি ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করে সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) এক গবেষণা প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, বিশ্বের জনপ্রিয় মিনারেল পানির বোতলে ৯০ শতাংশে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্রেডোনিয়ার স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কের গবেষকরা ওই প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. একেএম মোস্তফা বলেন, ‘দূষিত পানি পানে ডায়রিয়া থেকে শুরু করে ক্যানসার পর্যন্ত হতে পারে। আর সম্প্রতি দেশে ডায়াবেটিস ও কিডনি রোগী বাড়ার পেছনেও দূষিত পানিই দায়ী।’

তিনি বলেন, ‘দূষিত পানি শরীরে টক্সিন (বিষাক্ত পদার্থ) জমা করছে, যা বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়। এতে ইদানীং কিডনি, পাকস্থলী ও যকৃতের অনেক রোগ বেড়ে গেছে।’

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) শর্ত অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের সব মানুষের জন্য নিরাপদ পানির নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের দাবি অনুয়ায়ী, বর্তমানে দেশের শহরাঞ্চলে শতকরা ৯৮ ভাগ মানুষ নিরাপদ পানির সুবিধা পাচ্ছে। তবে ওই দাবি নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে।

রাষ্ট্রীয় সেবা সংস্থার সরবরাহ করা পানিতেও আস্থা না থাকায় শহরাঞ্চলে বোতল বা জারের পানির ব্যবসা বেড়েছে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নজরদারি না থাকায় পানির রমরমা ব্যবসা করছেন অসাধু ব্যবসায়ীরাও। যথাযথ পরিশোধন বা কোনো মানের ধার না ধেরে তারা বাজারে পানি সরবরাহ করছেন।

বিএসটিআই, ওয়াসা, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, পরিবেশ মন্ত্রণালয়, শ্রম মন্ত্রণালয় ও সিটি করপোরেশনের অবহেলার কারণে ব্যবসার অনুমতি প্রতিষ্ঠানগুলোও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করছে না।

ঢাকার বাড্ডার ভাটারা এলাকায় দীর্ঘদিন বিএসটিআইয়ের অনুমোদন নিয়ে পানি বিক্রি করে আসছিল ‘এ ওয়ান ড্রিংকিং ওয়াটার’। গত মাসে র্যাবের একটি ভ্রাম্যমাণ আদালত ওই কারখানায় অভিযান চালয়। সেখানে পরিশোধনের ব্যবস্থা থাকলেও সরাসরি ওয়াসার পানি জারে ভরে বাজারজাত করা হয়। একই এলাকায় আরেকটি লাইসেন্সধারী ‘ওসামা ড্রিংকিং ওয়াটার’ কারখানায়ও একই ঘটনা চোখে পড়ে। সেখানেও পানি পরীক্ষার ল্যাব থাকলেও তার কার্যকারিতা ছিল না। ছিল না কোনো কেমিস্টও। কারখানার ব্যবস্থাপক সাইদুল ইসলামই কিছু লোক নিয়ে সব কার্যক্রম পরিচালনা করেন। আর এ দুই কারখানায় অভিযানের খবর পেয়ে পাশের এলাকার আরেক লাইসেন্সধারী ‘ক্রিস্টাল ড্রিংকিং ওয়াটার’ কারখানা বন্ধ করে মালিক ও কর্মচারীরা পালিয়ে যান। পরে যন্ত্রপাতি ধ্বংস করে কারখানাটি সিলগালা করা হয়।

দীর্ঘদিন ধরে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছেন র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম। তিনি বলেন, ‘শর্তসাপেক্ষে বিএসটিআইয়ের অনুমোদন নিয়েও অনেক কোম্পানি তা পরিপালন করে না। তাদের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ল্যাব থাকলেও তা ব্যবহার হয় না। আবার যে জারে পানি দেয়, সেগুলোও ফুড গ্রেডেড না। আর বেনামি প্রতিষ্ঠানের অবস্থা আরো করুণ। সবমিলে আমার মনে হয় দেশে বিক্রীত ৭০ শতাংশের বেশি পানি দূষিত।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা শহরের পানির সমস্যা সমাধানে ওয়াসা তিনটি মেগা প্রকল্পের কাজ করছে। মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সংস্থাটির মোট চাহিদা ৩১৫ কোটি ২০ লাখ লিটারের বিপরীতে ১৯৪ কোটি ৫ লাখ লিটার পানি ভূ-উপরিস্থিত উৎস থেকে উৎপাদন করার পরিকল্পনা রয়েছে। ২০৩০ সালে মেঘনা পানিশোধনাগার-২ ও পদ্মা পানিশোধনাগার-২-এর মাধ্যমে অতিরিক্ত ৯৫ কোটি লিটার পানি উৎপাদনের পরিকল্পনা করেছে। ফলে ওই সময় মোট চাহিদা ৪৩৮ কোটি ৩০ লাখ লিটারের বিপরীতে ভূ-উপরিস্থিত উৎস থেকে মোট ২৮৯ কোটি ৬০ লাখ লিটার পানি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। আর ২০৩৫ সালে মোট চাহিদা ৫২৬ কোটি ৮০ লাখ লিটারের বিপরীতে গভীর নলকূপের মাধ্যমে ১২৬ কোটি লিটার এবং গাদনাইল, সোনাকান্দা, চাঁদনীঘাট পানি পরিশোধনাগার, সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার-১, ২, ৩, পদ্মা পানিশোধনাগার প্ল্যান্ট-১, ২ এবং মেঘনা পানিশোধনাগার-১, ২, ৩-এর মাধ্যমে মোট ৩৩৯ কোটি ৬০ লাখ লিটার পানি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads