• বুধবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১১ আশ্বিন ১৪২৫
ads

অর্থনীতি

উৎপাদন তিনগুণ বাড়লেও খাদ্য ঘাটতি কাটছে না

  • মো. জাহিদুল ইসলাম
  • প্রকাশিত ২৭ মার্চ ২০১৮

বাংলাদেশে আলু উৎপাদন কোটি মেট্রিক টন ছাড়িয়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ফলেছে ১ কোটি ২ লাখ মেট্রিক টন। প্রবৃদ্ধির হার ৭ দশমিক ৮২ শতাংশ। গত অর্থবছরে দেশে সবজির উৎপাদন বেড়েছে ৮ দশমিক ২৮ শতাংশ। আর অপ্রচলিত শস্য ভুট্টার উৎপাদন বেড়েছে ১২ দশমিক ৮০ শতাংশ। এই তিন ফসলের সঙ্গে পাল্লা দিতে না পারলেও সব ধরনের খাদ্যশস্যের উৎপাদনই বাড়ছে। ১ কোটি ১০ লাখ মেট্রিক টন থেকে বেড়ে ৪৭ বছরে চাল ও গমের উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৬১ লাখ টনে। সব মিলিয়ে খাদ্য উৎপাদন তিনগুণের বেশি বেড়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। আর একই সময়ে জনসংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণ। তবে মানুষ বাড়ার তুলনায় উৎপাদন বাড়লেও দেশে খাদ্য ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। আর এর পেছনে কৃষিপণ্যের উৎপাদন, জনসংখ্যা বা অন্য কোনো পরিসংখ্যানে বড় ধরনের ভুল আছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাড়তি উৎপাদনের তথ্যের ভিত্তিতে দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে দাবি করা হয়ে থাকে। অথচ দাম বৃদ্ধি, খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কারণে খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ কমছে। এরপরও ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। প্রতিবছর এ ঘাটতি মেটাতে বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য আমদানি করতে হচ্ছে, যা গত বছর সর্বকালের রেকর্ড গড়েছে। খরা, বন্যা, রোগবালাই বা অন্য কোনো দুর্যোগে ফলন কম হলে বা ফসলহানি ঘটলেই দেখা দিচ্ছে খাদ্য সঙ্কট। একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে আমিষের উৎপাদন ও চাহিদার পরিস্থিতিতেও। 

গত পাঁচ বছরে দেশে দুধ ও মাংসের উৎপাদন দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে সম্প্রতি দাবি করা হয়েছে। একই সময়ে ডিমের উৎপাদন ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে বলে জানিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী ছায়েদুল হক। এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরো জানান, তরল দুধের উৎপাদন পাঁচ বছরে ৩৪ লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টন থেকে বেড়ে ৭২ লাখ ৭৫ হাজার মেট্রিক টনে উন্নীত হয়েছে। একই সময়ে মাংসের উৎপাদন ২৩ লাখ ৩০ হাজার টন থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬১ লাখ ৫২ হাজার টনে। আর ডিমের উৎপাদন ৭ কোটি ৩৮ লাখ পিস থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ কোটি ৯১ লাখ ২৪ হাজারে।

অবশ্য বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যানের সঙ্গে সরকারের এ দাবির ফারাক আছে। পোল্ট্রিশিল্পের উন্নয়নে নেওয়া একটি প্রকল্পের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, আয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বাংলাদেশের মানুষের খাদ্য তালিকায় প্রাণিজ আমিষের প্রাধান্য বাড়ছে। মাংস, দুধ ও ডিম উৎপাদন বাড়লেও বাড়তি চাহিদার তুলনায় তা অপ্রতুল। এর ফলে প্রতিবছর প্রাণিজ আমিষের ঘাটতি বাড়ছে। চাহিদার তুলনায় বছরে ডিমের ঘাটতি ১৫০ কোটি পিস। আর মাংসের উৎপাদন চাহিদার তুলনায় ৫ লাখ টন ও দুধের ৫৯ লাখ টন কম। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ঘাটতি পূরণে ২৪ কোটি ৮৮ লাখ মার্কিন ডলার মূল্যমানের মাংস ও দুধজাতীয় পণ্য আমদানি করতে হয়েছে।

এ বিষয়ে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. এএফএম জামাল উদ্দিন বাংলাদেশের খবরকে জানান, জমি না বাড়লেও প্রতিবছর ফলন বাড়ছে। মূলত উৎপাদনশীলতা বেড়ে যাওয়াই এ সাফল্যের মূলে। এ গবেষক আরো জানান, বর্তমানে শিক্ষিত লোকজন কৃষি খাতে আসছে। আগে দুবার হতো এমন ফসল এখন বছরে চারবার চাষ করা যায়। একই সঙ্গে তিনি উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি ফসলের গুণগত মানের বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিতে বলেছেন। এখনো প্রায় ৩০ শতাংশ সবজির অপচয় হচ্ছে। তার মতে মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে প্রকৃত কৃষকরা ন্যায্য দাম পাচ্ছে না।

উৎপাদন বৃদ্ধির পরও খাদ্য ঘাটতির পেছনে খাদ্য উৎপাদন এবং জনসংখ্যার হিসাব পরিসংখ্যানের গরমিলকে দায়ী করছেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. রুহুল আমিন। তিনি বলেন, সঠিক পরিসংখ্যান না থাকায় খাদ্যপণ্যের যথাযথ চাহিদা নিরূপণ করা যাচ্ছে না। এ কারণে মজুতদারির মাধ্যমে খাদ্যের কৃত্রিম সঙ্কট তৈরির সুযোগ পাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। বেড়ে যাচ্ছে খাবারের দাম। আবার বেসরকারি পর্যায়ে খাদ্য আমদানির সুযোগও সৃষ্টি হচ্ছে।

বর্তমানে মাথাপিছু আমিষ গ্রহণের একটি চিত্র উঠে এসেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদনে। তাতে বলা হয়েছে, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে দেশে মোট মাংস উৎপাদন হয়েছে ১০ লাখ ৮৪ হাজার টন। তখন দৈনিক মাথাপিছু উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ২০ দশমিক ৬০ গ্রাম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে প্রতিদিন একজন মানুষের ১২০ গ্রাম মাংস খাওয়া দরকার। তবে বর্তমানে মাংসের উৎপাদন মাথাপিছু ৮০ দশমিক ৬৪ গ্রামে উন্নীত হয়েছে। এ হিসাবে ঘাটতি মাথাপিছু ৪০ গ্রাম করে।

অন্যদিকে ২০০৮-০৯ অর্থবছরে দেশে মাথাপিছু দুধ উৎপাদন ছিল দৈনিক ৪৩ দশমিক ৪৩ মিলি লিটার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে দুধের দৈনিক চাহিদা ২৫০ মিলিলিটার। বর্তমানে মাথাপিছু উৎপাদন হচ্ছে ১০৮ দশমিক ৬৬ মিলিলিটার।

উল্লেখযোগ্য ফসলের কৃষি পরিসংখ্যান শীর্ষক একটি প্রতিবেদন সম্প্রতি প্রকাশ করেছে বিবিএস। এতে বলা হয়েছে, ৪৫ বছরে খাদ্যশস্যের উৎপাদন বেড়েছে ২ কোটি ৫০ লাখ ৮০ হাজার টন। প্রতিবেদনে ১৯৭০-৭১ অর্থবছর থেকে ২০১৪-১৫ অর্থবছরের তথ্য রয়েছে। জমির পরিমাণ, একরপ্রতি উৎপাদনের হারসহ আউশ, আমন ও বোরো ফসলের তথ্য রয়েছে এতে। আছে আলু ও গম চাষের তথ্যও।

উৎপাদন বাড়তে থাকলেও দেশে খাদ্য ঘাটতি রয়েই যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব থেকে জানা যায়, ২০১০-১১ অর্থবছরে মোট ৩ কোটি ১০ লাখ ৬২ হাজার টন খাদ্য উৎপাদন হয়। একই বছর খাদ্য সহায়তা ও সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে আমদানি করা হয় ৫৭ লাখ ৪ হাজার টন। ২০১১-১২ অর্থবছরে ২২ লাখ ৯০ হাজার, এরপরের বছর ১৮ লাখ ৯০ হাজার, ২০১২-১৪ অর্থবছরে ২৯ লাখ ৯৩ হাজার টন খাদ্য কেনা হয় বিদেশ থেকে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৪৯ লাখ ৪০ হাজার টন, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৪৫ লাখ ৪০ হাজার টন ও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৫৮ লাখ ২৩ হাজার টন চাল ও গম এনে ঘাটতি পূরণ করতে হয়।

আর খাদ্য আমদানির সব রেকর্ড ভেঙে গেছে চলতি বছর। গত বছর হাওরাঞ্চলে আগাম বন্যা ও ব্লাস্ট রোগে সরকারি হিসাবে প্রায় ১১ লাখ মেট্রিক টন ধান উৎপাদন কম হয়েছে। অথচ এর বিপরীতে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি আট মাসে খাদ্য আমদানি করা হয়েছে ৬৭ লাখ ৩৯৪ মেট্রিক টন। দেশে আসার পথে আছে আরো ২২ লাখ ৭১ হাজার ৫৪ মেট্রিক টন। খাদ্য আমদানি ও পর্যবেক্ষণের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো একক বছরে এত বেশি খাদ্য কখনো আমদানি হয়নি বাংলাদেশে। এক বছরের ব্যবধানে এ বৃদ্ধির হার ২৫৭ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বোরো চাষের প্রচলন শুরুর পর থেকে দেশে চালের উৎপাদন বাড়ছে। তবে বিপুল জনগোষ্ঠীর তুলনায় চাষের জমি কম হওয়ায় অভ্যন্তরীণ উৎপাদন থেকে খাদ্য চাহিদার শতভাগ জোগান দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কৃষিপণ্যের উৎপাদন, জনসংখ্যা বা অন্য কোনো পরিসংখ্যানে বড় ধরনের ভুল আছে বলে তাদের ধারণা।

মূলত বোরো মৌসুমে জমির পরিমাণ ও হেক্টরপ্রতি ফলন বেড়ে যাওয়ায় খাদ্য উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, ৪৫ বছরে বোরো ধানের ফলন বেড়েছে প্রায় ৯ গুণ। ১৯৭০-৭১ অর্থবছর ৯ লাখ ৮২ হাজার হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয়েছে ২১ লাখ ৯২ হাজার টন চাল। সর্বশেষ অর্থবছরে ৪৮ লাখ ৪০ হাজার হেক্টরে বোরো ফলেছে ১ কোটি ৯১ লাখ ৯২ হাজার টন।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, আমন, আউশ ও বোরো মিলিয়ে ১৯৭০-৭১ অর্থবছরে মোট ৯৯ লাখ ১৩ হাজার হেক্টর জমিতে ধানের চাষ হয়েছে। এ হিসাবে হেক্টরপ্রতি ১ দশমিক ১০ টন চাল পাওয়া গেছে। আর ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তিন মৌসুমে ধান চাষ হয়েছে ১ কোটি ১৪ লাখ ১৫ হাজার হেক্টরে। প্রতি হেক্টরে ৩ দশমিক শূন্য ৪ টন চাল উৎপাদিত হয়েছে। এ হিসাবে চালের উৎপাদন বেড়েছে ২ দশমিক ৭৭ গুণের বেশি।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, আউশের জমি কমে আসছে। ১৯৭০-৭১ অর্থবছরে ৩১ লাখ ৯১ হাজার হেক্টর জমিতে আউশের চাষ হয়েছিল। ১৯৭৫-৭৬ অর্থবছরে চাষ হয়েছিল ৩৪ লাখ ২১ হাজার হেক্টর জমিতে। সর্বশেষ ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১০ লাখ ৪৫ হাজার হেক্টর জমিতে আউশ ফসল উঠেছে। ৪৫ বছরে আউশের উৎপাদনশীলতা বেড়েছে ২ দশমিক ৪৮ গুণ।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ খানা আয়-ব্যয় জরিপের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশিদের বেশি খাওয়ার প্রবণতা কমে আসছে। ২০১০ সালে দেশে মাথাপিছু দৈনিক ১ কেজি পরিমাণ খাদ্য ব্যবহার হয়েছে। ২০১৬ সালে তা নেমে এসেছে ৯৭৬ গ্রামে। একই সময়ে চালের ব্যবহার দৈনিক ৪১৬ গ্রাম থেকে নেমেছে ৩৬৭ গ্রামে। আর গমের ব্যবহার ২৬ গ্রাম থেকে নেমেছে প্রায় ২০ গ্রামে। এর ফলে দৈনিক মাথাপিছু ক্যালরি গ্রহণের মাত্রা ২ হাজার ৩১৮ কিলোক্যালরি থেকে নেমেছে ২ হাজার ২১০ কিলোক্যালরিতে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads