• শনিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৮, ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
ads

ছবি : সংগৃহীত

ফিচার

চিরায়ত প্রেমের উপাখ্যান

  • প্রকাশিত ২৫ এপ্রিল ২০১৮

প্রিয় মানুষকে দেখলেই মনের কোথায় যেন বেজে ওঠে ভায়োলিন। প্রেম এমনই শাশ্বত, রঙিন। যুগে যুগে ‘প্রেম’ নামক এই অনন্য সুন্দর অনুভূতিকে ধারণ করে আসছে মানবসভ্যতা। নর-নারীর প্রেমের কারণেই সৃষ্টি এ সভ্যতার। আবার এই প্রেমের কারণেই যে কত যুদ্ধ-বিগ্রহ হয়েছে, তা কে না জানে? প্রেম, বিরহ আর সংঘাতকে নিয়ে তাই রচিত হয়েছে অসংখ্য গাথা। সময়ের পরিক্রমায় ইতিহাসের পাতা আর মানুষের মুখে মুখে জানা যায় অসংখ্য প্রেমের কাহিনী। কালোত্তীর্ণ এমনই কিছু প্রেম নিয়ে আজকের আয়োজন-

 

লাইলি-মজনু

 

ইতিহাসের পাতায় আর সময়ের পরিক্রমায় মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে যে ভালোবাসার গল্পগুলো, তার মধ্যে লাইলি-মজনুর অমর প্রেমগাথা আলোচিত হয়েছে সবচেয়ে বেশি। যদিও কালজয়ী এই প্রেমের কাহিনীর সত্যাসত্য নিরূপণ করা এখন অনেকটাই কষ্টসাধ্য।

সময়ের বিবর্তনে নানা জাতি আর নানা দেশের মানুষের মুখে মুখে লাইলি-মজনুর গল্প বিবর্তিত হয়েছে নানাভাবে। যদিও অধিকাংশ কাহিনীতেই নায়ক মজনু আবির্ভূত হয়েছেন একজন রাজপুত্র ও কবি হিসেবে। অন্যদিকে লাইলির পরিচয় হিসেবে বেদুইন সর্দারের মেয়ের পরিচয়টিই সবচেয়ে বেশি এসেছে।

ইতিহাসবিদদের একটি অংশ মনে করেন, মজনু নামের আড়ালে হারিয়ে যাওয়া প্রেমিক পুরুষটি আসলে প্রাচীন আরবের বিখ্যাত কবি কয়েস বিন আমর। এদের ধারণা অনুযায়ী, আরবিতে ‘মজুনু বা মাজনুন’ শব্দটির অর্থ ‘প্রেমে উন্মাদ’ বলেই কয়েস-এর নাম কালক্রমে মজনু হিসেবে পরিচিতি পায়।

কয়েস ওরফে মজনু ছিল আল বাহরামের সুলতান আমর-বিন-আবদুল্লাহর পুত্র। সুলতান রাজ্যচ্যুত হওয়ার পর পুত্র কয়েসকে সঙ্গে নিয়ে আশ্রয় নেন একটি সরাইখানায়। আর সে সময়ই কয়েস প্রেমে পড়েন হিজ্জা সর্দার আল মাহদীর কন্যা লায়লা ওরফে লাইলির।

কয়েসের সব কবিতাই ছিল এই লায়লাকে নিয়ে।

লায়লা আর কয়েসের এই প্রেমের মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়ায় বুরিদানের বাদশা নওফেল। অসামান্য রূপসী লায়লাকে একবার দেখেই তার প্রেমে পড়ে যান নওফেল। লায়লাকে পাওয়ার জন্য নানা কৌশলও করতে থাকেন তিনি। তবে লায়লার পোষা হরিণ জিন্দান শিকারি নওফেলের তীরবিদ্ধ হয়ে মারা গেলে প্রেমের পরিবর্তে লায়লার অভিশাপই জোটে নওফেলের ভাগ্যে। জিন্দানের শোকে মুহ্যমান লায়লা কামনা করে নওফেলের অপমৃত্যু।

একসময় শাহজাদা কয়েস আর রূপবতী লায়লার বিয়ের সব আয়োজন সম্পন্ন হয়। তবে এরই মধ্যে একটি ভিন্ন ঘটনা লাইলি-মজনুর প্রেমকে ঠেলে দেয় বিরহের রুক্ষ প্রান্তরে। বিয়ের আসরে লায়লার পোষা কুকুর ওজ্জাকে দেখে ব্যাকুল কয়েস বলে ওঠেন, ‘এই মুখে তুই লায়লার পায়ে চুমু খেয়েছিস।’ আর এরপরই প্রেমের আতিশয্যে ওজ্জার মুখে চুমু খেয়ে বসে কয়েস! কয়েসের এই কাণ্ড দেখে উপস্থিত সবাই তাকে পাগল ভাবতে থাকে। বেঁকে বসেন স্বয়ং বাদশাহও।

বিয়ের আসর থেকে অপমানিত হয়ে কয়েস নিরুদ্দেশ হয় মরুভূমির পথে। অন্যদিকে কোনো উপায়ান্তর না দেখে লায়লার পিতা সওদাগর আল মাহদি কুচক্রী নওফেলের সঙ্গেই লায়লার বিয়ের উদ্যোগ নেন। তবে ফুলশয্যার রাতে অবিশ্বাস্যভাবে ফলে যায় লায়লার দেওয়া অভিশাপ। নিজের হাতে পান করা শরবতের বিষক্রিয়ায় মারা যায় নওফেল। আর পোষা কুকুর ওজ্জাকে নিয়ে রাতের অন্ধকারে পালিয়ে যায় লায়লা।

প্রিয়তম কয়েসের খোঁজে মরুভূমির মরীচিকার মাঝে ঘুরতে থাকে লায়লা। কিন্তু সেই রাতের সাইমুম মরুঝড়ে রচিত হয় লাইলি-মজনুর প্রেমের সমাধি। পরদিন পথচলতি এক কাফেলা বালির স্তূপের নিচে আবিষ্কার করে লায়লা, কয়েস আর কুকুর ওজ্জার মরদেহ।

 

ইউসুফ-জুলেখা

ইউসুফ-জুলেখা জুটির কাহিনী নিয়ে বাংলা সাহিত্যে অনেক রোমান্টিক প্রণয়াখ্যান রচিত হয়েছে। যুগ যুগ ধরে প্রেমের উদাহরণ হিসেবে সমাদৃত হয়ে আসছে এই গল্পটিও। কবি-সাহিত্যিকদের অতিরঞ্জনের ভিড়ে ইউসুফ-জুলেখার প্রেম কাহিনীর যতটুকু জানা যায়, তা অনেকটা এমন-

ইউসুফ একজন নবী ছিলেন। তার ১০ জন বৈমাত্রীয় ভাই ছিল। বাবা ইউসুফকে বেশি স্নেহ করতেন। তাই অন্য ভাইরা তাকে হিংসা করত। একসময় তারা তাকে হত্যা করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় এবং দূরে এক অন্ধকার প্রাচীন কূপে ফেলে এসে বাবাকে জানায়, ইউসুফকে বাঘে খেয়ে ফেলেছে।

ঘটনাচক্রে একটি কাফেলা ওই অন্ধকার কূপের কাছে পৌঁছে যায়। যারা সিরিয়া থেকে মিসর যাচ্ছিল। তারা ইউসুফকে উদ্ধার করে বিক্রির জন্য নিয়ে যায়।

তারপর থেকেই ইউসুফের জীবনে ঘটতে থাকে একের পর এক চমকপ্রদ ঘটনাবলি। ভাগ্যের পথপরিক্রমায় দাস হিসেবে আজহার নামে এক শস্য ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি হয়ে যান বালক ইউসুফ। আর এই আজহারের সঙ্গে ঘটনাক্রমে রাজপ্রাসাদে গিয়েই তার পরোপকারবৃত্তির গুণে চোখে পড়ে যান শস্য অধিকর্তা আজিজের। এদিকে, আজিজের স্ত্রী জুলেখা স্বামীর মুখেই প্রথম শোনেন ইউসুফের কথা!

জুলেখার গৃহেই ইউসুফ বালক থেকে যৌবনপ্রাপ্ত হন। কিন্তু সেই জুলেখাই তার প্রেমাসক্ত হয়ে পড়লেন এবং তার সঙ্গে কুবাসনা চরিতার্থ করার জন্য তাকে ফুসলাতে লাগলেন।

একদিন, গৃহের সব দরজা বন্ধ করে ইউসুফকে জুলেখা বললেন, ‘তোমার মাথার চুল কত সুন্দর!’ ইউসুফ বলল, ‘মৃত্যুর পর এই চুল সর্বপ্রথম আমার দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।’ এরপর জুলেখার কথা, ‘তোমার নেত্রদ্বয় কতই না মনোরম।’ ইউসুফ বললেন, ‘মৃত্যুর পর এগুলো পানি হয়ে আমার মুখমণ্ডলে প্রবাহিত হবে। জুলেখা আরো বললেন, ‘তোমর মুখ-মণ্ডল কতই না কমনীয়।’ ইউসুফ বললেন, ‘এগুলো সব মৃত্তিকার খোরাক!’

দিনে দিনে ক্রমেই ইউসুফের প্রতি আসক্তি বাড়তে থাকে সুন্দরী জুলেখার। কিন্তু ইউসুফ এই প্রেমকে অন্যায় জেনে প্রত্যাখ্যান করেন।

কিন্তু ইউসুফের প্রতি জুলেখার কামাসক্তি ও প্রেমের কথা সব মহিলাই জেনে যায়। এ নিয়ে শুরু হয় হাসি-ঠাট্টা। ব্যাপারটা জুলেখার কাছে অস্বস্তিকর মনে হলো। তিনি তাদের বাক্যবান এড়াতে সব মহিলাকে নিজের বাড়িতে দাওয়াত করলেন।

জুলেখার বাড়িতে সব মহিলা এসে যখন ছুরি দিয়ে ফল কাটতে ব্যস্ত তখন হঠাৎ ইউসুফকে তাদের সামনে নিয়ে আসেন জুলেখা। ইউসুফ আসার সঙ্গে সঙ্গে তার রূপে মুগ্ধ হয়ে নারীরা নিজেদের হাত কেটে রক্তাক্ত করল।

শুধু তাই নয়, সে সময় জুলেখা ইউসুফকে শারীরিক মিলনের আহ্বান জানালে নারীরাও তার সঙ্গে সুর মেলাল। কিন্তু ইউসুফ জুলেখাকে প্রত্যাখ্যান করল।

প্রত্যাখ্যাত হওয়ার এই অপমান সইতে না পেরে জুলেখা সম্ভ্রমহানির অভিযোগ আনেন ইউসুফের বিরুদ্ধে। তার অভিযোগ অনুযায়ী, বন্দি করা হয় ইউসুফকে। এদিকে, বন্দি থাকা অবস্থাতেই স্বপ্নের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়ে ফারাও রাজের বিশ্বস্ততা অর্জন করেন ইউসুফ। একসময় ভুল বুঝতে পেরে জুলেখাকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিতেও উদ্যত হন বাদশা। তবে ইউসুফের অনুরোধে তাকে প্রাণে না মেরে নির্বাসনে পাঠানো হয়। আর ইউসুফকে নিযুক্ত করা হয় শস্য অধিকর্তা। এরই মধ্যে কেটে যায় আরো কিছুদিন।

এদিকে, ইউসুফের প্রেমে জুলেখা পাগলিনীর মতো হয়ে গেলেন। হলেন বৃদ্ধাও! অতঃপর আল্লাহ একসময় তার প্রতি দয়াপরবশ হন এবং তাকে তার রূপ-যৌবন ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

তারপর জুলেখা স্রষ্টার প্রেমেই মজলেন। ইবাদত বন্দেগিতে মনোনিবেশের কারণে ইউসুফের কথা অনেকটা ভুলে গেলেন। ঘটনাচক্রে একদিন ইউসুফই তার সান্নিধ্য লাভের জন্য প্রচেষ্টা চালালে জুলেখা তাকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য ইউসুফের মতোই দৌড়ে পালাতে উদ্যত হন এবং সময় চান আরো ১৪ বছর। তবে ১৪ বছর পর আর দেখা হয়নি ইউসুফ-জুলেখার।

 

রাধা-কৃষ্ণ

প্রেম মানুষের একটি ‘দৈব গুণ’। দেবকুলেও এই প্রেমের সদর্প পদচারণা, যার বিরহ ব্যথায় কাতর হয়েছিলেন রাধা-কৃষ্ণও। হিন্দু পুরাণমতে, উভয়েই ঈশ্বরের ইচ্ছায় মর্তে মানবরূপে জন্ম নিয়েছিলেন। কৃষ্ণ পাপী কংস রাজাকে বধ করার জন্য দেবকী ও বাসুদেবের সন্তান হিসেবে জন্ম নিয়েছিলেন। কংস কৃষ্ণকে হত্যা করতে পারে- এই ভয়ে কৃষ্ণের জন্মমাত্র বাসুদেব গোপনে তাকে অনেক দূরে বৃন্দাবনে জনৈক নন্দ গোপের ঘরে রেখে আসেন। সেখানেই দৈব ইচ্ছায় আরেক গোপ সাগর গোয়ালার স্ত্রী পদ্মার গর্ভে জন্ম নেয় রাধা।

দৈব নির্দেশেই বালিকা বয়সে নপুংসক (ক্লীব) অভিমন্যু বা আইহন বা আয়ান গোপের (ঘোষের) সঙ্গে রাধার বিয়ে হয়। আয়ান গোচারণ করতে গেলে বৃদ্ধা পিসি বড়ায়ি রাধার দেখভাল করত।

রাধা ঘর থেকে বের হয়ে অন্য গোপীদের সঙ্গে মথুরায় দই-দুধ বিক্রি করতে যায়। বড়ায়ি তার সঙ্গে যায়। বৃদ্ধা বড়ায়ি পথে রাধাকে হারিয়ে ফেলে এবং রাধার রূপের বর্ণনা দিয়ে কৃষ্ণকে জিজ্ঞেস করে, এমন রূপসীকে সে দেখেছে কি-না। এই রূপের বর্ণনা শুনে রাধার প্রতি কৃষ্ণ পূর্বরাগ অনুভব করে। সে বড়ায়িকে বুঝিয়ে রাধার জন্য পান ও ফুলের উপহারসহ প্রস্তাব পাঠায়।

কিন্তু বিবাহিত রাধা সে প্রস্তাব পদদলিত করে।

এরপর একদিন দই-দুধ বিক্রির জন্য মথুরাগামী রাধা ও গোপীদের পথ রোধ করে কৃষ্ণ। তার দাবি- নদীর ঘাটে পারাপার-দান বা শুল্ক দিতে হবে, তা না হলে রাধার সঙ্গে মিলিত হতে দিতে হবে।

রাধা কোনোভাবেই এ প্রস্তাবে রাজি হয় না। এদিকে তার হাতে কড়িও নেই! সে নিজের রূপ কমানোর জন্য চুল কেটে ফেলতে চাইল এবং বেয়ারা কৃষ্ণের হাত থেকে বাঁচার জন্য বনে দৌড় দিল! এরপর থেকেই রাধা, কৃষ্ণকে এড়িয়ে চলে।

কৃষ্ণ নদীর মাঝির ছদ্মবেশ ধারণ করে। একজন পার করা যায় এমন একটি নৌকায় রাধাকে তুলে সে একদিন মাঝনদীতে নিয়ে নৌকা ডুবিয়ে দেয় এবং রাধার সঙ্গ লাভ করে। নদীতীরে উঠে লোকলজ্জার ভয়ে রাধা সখীদের বলে, নৌকা ডুবে গেছে, কৃষ্ণ না থাকলে সে নিজেও মরত। কৃষ্ণই তার জীবন বাঁচিয়েছে।

এ ঘটনার পর রাধা আর বাড়ির বাইরে আসে না। শাশুড়ি বা স্বামীকে কিছু বলেও না লজ্জায়।

এদিকে রাধা অদর্শনে কৃষ্ণকাতর। সে বড়ায়িকে দিয়ে রাধার শাশুড়িকে বোঝায়, ঘরে বসে থেকে কী হবে, রাধা দুধ-দই বেচে ক’টি পয়সা তো আনতে পারে!

শাশুড়ির নির্দেশে রাধা বাইরে বের হয়। প্রচণ্ড রোদে কোমল শরীরে দই-দুধ বহন করতে গিয়ে সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এ সময়ে কৃষ্ণ ছদ্মবেশে মজুরি করতে আসে। পরে ভার বহন অর্থাৎ মজুরির বদলে রাধার আলিঙ্গন কামনা করে!

রাধা এই চতুরতা বুঝতে পারে। সেও কাজ আদায়ের লক্ষ্যে মিথ্যা আশ্বাস দেয়। কৃষ্ণ আশায় আশায় রাধার পিছু পিছু ভার নিয়ে মথুরা পর্যন্ত যায়। দুধ-দই বেচে এবার মথুরা থেকে ফেরার পালা। কৃষ্ণ তার প্রাপ্য আলিঙ্গন চাইছে। রাধা চালাকি করে বলে, ‘এখনো প্রচণ্ড রোদ। তুমি আমাদের ছাতা ধরে বৃন্দাবন পর্যন্ত চলো। পরে দেখা যাবে।’ কৃষ্ণ ছাতা ধরতে লজ্জা ও অপমান বোধ করছিল। তবু আশা নিয়ে ছাতা ধরেই চলল। কিন্তু তার আশা পূর্ণ করেনি রাধা।

একদিন রাধা ও গোপীরা যমুনায় জল আনতে যায়। কৃষ্ণ যমুনার জলে নেমে হঠাৎ ডুব দিয়ে আর ওঠে না। সবাই মনে করে কৃষ্ণ ডুবে গেছে। এদিকে কৃষ্ণ লুকিয়ে কদম গাছে বসে থাকে। রাধা ও সখীরা জলে নেমে কৃষ্ণকে খুঁজতে থাকে। কৃষ্ণ নদীতীরে রাধার খুলে রাখা হার চুরি করে আবার গাছে গিয়ে বসে। পরে কৃষ্ণের চালাকি রাধা বুঝতে পারে। হার না পেয়ে রাধা কৃষ্ণের পালিতা মা যশোদার কাছে নালিশ করে। কৃষ্ণও মিথ্যে বলে মাকে। সে বলে, আমি হার চুরি করব কেন, রাধা তো প্রতিবেশী সম্পর্কে আমার মামি।

এদিকে বড়ায়ি সব বুঝতে পারে এবং রাধার স্বামী আয়ান হার হারিয়ে ফেলায় যাতে রাগান্বিত বা ক্ষুব্ধ না হয় সেজন্য বলে, ‘বনের কাঁটায় রাধার গজমোতির হার ছিন্ন হয়ে হারিয়ে গেছে।’

মায়ের কাছে নালিশ করায় কৃষ্ণ রাধার ওপর ক্ষুব্ধ। রাধাও কৃষ্ণের প্রতি প্রসন্ন নয়। এ অবস্থায় বড়ায়ি বুদ্ধি দিল, কৃষ্ণ যেন শক্তির পথ পরিহার করে মদনবাণ বা প্রেমে রাধাকে বশীভূত করে। সে মতে কৃষ্ণ পুষ্পধনু নিয়ে কদমতলায় বসে। রাধা, কৃষ্ণের প্রেমবাণে মূর্ছিত ও পতিত হয়। এরপর কৃষ্ণ রাধাকে চৈতন্য ফিরিয়ে দেয়। রাধা কৃষ্ণপ্রেমে কাতর হয়ে কৃষ্ণকে খুঁজে ফেরে। রাধাকে আকৃষ্ট করার জন্য সময়-অসময়ে কৃষ্ণ বাঁশিতে সুর তোলে। কৃষ্ণের বাঁশি শুনে রাধার রান্না এলোমেলো হয়ে যায়, মন কুমারের চুল্লির মতো পুড়তে থাকে, রাতে ঘুম আসে না, ভোরবেলা কৃষ্ণ অদর্শনে রাধা মূর্ছা যায়।

বড়ায়ি রাধাকে পরামর্শ দেয়, সারা রাত বাঁশি বাজিয়ে সকালে কদমতলায় কৃষ্ণ বাঁশি শিয়রে রেখে ঘুমায়। তুমি সেই বাঁশি চুরি কর, তাহলেই সমস্যার সমাধান হবে। রাধা তা-ই করে। কৃষ্ণ বুদ্ধিমান। বাঁশি চোর কে তা বুঝতে তার কোনো কষ্ট হয় না। কৃষ্ণ রাধার ওপর উদাসীন। এদিকে মধুমাস সমাগত। রাধা বিরহ অনুভব করে। রাধা বড়ায়িকে বলে কৃষ্ণকে এনে দিতে। দই-দুধ বিক্রির ছল করে রাধা নিজেও কৃষ্ণকে খুঁজতে বের হয়। অবশেষে বৃন্দাবনে বাঁশি বাজানো অবস্থায় কৃষ্ণকে খুঁজে পাওয়া যায়। কৃষ্ণ রাধাকে বলে, ‘তুমি আমাকে নানা সময় লাঞ্ছনা করেছ, ভার বহন করিয়েছ, তাই তোমার ওপর আমার মন উঠে গেছে।’ রাধা বলে, ‘তখন আমি বালিকা ছিলাম, আমাকে ক্ষমা করো। আমি তোমার বিরহে মৃতপ্রায়। তির্যক দৃষ্টি দিলেও তুমি আমার দিকে তাকাও।’ কৃষ্ণ বলে, ‘বড়ায়ি যদি আমাকে বলে যে তুমি রাধাকে প্রেম দাও, তাহলে আমি তোমার অনুরোধ রাখতে পারি।’ অবশেষে বড়ায়ি রাধাকে সাজিয়ে দেয় এবং রাধা-কৃষ্ণের মিলন হয়।

চণ্ডীদাস-রজকিনী

চণ্ডীদাস বারো বছর ধরে পুকুরে বড়শি পেতে বসে আছেন। বারো বছর ধরে রজকিনী পুকুর ঘাটে আসেন, কাপড় কাচেন, জল তোলেন, চণ্ডীদাসের দিকে ফিরেও তাকান না। চণ্ডীদাস বসে আছেন অসীম ধৈর্যে। এক দিন রজকিনীর মনে দয়া হলো। কিংবা নিতান্তই কৌতূহলবশত জিজ্ঞাস করলেন, মাছ দুই একটা পাইলা ঠাকুর? চণ্ডীদাস উত্তর দিলেন, এইমাত্র ঠোকর দিল!

চণ্ডীদাস আর রজকিনীর প্রেমের ইতিহাস নিয়ে রয়েছে বহু মিথ। চণ্ডীদাস ছিলেন বাসলীদেবী মন্দিরের পুরোহিত। সেই মন্দিরের দেবদাসী ছিলেন রামি। মন্দির ঝাঁট দেয়, ঠাকুরের বাসন-কোসন মাজে, কাপড় ধোয়। এক দিন মন্দিরে ভোগ নিতে এলে ঠাকুর তার বাহু আঁকড়ে ধরেন। পিতৃমাতৃহীনা নিম্নবর্ণের রামি তাতে প্রচণ্ড আতঙ্কিত হয়ে আর্তনাদ করেন, কী করছেন, ঠাকুর! ঠাকুর তার চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, আমি তোমার মাঝে রাধারূপ দর্শন করেছি।

বলাই বাহুল্য, দেবদাসী রজকিনীর তখন ঠাকুরের পায়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাওয়ার দশা। রজকিনী দৌড়ে পালালেন। ঠাকুরের নিশ্চয়ই মাথা খারাপ হয়ে গেছে। আর কখনো ঠাকুরের সামনে আসেন না। দূর থেকে কাজকর্ম সারেন। ওদিকে ঠাকুরের হয়ে গেছে বেহাল দশা। বসে বসে শুধু কীর্তন গান। কৃষ্ণ-রাধার প্রেমলীলার এক অসামান্য আখ্যান রচনা করলেন তিনি। মর্মস্পর্শী সুরে গাইলেন, ‘কে না বাঁশী বাএ বড়ায়ি কালিনী নই কূলে/কে না বাঁশী বাএ বড়ায়ি এ গোঠ গোকূলে/আকুল শরীর মোর বেয়াকুল মন/বাঁশীর শবদেঁ মো আউলাইলোঁ রান্ধন।’ এ হচ্ছে বাংলার ভাষার মধ্যযুগী রূপ। এর মধ্যেই দাঁড়িয়ে গেল বাংলা ভাষার এক অসামান্য সাহিত্য-শ্রীকৃষ্ণকীর্তন।

রামি বা রজকিনী নামে কি আসলেই কেউ ছিলেন! চণ্ডীদাস নামেও কি সত্যিই কেউ ছিলেন। যদি থাকেন তিনি কে! তার সম্পর্কে তেমন কিছুই জানা যায় না। এও এক মিথ হয়েই আছে। ১৯০৯ সালে বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুরের নিকটবর্তী কাঁকিল্যা গ্রামের দেবেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের বাড়ির গোয়ালঘরের মাচা থেকে থেকে বসন্তরঞ্জন রায় একটি পুঁথি আবিষ্কার করেন। এই পুঁথির ভণিতাকারীর নাম ছিল চণ্ডীদাস। তাও তিন চণ্ডীদাস। বুড়োচণ্ডীদাস, চণ্ডীদাস আর অনন্ত বুড়োচণ্ডীদাস। এই চণ্ডীদাস সমস্যা নিয়েই বাংলা সাহিত্যে একটা সমস্যা আছে, যার নাম চণ্ডীদাস সমস্যা। তাও গবেষণা করে শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্তে নিশ্চিত হওয়া গেছে, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন চতুর্দশ শতকের কবি বুড়ো চণ্ডীদাসের রচিত। তিনি বীরভূমের নান্নুর গ্রামের অদূরে তোয়াই গ্রামের বাসুলীদেবী মন্দিরের সেবক ছিলেন। সেই মন্দিরের চিহ্ন আজো রয়ে গেছে। এখনো অনেক ভক্ত-অনুসারী সেই মন্দিরে পুজো দিতে আসেন। চণ্ডীদাস ও রজকিনীর নামে তারা একছত্র পদকীর্তনও গান। এই সেই চণ্ডীদাস যিনি বলেছিলেন, ‘কহে চণ্ডীদাস, শুনহ হে মানুষ ভাই, সবার উপর মানুষ সত্য তাহার উপর নাই।’

চণ্ডীদাস ও রজকিনীর প্রণয় সম্পর্ক নিয়ে অনেক গল্পই প্রচলিত আছে। একটা গল্প আছে এরকম, শূদ্র কন্যা রামি ঠাকুরের সঙ্গে প্রেম করছে বলে স্থানীয় লোকজন তাকে মেরে মাটিচাপা দিয়ে দেয়। আরেকটি গল্প আছে এরকম, এক নবাবের স্ত্রী চণ্ডীদাসের গান শুনে তার প্রেমে পড়েছিলেন। তাই নবাব চণ্ডীদাসকে হাতির পিঠে বেঁধে চাবুক দিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলার নির্দেশ দেন। সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মতামতটি এরকম, রজকিনী সেই মন্দিরেই ছিলেন, রাতভর চণ্ডীদাস তার সঙ্গে কীর্তন গাইতেন। তারই ফলস্বরূপ শ্রীকীর্তন। রজকিনী আসলে ছিলেন তার সাধনসঙ্গী। সত্যিই যেন রাধার প্রতিরূপ। এমনও আরেক গল্প প্রচলিত আছে, এক রাতে মন্দিরে বসে কীর্তন গাইবার সময় সেই মন্দির ধস হয়ে তারা দুজন একসঙ্গে চিরকালের মতো মাটিচাপা পড়ে যান।

 

শিরি-ফরহাদ

মনের মানুষকে নিজের করে না পাওয়ার মতো কষ্টের অনুভূতি পৃথিবীতে আর একটিও নেই, তাইতো লোকে বলে- ‘প্রেমের মরা জলে ডোবে না’!

কারণ, প্রেমের উল্টো পিঠেই থাকে তার বিধ্বংসী রূপ! প্রত্যেক মানুষের জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে আসে প্রেম। বদলে দেয় জীবনকে। এবার শুনুন মানব ইতিহাসের অনন্য আরেক প্রেমের কথা! প্রেমের এই নিদর্শন সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ফিরছে কালে কালে অমর গাথা হয়ে- ইতিহাস আরো বহু মিথের জন্ম দেওয়া ‘শিরি ফরহাদ’ প্রেমগাথা-

শিরি-ফরহাদের প্রেম, এটি প্রাচীন এক ইরানি লোকগাথা। নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে এই গাথাকে। অনেক সূত্রের মধ্যে সবচেয়ে সমর্থনযোগ্য যে সূত্রগুলো পাওয়া যায় তাতে, শিরিনকে দেখানো হয়েছে রানি বা রাজকন্যা হিসেবে। তবে নায়ক ফরহাদের পরিচয় দিতে গিয়ে কেউ তাকে উল্লেখ করেছেন এক ‘বাঁধ নির্মাতা’ হিসেবে। আবার কেউবা তাকে আখ্যায়িত করেছেন স্থপতি বা ভাস্কর হিসেবে। এক্ষেত্রে যেসব ইতিহাসবিদ ফরহাদকে বাঁধ নির্মাতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তাদের যুক্তি হলো- ‘ফরহাদ’ শব্দটি হলো ‘বৃত্ত’ বা বাঁধের কাছাকাছি।

এই ধারায় বিশ্বাসীদের বর্ণিত কাহিনীতে দেখা যায়, নায়িকা শিরি একসময় ফরহাদকে বলেছিলেন, ‘তুমি যদি ওই নদীতে বাঁধ তৈরি করতে পার তাহলেই আমাকে পাবে।’

ফরহাদ শিরিকে পাওয়ার জন্য এই অসম্ভবকে সম্ভব করার আশায় কাজে নামে। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে বাঁধ ভেঙে জলের তোড়ে মারা যায় ফরহাদ। আর তার দুঃখে শিরিও পানিতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন।

অন্যদিকে, আরেকটি নির্ভরযোগ্য কাহিনীতে ফরহাদকে দেখানো হয়েছে হতভাগা এক ভাস্কর হিসেবে। ফরহাদের বিশ্বাস এবং গর্ব ছিল যে তার বানানো মূর্তির চেয়ে সুন্দর দুনিয়ার আর কিছুই হতে পারে না। কিন্তু হঠাৎ করে কোহে আরমান রাজ্যের রাজকন্যা শিরির হাতে আঁকা একটি ছবি দেখে সেই অহঙ্কার চূর্ণ হয়ে যায় ফরহাদের। শিরির রূপেও পাগলপ্রায় ফরহাদ তখন একের পর এক শিরির মূর্তি গড়তে শুরু করেন।

একদিন উন্মাদপ্রায় ফরহাদের সঙ্গে সামনাসামনি দেখাও হয়ে যায় শিরির। কিন্তু রাজ্য আর ক্ষমতার কথা চিন্তা করে ফরহাদকে ফিরিয়ে দেয় শিরি। তবে শিরির এই প্রত্যাখ্যান যেন ফরহাদের মনে নতুন করে জ্বালিয়ে দেয় প্রেমের আগুন। বেসাতুন পবর্তকে শিরির স্মৃতি ভাস্কর হিসেবে গড়ে তুলতে কঠোর পরিশ্রম শুরু করে সে। ফরহাদের এই ঘটনা শুনে শিরিও স্থির থাকতে পারে না। সিংহাসন তুচ্ছ করে সে ছুটে যায় বেসাতুন পর্বতে ফরহাদের কাছে। পরে এক ভূমিকম্পে দু’জনই একসঙ্গে প্রাণ হারায়।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads