• শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads
মাদক সম্রাটদের সেকেন্ড হোম সৌদি?

মাদক সম্রাটদের সেকেন্ড হোম সৌদি?

সংগৃহীত ছবি

অপরাধ

মাদক সম্রাটদের সেকেন্ড হোম সৌদি?

  • আজাদ হোসেন সুমন ও উখিয়া প্রতিনিধি
  • প্রকাশিত ০২ জুন ২০১৮

মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান শুরুর পরপরই আত্মগোপনে চলে যান এর কারবারিরা। গত ১৫ মে সারা দেশে একযোগে মাদকবিরোধী এ অভিযান শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। চলমান এ অভিযানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন ১২৪ মাদক ব্যবসায়ী। গ্রেফতার হয়েছেন প্রায় ১৫ হাজার। অভিযোগ উঠেছে, মাদকের ‘গডফাদার’ বা নিয়ন্ত্রকদের কেউ ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত বা গ্রেফতার হয়নি। এ অবস্থায় প্রাণভয়ে দেশ ছাড়তে শুরু করেছেন বড় মাদক ব্যবসায়ীরা। কেউ কেউ যাচ্ছেন গোপনে, কেউ সরকারের নাকের ডগায় প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে। এ ক্ষেত্রে তারা বেছে নিয়েছেন সৌদি আরবকে। দেশটি যেন তাদের সেকেন্ড হোম বা সেফজোনে পরিণত হয়েছে। এর আগে মাঝারিগোছের মাদক কারবারিদের অনেকে গোপনে তাবলিগ জামাতে শরিক হয়ে মসজিদ থেকে মসজিদে ‘দ্বীনের’ কাজে ঘুরছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পবিত্র রমজানে সৌদি আরবের ভিসা পাওয়া সহজ। বিভিন্ন এজেন্সির মাধ্যমে ওমরা ভিসা নেওয়া যাচ্ছে অনায়াসে। তাই মাদক ব্যবসায়ীরা আপাতত ওই দেশটিকেই বেছে নিচ্ছেন তাদের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে। সেখানে তারা মিলিত হয়ে সিন্ডিকেট গড়ে নিজেদের রক্ষা ও ব্যবসা চালানোর চেষ্টা করছেন বলেও তাদের ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে। গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত ইয়াবা ব্যবসাসংশ্লিষ্ট যেসব ব্যক্তির সৌদি আরব যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন মাদকের গডফাদার ও পৃষ্ঠপোষক হিসেবে পরিচিত কক্সবাজার-৪ আসনের (উখিয়া-টেকনাফ) সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি সপরিবারে, কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার রাজাপালং ইউনিয়নের জাদিমোরা এলাকার আকবর হোসেনের ছেলে কবির আহাম্মদ, (এলাকায় ইয়াবা কবির নামে পরিচিত), টেকনাফের ৫ নম্বর বাহারছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মৌলভি আবদুল আজিজ ও তার ছোট ভাই ইয়াবা গডফাদার মৌলভি রফিক। এর বাইরেও আরো কয়েকজন চিহ্নিত ইয়াবা ব্যবসায়ী সৌদি আরবে গেছেন বলে জানা গেছে। এ ছাড়া উখিয়ার ঘিলাতলী গ্রামের আজিজুর রহমান মামুন ওরফে ইয়াবা মামুন পালিয়ে গেছেন ভারতে।

এমপি বদি : আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাদকবিরোধী অভিযানের পর থেকে এমপি বদিকে নিয়ে আলোচনা শুরু হয় সর্বত্র। এ অবস্থায় অভিযানের মধ্যেই ওমরা পালনের উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়লেন তিনি। গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে একটি বেসরকারি বিমানে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে সৌদি আরবের উদ্দেশে পাড়ি জমান তিনি। বদির সফরসঙ্গী হিসেবে সৌদি আরব গেছেন মেয়ে, মেয়ের জামাই, বন্ধু আকতার কামাল ও নূরী নামে একজন মাওলানা। ওইদিনই মাদকবিরোধী অভিযানের কারণে দেশত্যাগ কি না- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্ন উড়িয়ে দিয়ে বদির ব্যক্তিগত সহকারী হেলাল উদ্দিন বলেন, তিনি অনেক আগেই ওমরা পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। নিয়ম অনুযায়ী তিনি যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতিও নিয়েছেন।

উখিয়ার ইয়াবা কবির : বাসে খিলি পান বিক্রি করে সংসার চালাতেন কবির আহাম্মদ। কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার রাজাপালং ইউনিয়নের জাদিমোরা এলাকার আকবর হোসেনের সেই ছেলে এখন কোটিপতি। বিলাসবহুল বাড়ি-গাড়ি, জায়গা-সম্পত্তি কোনো কিছুরই কমতি নেই তার। ইয়াবা ব্যবসা করে মাত্র পাঁচ বছরেই গড়েছেন পাহাড়সম সম্পদ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত এ মাদক ব্যবসায়ী এলাকায় পরিচিত ইয়াবা কবির হিসেবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চলমান মাদকবিরোধী অভিযান থেকে রক্ষা পেতে এই মাদক সম্রাট সম্প্রতি দেশ ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছেন সৌদি আরব। ইয়াবা ব্যবসা দেখভাল করছেন তার স্ত্রী সাবেকুন্নাহার।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, যাত্রীবাহী বাসে পান বিক্রি করতে করতে একপর্যায়ে মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন কবির। টেকনাফের শীর্ষ ইয়াবা কারবারিদের সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে। যুক্ত হন সিন্ডিকেটে। তার নীলনকশায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যেতে শুরু করে মরণনেশা ইয়াবা। ইয়াবার কালো টাকায় নামে-বেনামে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে কোটি কোটি টাকার জমি কিনেছেন তিনি। একাধিক গাড়ি, বাড়ি, বিকাশ এজেন্টসহ পাহাড়সম সম্পদ গড়েও ক্ষান্ত হননি ইয়াবা কবির। ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে রাজাপালং মাদরাসার যাত্রীছাউনির পাশে সরকারি খাসজমি দখল করে নির্মাণ করছেন বিশাল বাড়ি। ১০-তলা ভিত্তির এই বাড়ির নাম দিয়েছেন স্বর্ণকমল। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, খুলনার একসময়ের ত্রাস এরশাদ সিকদারের স্বর্ণকমলকেও হার মানাবে এটি।

স্থানীয় কামাল হোসেন জানিয়েছেন, কবিরের বাবা আকবর হোসেন ছিলেন দিনমজুর। সংসার চালাতে বাবাকে সহযোগিতা করার জন্য পাঁচ বছর আগেও যাত্রীবাহী বাসে পান বিক্রি করতেন কবির। সেই ছেলে ইয়াবা ব্যবসা করে এখন কোটি কোটি টাকার মালিক। শুনেছি তিনি নাকি রাজপ্রাসাদ বানাচ্ছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশের চলমান মাদকবিরোধী অভিযান থেকে নিজেকে রক্ষা করতে কিছুদিন আগে সৌদি আরব চলে যান কবির। স্ত্রী সাবেকুন্নাহারের হাতে ইয়াবা সিন্ডিকেটের দায়িত্ব দিয়ে যান। তিনি এখন ব্যবসা পরিচালনা করছেন। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, সাবেকুন্নাহারও তার বাপের বাড়ি রুমখা এলাকায় কোটি কোটি টাকার সম্পদ গড়েছেন।

উখিয়া থানার ওসি মো. আবুল খায়ের বলেন, কবির আহম্মদের ইয়াবা পাচার করতে গিয়ে তার ছোট ভাই ইসমাঈল কিছুদিন আগে ঢাকায় পুলিশের হাতে ধরা পড়েছেন। তিনি সেখানকার কেন্দ্রীয় কারাগারে আছেন। কবিরের বিরুদ্ধে ইয়াবা পাচারের একাধিক অভিযোগ রয়েছে। তাকে গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নিকারুজ্জামান বলেন, সরকারি খাস জায়গায় নির্মাণাধীন কবিরের বাড়ির কাজ বন্ধ করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সহকারী কমিশনার (ভূমি) একরামুল ছিদ্দিককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ইউপি চেয়ারম্যান : টেকনাফ ৫ নম্বর বাহারছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মৌলভী আবদুল আজিজও সৌদি আরব পালিয়েছেন। এলাকায় তিনি ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে বেশ ভালোভাবে জড়িত। তার ছোট ভাই ইয়াবা গডফাদার মৌলভি রফিকও গেছেন তার সঙ্গে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads