• বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ৩০ কার্তিক ১৪২৫
ads

ছবি: বাংলাদেশের খবর

বাংলাদেশ

বেকারের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক থামছে না

  • মো. জাহিদুল ইসলাম
  • প্রকাশিত ০৩ মে ২০১৮

২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের ইশতেহারে দেশে ২ কোটি ৮০ লাখ বেকার রয়েছে বলে দাবি করেছিল আওয়ামী লীগ। ওই সময় কর্মক্ষম মানুষের ৪০ শতাংশই ছিল কর্মহীন। প্রতি ঘরের একজনকে চাকরি দিয়ে ২০১৩ সালে এ সংখ্যা ২ কোটি ৪০ লাখে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি ছিল। ২০২১ সালে তা দেড় কোটিতে নামিয়ে আনার কথা বলা হয়েছিল ইশতেহারে। সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ হলে স্বাধীনতার ৫০ বছরে বেকারত্বের হার নেমে আসার কথা ছিল ১৫ শতাংশে। তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিচালিত ২০১০ সালের শ্রমশক্তি জরিপে বেকারত্বের হার দেখানো হয় ৪ দশমিক ৬০ শতাংশ। অর্থাৎ বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ। এক বছরের ব্যবধানে উধাও হয়ে যায় ২ কোটি ৫৪ লাখ বেকার। ওই সময় পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবেদনটি ব্যাপক সমালোচনার সম্মুখীন হয়। বেকারত্বের হার নিয়ে শুরু হওয়া এ বিতর্কের অবসান হয়নি গত আট বছরেও।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিসংখ্যানের বিভিন্ন পদ্ধতির তারতম্যের কারণে তথ্যের এই বিভ্রান্তি। পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছর শেষে দেশে কর্মক্ষম (১৫ থেকে ৬৫ বছর বয়সী) মানুষের সংখ্যা দাঁড়ায় ১০ কোটি ৯০ লাখ ৫৪ হাজারে। এর মধ্যে শ্রমবাজারে যুক্ত আছেন ৬ কোটি ৩৫ লাখ ৪ হাজার মানুষ। গত অর্থবছর কোনো-না-কোনো কাজে নিয়োজিত ছিলেন ৬ কোটি ৮ লাখ ২৮ হাজার মানুষ। এ হিসাবে বেকারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৬ লাখ ৭৬ হাজারে। শ্রমশক্তির ১৪ লাখ ৬৫ হাজার জন পূর্ণকালীন কাজ পাচ্ছেন না। খণ্ডকালীন ও পূর্ণকালীন মিলে দেশে বেকার আছেন ৪১ লাখ ৪১ হাজার মানুষ। অবশ্য আরো ৪ কোটি ৫৫ লাখ ৪৯ হাজার কর্মক্ষম মানুষ শ্রমবাজারের বাইরে আছেন। উপযুক্ত কাজের অপেক্ষায় তারা। শ্রমবাজারের বাইরে থাকা জনসংখ্যা যোগ করলে কর্মহীনের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪ কোটি ৯৬ লাখ ৯০ হাজারে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বেকারত্ব দূরীকরণকে প্রাধান্য দিয়ে সরকার প্রশংসনীয় কিছু কাজ করছে। পাশাপাশি জনশক্তির দক্ষতা উন্নয়নে বাস্তবায়িত হচ্ছে বেশ কিছু প্রকল্প। তবে কর্মহীন মানুষের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক থাকায় সরকারের এসব উদ্যোগ সফলতার মুখ দেখছে না। তারা বলছেন, প্রকৃত বেকার ২৭ লাখের কাছাকাছি থাকলে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার কিছু থাকত না। তবে শ্রমবাজারের বাইরে থাকা মানুষের সংখ্যা উদ্বেগজনক। প্রকৃত পরিস্থিতি বিবেচনায় দক্ষতা উন্নয়ন ও বেকারত্ব নিরসনের কর্মপরিকল্পনা নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তারা।

পরিসংখ্যান ব্যুরো জানায়, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) নিয়ম মেনেই শ্রমশক্তি জরিপ পরিচালনা করা হচ্ছে। সংস্থার রীতি অনুযায়ী, জরিপ পরিচালনার সময়ের পূর্ববর্তী সাত দিনের মধ্যে মাত্র এক ঘণ্টা অর্থনৈতিক কাজে যুক্ত থাকলেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে কর্মে নিয়োজিত ধরা হয়েছে। কোনো মজুরি বা আর্থিক লাভ না থাকলেও এ সময়ে মাত্র এক ঘণ্টার জন্য পরিবারের কোনো কাজ করলেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বেকার বলে গণ্য হবেন না। তাছাড়া পূর্ববর্তী এক মাস কাজের সন্ধান করেনি এমন জনশক্তিও নেই বেকারের তালিকায়। এ মানদণ্ডের কারণেই দেশে বেকারের সংখ্যা কম বলে দাবি করছে সংস্থাটি।

এ বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মীর্জ্জা আজিজুল ইসলাম বাংলাদেশের খবরকে বলেন, আইএলও’র বিধান মেনে দেশে বেকারের সংখ্যা নির্ধারণ করা যৌক্তিক হবে না। কারণ উন্নত দেশে বেকারদের ভাতা দেওয়া হয়ে থাকে। তাছাড়া যারা কাজ খোঁজেন তাদেরও বিভিন্ন ধরনের সুবিধা দেওয়া হয়ে থাকে। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর যাদের কোনো কাজ নেই তাদেরকে বেকারের অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য ড. শামসুল আলম বলেন, গত কয়েক বছরে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বড় ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর সুফলও মিলছে। বর্তমানে মানসম্পন্ন কর্মসংস্থানে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি বাড়লে ছদ্ম বেকারের সংখ্যা কমে আসবে বলেও তিনি মনে করেন।

এ বিষয়ে রফতানিকারকদের সংগঠন এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, বেকার সমস্যা দিন দিন তীব্র আকার ধারণ করছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা শিক্ষিত বেকার। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মমুখী শিক্ষা প্রদান না করায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

সূত্র জানায়, ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকার গঠনের পর প্রথম বাজেটে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত কর্মসংস্থান সৃষ্টির মহাপরিকল্পনা ঘোষণা করেছিলেন। গ্যাস ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতির পাশাপাশি ব্যাংকঋণের সুদ কমিয়ে বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টির কথা বলেছিলেন তিনি। অবকাঠামো খাতে পদ্মা বহুমুখী সেতু, মেট্রোরেল, বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সড়কের উন্নতি হলে কর্মসংস্থান বাড়বে বলে তিনি দাবি করেছিলেন।

একই সময়ে কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা) কর্মসূচি, একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প, ন্যাশনাল সার্ভিসসহ বেশ কিছু প্রকল্পের ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি। প্রথম বাজেটেই মানবসম্পদ উন্নয়নে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল ৩৪ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। এর পরের প্রতি বছরই মানবসম্পদে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রথম বাজেটে অর্থমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতির বেশ কিছু প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে। বাস্তবায়নের পথে রয়েছে কিছু। তবে তেমন উন্নতি হয়নি কর্মসৃজনে।

জানা যায়, দেশের জনগোষ্ঠীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরে ২০১২ সালে ন্যাশনাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট পলিসি নেয় সরকার। এরই অংশ হিসেবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে স্কিল ফর এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কর্মসূচি বাস্তবায়নের কাজ চলছে। এই প্রকল্পের আওতায় পাঁচ লাখ বেকার যুবককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। পর্যায়ক্রমে প্রশিক্ষণার্থীর সংখ্যা উন্নীত হবে ১২ লাখে।

বেকারত্ব দূর করার পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ উন্নয়ন শীর্ষক পৃথক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রায় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে চলমান প্রকল্পের আওতায় ৯৩টি পলিটেকনিক প্রতিষ্ঠানের ১ লাখ ২০ হাজার গরিব শিক্ষার্থীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ইলেকট্রিক্যাল, অটোমোবাইল, গার্মেন্টসহ মোট ৩৮ খাতে কর্মমুখী প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।

বিবিএসের জরিপে দেখা গেছে, শ্রমবাজারের বাইরে থাকা জনশক্তির বড় একটা অংশ তরুণ। অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে এই জনগোষ্ঠীকে কাজের সুযোগ করে দিতে হবে। দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে এ লক্ষ্য অর্জন নিশ্চিত হতে পারে। তবে কর্মসংস্থানে নিয়োজিত জনশক্তির ৯৮ দশমিক ৩০ শতাংশের কোনো প্রশিক্ষণ নেই। কোনো-না-কোনো প্রশিক্ষণ নিয়েছেন মাত্র ১ দশমিক ৭০ শতাংশ মানুষ। 

এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) গবেষণা ফেলো ড. তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও শ্রমবাজারে নিয়োজিত নেই এমন জনশক্তির জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিচ্ছে। তাছাড়া কৃষি খাতের আকার বিবেচনায় বেশি শ্রমিক থাকায় তারা পূর্ণকালীন কাজ পাচ্ছেন না। এ সমস্যার সমাধানে শিল্প খাতের প্রসার বাড়িয়ে উদ্বৃত্ত শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিতের পরামর্শ দেন তিনি।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads