• সোমবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৮, ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
ads
অপরিকল্পিত প্রকল্পে ব্যয় এক হাজার ৯৯ কোটি টাকা

ছবি : ইন্টারনেট

অর্থ ও বাণিজ্য

আইএমইডির প্রতিবেদন

অপরিকল্পিত প্রকল্পে ব্যয় এক হাজার ৯৯ কোটি টাকা

  • জাহিদুল ইসলাম
  • প্রকাশিত ০৫ আগস্ট ২০১৮

২০০৮ সালের শেষের দিকে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে খুলনায় গ্যাস সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে দলটির নেতৃত্বে মহাজোট সরকার গঠন করার প্রায় ১০ বছরেও খুলনার বাসাবাড়িতে গ্যাস পৌঁছায়নি। এ লক্ষ্যে ১৬৩ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণ হলেও মজুত না থাকায় গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে না খুলনায়। ফলে পেট্রোবাংলার ভেড়ামারা খুলনা গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণে ৮৩২ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ের সুফল পাওয়া যায়নি। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রকল্প সমাপনী প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

পাইপলাইন নির্মাণের পাশাপাশি গ্যাস উত্তোলনেও সরকারি প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলা অযাচিত প্রকল্প নিয়েছে বলে জানিয়েছে আইএমইডি। গ্যাসের মজুতের পরিমাণ, উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের পরিমাণ ও মজুত গ্যাসের প্রকৃতি বিবেচনা না করেই খনন করা হয়েছে উত্তোলন কূপ। এসব কূপের বেশ কয়েকটিতে গ্যাস পাওয়া যায়নি। হাতে গোনা কয়েকটি থেকে শুরুতে গ্যাস পাওয়া গেলেও কয়েক দিন পর তা বন্ধ হয়ে গেছে। গ্যাস উত্তোলনের এ প্রকল্পে ২৬৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকা ব্যয়ের পর্যাপ্ত সুফল পাওয়া যায়নি। এভাবেই দুটি প্রকল্পে অযাচিত ব্যয় হয়েছে প্রায় এক হাজার ৯৯ কোটি টাকা।

প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ভেড়ামারা খুলনা গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণ প্রকল্পটি ৬৮৫ কোটি ২৯ লাখ টাকা ব্যয় ধরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদন পায় ২০০৬ সালে। ২০১০ সালের জুনে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রথমবার এর মেয়াদ ২০১২ সালের জুন পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এর মেয়াদ দ্বিতীয় দফায় ২০১২ সালের ডিসেম্বর ও তৃতীয় দফায় ২০১৪ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়। ফলে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৯০৩ কোটি ৮১ লাখ টাকায়। পরে ২০১৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়। তিন বছরের প্রকল্পে বাড়তি লাগে পাঁচ বছর ছয় মাস।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বঙ্গবন্ধু সেতুর ওপর দিয়ে উচ্চচাপের গ্যাসলাইন স্থাপন করায় দেশের পশ্চিমাঞ্চলে নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। খুলনার বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রতিদিন পাঁচ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট গ্যাস দরকার। এর বাইরে কুষ্টিয়ায় এক কোটি ঘনফুট, ঝিনাইদহে ৮০ লাখ, যশোরে দুই কোটি ও বিদ্যুতকেন্দ্র ছাড়াই খুলনায় আরো তিন কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা আছে। প্রতিদিন ১২ কোটি ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল।

প্রকল্পটি পরিদর্শন করে আইএমইডি জানায়, পাইপলাইন নির্মাণের কাজ শেষ হলেও গ্যাস সঙ্কটে খুলনায় সংযোগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে প্রকল্পের পুরো লক্ষ্য অর্জন হয়নি। ফলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের গ্যাসবঞ্চিত থাকার দিন শেষ হয়নি। এ অবস্থায় নতুন করে সরবরাহ পাইপলাইন নির্মাণে প্রকল্প নেওয়ার আগে গ্যাসের মজুত ও সরবরাহে নিশ্চয়তার বিষয়টি বিবেচনার সুপারিশ করেছে আইএমইডি।

আইএমইডি জানায়, মজুত না থাকলেও উত্তোলনে প্রকল্প নেওয়ায় সালদা গ্যাসক্ষেত্র ৩, ৪ ও ফেঞ্চুগঞ্জ গ্যাসক্ষেত্র ৪, ৫ উন্নয়নে ব্যয় হয়েছে ২৬৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। ৩০৫ কোটি ৬৪ লাখ টাকা ব্যয় ধরে প্রকল্পটি ২০১০ সালে শুরু হয়। কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১২ সালের জুনের মধ্যে। ২০১৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রথম দফায় মেয়াদ বাড়ানোর পর আরেক দফায় বাড়ানো হয় ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত। আবারো মেয়াদ বাড়িয়ে প্রকল্পের কাজ শেষ হয় ২০১৬ সালের জুন মাসে। দুই বছরের কাজ শেষ করতে বাড়তি লেগেছে আরো দুই বছর। অবশ্য কিছু কাজ বাকি রেখে সমাপ্ত ঘোষণা করায় শেষ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ২৬৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকা, যা মূল বরাদ্দের ১৩ শতাংশ কম।

প্রকল্পের প্রস্তাবনা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সালদা নদী গ্যাসক্ষেত্রটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সীমান্ত এলাকায় অবস্থিত। সীমান্তের ওপারে ত্রিপুরা রাজ্যের ভূখণ্ড থেকে ৫০ কূপের মাধ্যমে গ্যাস উত্তোলন করছে ভারত সরকার। অথচ বাংলাদেশ মাত্র চারটি কূপ থেকে গ্যাস তুলছে। মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার ফেঞ্চুগঞ্জ গ্যাসক্ষেত্রে দুই কূপের পাশাপাশি আরো নতুন কূপ খনন প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল।

পর্যবেক্ষণ শেষে আইএমইডি জানিয়েছে, সালদা নদীর তৃতীয় কূপ দুই হাজার ৮৬০ মিটার খননের পর দৈনিক দুই কোটি ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন হলেও বর্তমানে তা ৪৩ লাখে নেমে এসেছে। সালদার চতুর্থ কূপে দুই হাজার ৭৭৫ মিটার খনন করে দৈনিক ৩০ লাখ ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন করা গেছে। উৎপাদন শূন্যে নেমে আসায় বর্তমানে এ কূপটি বন্ধ রয়েছে। প্রকল্পের আওতায় খনন করা ফেঞ্চুগঞ্জের চতুর্থ কূপটি তিন হাজার ৬০০ মিটার খনন করে শুরুতে দৈনিক ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া গেছে। একই কূপ থেকে বর্তমানে উৎপাদন নেমে এসেছে ১৬ লাখ ঘনফুটে। ফেঞ্চুগঞ্জের পঞ্চম কূপটি তিন হাজার ১৩৭ মিটার খনন করে গ্যাসের সঙ্গে বালি আর পানি আসায় উৎপাদন করা হয়নি।

তা ছাড়া প্রকল্পের আওতায় চারটি কূপ পুনঃখননের কথা থাকলেও এতে কোনো সফলতা আসেনি। এ অবস্থায় প্রকল্পের উদ্দেশ্যও পূরণ হয়নি বলে জানিয়েছে আইএমইডি। পরবর্তী সময়ে গ্যাস উত্তোলনে কূপ খননের কাজ শুরু করার আগে সঠিকভাবে সিসমিক জরিপ চালানোর সুপারিশ করেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়। এ কাজে প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ নিয়োগেরও সুপারিশ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads