• বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
ads

ফাইল ছবি

ফিচার

কান্তদর্শী কবি বেলাল চৌধুরী

  • বীরেন মুখার্জী
  • প্রকাশিত ২৮ এপ্রিল ২০১৮

বাংলাদেশের কবিতায় আধুনিক মনস্ক ও বহুমাত্রিক কণ্ঠস্বর সৃজনের কান্তদর্শী কবি বেলাল চৌধুরী। যাপিতজীবনে তিনি ভবঘুরে, সজীব আর তারুণ্যের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত হলেও তার কবিতা বিষয়-আঙ্গিকে হয়ে উঠেছে বিচিত্রধর্মী। কবিতার অস্থিমজ্জায় একাধারে ‘নদীর কল্লোল, স্থিরতা, প্রকৃতি, মানুষের সৌন্দর্যময়তা, মনোভঙ্গি এবং দহন’ যূথবদ্ধ করতে পারায় তার কবিতা পাঠকের অন্তঃপুরে ‘স্বপ্ন ও জাগরণের নিত্য-নতুন আভাস’ ছড়িয়ে দিতে সক্ষম; যা একজন প্রকৃত পাঠককে অনায়াসে জীবনমুখী ধারায় সম্পৃক্ত করতে পারে। কবির প্রথম কবিতাগ্রন্থ ‘নিষাদ প্রদেশে’ (১৯৬৬) প্রকাশের এক দশক পর ‘আত্মপ্রতিকৃতি, স্থির জীবন ও নিসর্গ’ (১৯৭৬); এমনকি পরবর্তীতে ‘স্বপ্ন বন্দী’ (১৯৮৫), ‘জল বিষুবের পূর্ণিমা’ (১৯৮৫), ‘প্রতিনায়কের স্বগতোক্তি’ (১৯৮৭), ‘যাবজ্জীবন সশ্রম উল্লাসে’ (১৯৯৭), ‘বত্রিশ নম্বর’ (১৯৯৭), ‘যে ধ্বনি চৈত্র, শিমুলে’ (২০০৮) এবং ‘সেলাই করা ছায়া’ (২০০৯) ইত্যাদি গ্রন্থের কবিতাগুলোর নিবিড় পাঠেও এ উপলব্ধি অস্পষ্ট নয়। ষাটের কবিরা কবিতায় শব্দ-সমবায়ে তৎকালীন আর্থ-সামাজিক অবস্থান ও রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ থেকে যে প্রগতিবোধ তুলে আনতে সচেষ্ট থেকেছেন, বেলাল চৌধুরী এদের অন্যতম সহগামী। তবে ‘জল বিষুবের পূর্ণিমা’ (১৯৮৫)-তে এসে কবিকে আত্মানুসন্ধানী হয়ে জীবনানন্দীয় কাব্যধারায় সম্পৃক্ত হতে দেখা যায়। বোধ করি, কল্যাণমুখী চেতনা জারিত হয়েই তিনি কবিতার নান্দনিক ভুবন সৃষ্টিতে মনোযোগী ছিলেন। বেলাল চৌধুরী তার কবিতায় তুলে এনেছেন প্রিয় জন্মভূমি, মানুষের যাপিত জীবন, প্রেম আর প্রকৃতির অনাবিল উচ্ছ্বাস। ‘স্বদেশ’ কবিতায় তিনি লিখেছেন, ‘আমি আছি ব্যাপ্ত হয়ে তোমার রৌদ্রছায়ায়/এই তো তোমার ঘামে গন্ধে তোমার পাশাপাশি/তোমার ছায়ার মতো তোমার শরীর জুড়ে/তোমার নদীর কুলকুল স্রোতে; তোমার যেমন ইচ্ছে, আছি আমি—/ঝিরিঝিরি পাতার ভেতর ভেতর হাওয়ার নাচে/রাত্রিদিন তোমার ধানের ক্ষেতে/উদাসী বাউল; ভাটিয়ালি গান ভেসে।’

কবিতার পরতে পরতে স্বদেশের প্রতি অগাধ বিশ্বাস-ভালোবাসা আর আস্থার ভিত্তি ফুটে উঠেছে। এ কবিতাটিতে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করার পাশাপাশি কবির ঐতিহ্যলগ্নতাও পাঠকের সামনে প্রকাশিত হয়। বাংলার অপরূপ প্রকৃতি ও ঐতিহ্যঋদ্ধ ‘আত্মপ্রতিকৃতি’ কবিতায় তিনি বলেন, ‘সারাদিন আমি গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ঘুরে ঘুরে/কী দেখেছিলাম? ভাট ফুল, আকন্দের ঝোপঝাপ/মাছরাঙাদের অকারণ খিটিমিটি?/গ্রামীণ ছবিতে আজ আর নেই সেই কিংবদন্তিখ্যাত/মসলিন, নকশিকাঁথার দিন!’

কবিতার বাঁক বদল সম্পর্কে কবি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘কবিতা কোনো আদর্শকে সামনে ধরে বদলায় না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চিন্তার অনেক বদল হয়। সেই চিন্তা থেকে কবিরাও বদলায়। কবিতার ভাষা কাউকে সামনে রেখে, তাকে অনুকরণ, অনুসরণ করে বদলায় না। এটা আসে কবির ভেতর থেকে। পরিবর্তিত ভাষাটা কবি তার নিজের ভেতর থেকেই অর্জন করেন। সেটা তার দেখা ও অভিজ্ঞতার নিরিখে হয়।’ কবিতাকে তিনি তার ‘অভিজ্ঞতা ও ভাবনার সম্মিলন’ করে তুলেছেন বললেও অত্যুক্তি হয় না।

কবিতার বিনির্মাণে বেলাল চৌধুরী স্বপ্ন, ঘাম ও অস্তিত্বের পথ ধরে ইতিহাসের সঙ্গে প্রজ্ঞালগ্ন থাকেন। কখনো বিষণ্নতা ও বস্তুবিশ্বের সঙ্গে একাত্ম হয়ে স্বপ্নভঙ্গের বেদনাজারিত পঙক্তিমালা সৃষ্টিতে আত্মমগ্ন হন। তার কবিতায় প্রতীক আশ্রিত শব্দমালাকে তীব্র আলোকের কাছে নতজানু হতে দেখি। কবি কেন এত নিম্নকণ্ঠে মৃত্যু, অন্ধকার ও দুঃস্বপ্নের কথা বলেন তা পাঠককে না ভাবিয়ে পারে না। বোধ করি, ‘হূদয় খুঁড়ে বেদনা’ জাগানোর মতো অস্তিত্বের সঙ্কট অতিক্রম করে মানুষ ও সমাজকে তীব্র এক দ্বান্দ্বিক ভাবনায় গ্রন্থিত করেন। কখনো আশা ও স্বপ্নকে একই সুতোই বেঁধে দিতে সচেষ্ট হন। যেখানে শ্যামল সবুজ ব-দ্বীপের গভীর দ্যোতনায় এসে সম্পৃক্ত হয় নীল আকাশ, অপসৃয়মাণ কোনো মুখ, জানালায় একদণ্ড দেখার আনন্দ। সর্বোপরি তিনি হয়ে ওঠেন প্রকৃতিপ্রেমিক। জন্মভূমির আকাশ, বাতাস, বৃক্ষ, নদী-পাখির কলরব ছাড়াও মানুষের আর্তি ও জীবনসংগ্রামের বর্ণনা তার কবিতাকে মূর্ত করে তোলে। তিনি উচ্চারণ করেন, ‘স্বপ্নে আমি কত কি যে দেখি তার কোন শেষ নেই/প্রতি বাঁকে বাঁকে আসে তারা অজস্র ধারায়/কখনও গাছ কখনও মাছ কখনও ক্ষিপ্র বিদ্যুৎ চমকের মতন...’ (স্বপ্ন বন্দী : স্বপ্ন বন্দী)। তখন পাঠকের কাছে বেলাল চৌধুরী হয়ে ওঠেন ইতিবাচক জীবনপ্রেমিক কবির অগ্রদূত। 

মানুষের অর্থহীন এই জীবন অন্বেষাকে বেলাল চৌধুরী নিরস আর ক্লান্তকর হিসেবে শনাক্ত করেন। একজন মানুষের মধ্যে আরেক মানুষের উপস্থিতিকে তিনি কৃত্রিমতার মোড়ক হিসেবে দেখেছেন, যে অনুভূতি সারাক্ষণ অস্তিত্বকে কুরে কুরে খায়। কবি তার প্রজ্ঞাবলে আবিষ্কার করেছেন,  মানুষকে বেঁচে থাকতে হয় মূলত দ্বৈতসত্তা ধারণ করে। ফলে প্রকৃত মানবসত্তা প্রতিক্ষণ এক অনন্ত জিজ্ঞাসায় আবর্তিত হয়। আর এমন দোলাচল ধারণ করে বেলাল চৌধুরীর কবিতা কখনো হয়ে ওঠে নাগরিক জীবনের কঠোর বাস্তবতার আঁকর। যেখানে স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের যথার্থ অনুভূতি দুল্যমান। নগরজীবনের দহন, প্রকৃতির রুদ্ররোষ ও আত্মজিজ্ঞাসা স্পষ্ট হয়ে ওঠে তার কবিতার মর্মমূলে। অস্বীকার করার উপায় নেই যে, সুরম্য কংক্রিট আর যান্ত্রিকতা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রাখে নগরজীবনকে। করপোরেট এই বাস্তবতায়— রিকশা, মানুষ, সারি সারি গাড়ির বহর প্রশ্নবোধক চিহ্ন ও যন্ত্রণার প্রতীক হয়ে ধরা দিয়েছে কবির চোখে। ‘যাবজ্জীবন সশ্রম উল্লাসে’ কবিতাগ্রন্থে তিনি স্থির, তার দৃষ্টি নানামুখী প্রশ্নে অবনত : ‘খটখটে ইট সুর্কি অ্যাসফল্ট পীচঢালা পথঘাট, হাটমাঠ/রোড, স্ট্রিট, লেন, বাইলেন দুইয়ের এক, ফোর বাই টেন হাটখোলা/আশির পরে ঊননব্বই-মাঝখানে শূন্যের হেঁয়ালি/সর্পিল গতিতে চলেছে এগিয়ে এঁকেবেঁকে হেলেদুলে/তামাম শহর ঘিরে দু’পাশে ডাইনে বাঁয়ে/রোগা সরু মোটা কত শত রাস্তা বাঁক/মাছেদের হাঁকডাক/বাঁকের মুখে কত না মানুষের ঝাঁক, মাছ না মানুষ’ (রিকশা’র শহর ঢাকা)। আবার বাঙালির জাগরণ ও সংগ্রামের অজেয় দুটি শব্দ ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব’ ও ‘জয় বাংলা’- শব্দদুটিকে তিনি বাঙালির আত্মানুসন্ধানে ‘বত্রিশ নম্বর’ কবিতায় তুলে ধরেছেন, ‘বাঙালি ও বাংলাদেশের ইতিহাস খুঁজতে গেলে/যেতে হবে বত্রিশ নম্বর/বাংলাদেশ ও বাঙালির গৌরবগাথা দেখতে হলে/যেতে হবে বত্রিশ নম্বর/বাঙালি ও বাংলাদেশের স্থাপত্য ইতিহাস জানতে হলে পাতা উল্টে দেখতে হবে বত্রিশ নম্বর/বাংলাদেশ ও বাঙালির কলঙ্কচিহ্ন দেখতেও যেতে হবে বত্রিশ নম্বর;/বত্রিশ বলতে একটি সড়ক মাত্র নয়, নয় খালি একটি প্রতীকী সংখ্যা/শুধু একটি সংখ্যাবাচকেই সীমাবদ্ধ নয় এ বাড়ি/...।’

প্রকৃতপক্ষে, বেলাল চৌধুরীর কবিতা প্রচলিত কাব্যধারার বিপরীতে স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও অনন্ত আকাঙ্ক্ষার জাগরণ ঘটায়। ফলে তার কবিতা পাঠকের বোধকে নিয়ে যায় ‘মর্মরিত মাধুর্যের দিকে’, যেখানে জীবনের অনন্ত জিজ্ঞাসা অসংখ্য ধ্বনি-প্রতিধ্বনির ভেতর দিয়ে বাঙ্ময় হয়ে ওঠে।

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads