• বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ৩০ কার্তিক ১৪২৫
ads

মৃত্যদণ্ডের ব্যাখ্যায় হাই কোর্ট

অপরাধ

মৃত্যুদণ্ডের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যায় হাই কোর্ট

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ২৮ নভেম্বর ২০১৭

পিলখানা হত্যাকাণ্ডের মামলার রায়ে ১৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখার পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক আসামির সর্বোচ্চ সাজার আদেশের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে হাই কোর্টের পর্যবেক্ষণে।

এ মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানির রায়ে গত সোমবার আরো ১৮৫ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে হাই কোর্ট; ২২৮ জনকে দেওয়া হয়েছে তিন থেকে ১০ বছরের সাজা।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি সংখ্যার দিক দিয়ে দেশের ইতিহাসে এটাই সবচেয়ে বড় মামলা। দুদিন ধরে রায় ঘোষণার বিষয়টিকেও ‘বিরল ঘটনা’ হিসেবে দেখছেন আইনজীবীরা।

হাই কোর্টের বৃহত্তর এই বেঞ্চ রায় পড়া শুরু করে রোববার সকালে।  বেঞ্চের তিন সদস্য বিচারপতি মো. শওকত হোসেন, বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী ও বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ২০০৯ সালে সীমান্তরক্ষী বাহিনীতে বিদ্রোহের সেই ঘটনা এবং মামলার বিভিন্ন দিক নিয়ে আদালতের পর্যবেক্ষণগুলো তুলে ধরেন দুদিন ধরে।  রায়ের মূল আদেশের অংশ (সাজা ঘোষণা) পড়া হয় সোমবার বিকালে।

বেঞ্চের কনিষ্ঠ বিচারক নজরুল ইসলাম তালুকদার তার পর্যবেক্ষণে হত্যা, ধর্ষণ, গুপ্তচরবৃত্তি, বিশ্বাসঘাতকতা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তির যৌক্তিকতা তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে বিশ্বের অনেক দেশ সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডকে সমর্থন না করলেও বেসামরিকদের অপরাধ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে তা বড় ভূমিকা রাখে।

“নিষ্ঠুরতম শাস্তি বিবেচনায় কিছু উন্নত দেশসহ বিশ্বের প্রায় ১৪০টি দেশ তাদের বিচারিক ব্যবস্থা থেকে সর্বোচ্চ শাস্তিকে বাদ দিয়েছে।  সেসব দেশের অভিমত হল, সর্বোচ্চ শাস্তির মাধ্যমে মানুষের জীবনে কোনো ইতিবাচক প্রভাব পড়ে না এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে পারে না।  কিছু মানবাধিকার কর্মী মনে করেন, মৃত্যুদণ্ডে মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়।  কিন্তু এখনও অনেক উন্নত দেশসহ কিছু দেশ, যেমন- যুক্তরাজ্য, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়া হত্যা, গুপ্তচরবৃত্তি, বিশ্বাসঘাতকতা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে প্রাণদণ্ডের বিধান রেখেছে।”

পর্যবেক্ষণে হাই কোর্ট বলেছে, দেশ ও দেশের বাইরে অপরাধীরা যেসব অপরাধ করছে- তা উদ্বেগজনক ও ভয়ানক।  এ কারণে দেশ ও দেশের বাইরে মৃত্যুদণ্ড যথাযথ শাস্তি হিসেবে প্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

“আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, নাগরিকদের আইন মেনে চলা এবং বেআইনি কর্মকাণ্ড বন্ধে ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট নাগরিকদের সতর্ক করে।  এই শাস্তি আরো বার্তা দেয় যে, যদি কোনো ব্যক্তি ফৌজদারি অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে তাকে মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হতে হবে।”

কেউ যদি অনৈতিকভাবে কাউকে হত্যা করে, তাহলে তাকে সর্বোচ্চ সাজা দেওয়ার বিরুদ্ধে কোনো যুক্তি থাকতে পারে না বলে অভিমত তুলে ধরেন বিচারপতি নজরুল।

পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি পর্যক্ষেণে বলেন, “এ ঘটনায় হত্যাকারী জীবন কেড়ে নিয়েছে অনৈতিকভাবে। এ মামলায় হত্যা ও ধর্ষণের মত মারাত্মক অপরাধ রয়েছে, যে কারণে সর্বোচ্চ শস্তি তাদের প্রাপ্য।”

২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পিলখানায় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিডিআরের সদর দপ্তরে বিদ্রোহের ওই ঘটনায় ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনের প্রাণ যায়।  সেই ঘটনা পুরো বিশ্বে আলোড়ন তোলে।

বিচারপতি নজরুল ইসলাম তালুকদার বলেন, যেসব দেশ মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছে, সেখানে অপরাধ প্রতিরোধে প্রাণদণ্ডের বিধান একটি ‘প্রয়োজনীয় অংশ’।

“এটা খুব স্বাভাবিক যে, একজন হত্যাকারীর প্রাণদণ্ড দিলে ন্যায়বিচার হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।  এর মাধ্যমে দেশের মানুষের কাছে বার্তা যাবে যে, এ জাতীয় অপরাধ করলে এর প্রতিফল হিসেবে সর্বোচ্চ শস্তি ভোগ করতে হবে।

“আর যিনি বা যারা আইনকে মান্য করেন, রাষ্ট্রের দায়িত্ব হল তাদের এবং প্রত্যেক নাগরিককে নিরাপত্তা দেওয়া। তাই সর্বোচ্চ শাস্তির মাধ্যমে হত্যাকারীদের হাত থেকে সমাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।”

রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, আট বছর আগে সীমান্তরক্ষী বাহিনীতে সংঘটিত বিদ্রোহের পেছনে ছিল ‘স্বার্থান্বেষী মহলের ষড়যন্ত্র।’

জজ আদালতের মত হাই কোর্টও বলেছে, ন্যায্যমূল্যে পণ্যবিক্রির মত কাজে সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে জড়ানো ঠিক হয়নি।

সেই সঙ্গে কর্মকর্তা ও সৈনিকদের মধ্যে পেশাদারিত্বের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা, অধস্তনদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক মানসিকতার পরিবর্তন এবং তাদের কোনো ক্ষোভ থাকলে তার প্রশমনের তাগিদ এসেছে হাই কোর্টের রায়ে।

বিদ্রোহের আগে গোয়েন্দারা কেন তথ্য দিতে ব্যর্থ হয়েছিল- তাও তদন্ত করে দেখার সুপারিশ করেছে হাই কোর্ট।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads