• বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
ads

সংগৃহীত ছবি

ফিচার

অফুরান হোক পরিযায়ী প্রাণ

  • এসএম মুকুল
  • প্রকাশিত ১২ মে ২০১৮

পরিযায়ী পাখিরা মনে করে পৃথিবীর সব ভূখণ্ডই তাদের। হওয়াও উচিত তাই। কিন্তু পাখিদের কাছে পৃথিবী অখণ্ড হলেও মানুষের পৃথিবী যে খণ্ড-বিখণ্ড। এ কারণে অকারণ শত বাধা আর মানুষের পাতানো ফাঁদে জীবননাশের হুমকিতে অসংখ্য পরিযায়ী প্রাণ। দূর দেশ থেকে আসত বলে আগে তাদের ডাকা হতো ‘অতিথি পাখি’ বলে, আর এখন ‘পরিযায়ী পাখি’ বলে বিশ্বে তাদের পরিচয়। হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে দল বেঁধে পরিযায়ী পাখিরা আসে সবুজ-শ্যামল বাংলাদেশে। ইংল্যান্ডের নর্থ হ্যামশায়ার, সাইবেরিয়া কিংবা অ্যান্টার্কটিকার তীব্র শীত থেকে বাঁচতে এই পাখিরা পাড়ি জমায় দক্ষিণের কম শীতের দেশে। অন্যভাবে বললে, শীত শুরুর আগেই পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধের দেশগুলো থেকে হাজার হাজার পাখি দল বেঁধে দক্ষিণ গোলার্ধ ও তার আশপাশের অপেক্ষাকৃত উষ্ণ অঞ্চলে সাময়িকভাবে আশ্রিত হয়।

দল বেঁধে পাখিদের পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পাড়ি দেওয়ার এই প্রক্রিয়াটিকে বলা হয় পরিযান। আর এই পরিযানে অংশগ্রহণকারী পাখিদেরকে পরিযায়ী পাখি বা Migratory bird বলা হয়। প্রকৃতিগতভাবেই পরিযায়ী পাখিদের শারীরিক গঠন অনেক শক্তিশালী। সাধারণত ৬০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ মিটার উপর দিয়ে উড়ে যায় পরিযায়ী পাখিরা। ছোট পাখিদের গতি ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটার। দিনরাতে এরা প্রায় ২৫০ কিলোমটার উড়তে পারে। বড় পাখিরা ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার অনায়াসে উড়তে পারে। আশ্চর্যের বিষয়, এসব পাখি তাদের গন্তব্যস্থান সঠিকভাবে নির্ণয় করতে পারে। তারপরও প্রশ্ন থাকে পরিযায়ী পাখিরা হাজার হাজার কিলোমিটারের দীর্ঘ যাত্রায় কীভাবে পথ চেনে। বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রই পাখিদের পথ চেনায়। উপকূলরেখা, পাহাড় শ্রেণি, নদী, সূর্য, চাঁদ, তারার অবস্থান লক্ষ্য করে গন্তব্যের পথ খুঁজে নেয় পরিযায়ী পাখিরা। পরিযায়ীদের পথ চেনার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ পাখিরা থাকে ঝাঁকের সামনে আর নতুনরা থাকে পেছনের দিকে। জীবজগতে পাখিরাই সর্বাধিক পরিযায়ী। পাখি ছাড়া অন্য প্রাণীদের মাঝে এত ব্যাপক, বিস্তৃত ও দীর্ঘ পরিযানের ঘটনা নেই। গবেষণায় দেখা গেছে, পরিযায়ী পাখিরা আমাদের কাছে অতিথি বলে মনে হলেও আসলে তারা এখানে এসে ডিম পাড়ে এবং ডিম ফুটে বাচ্চা হওয়া পর্যন্ত এখানেই থাকে। নভেম্বর থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত বছরের প্রায় অর্ধেক সময় তারা পরিভ্রমণে এসে কাটায়। বছরের বাকি সময় তাদের যাত্রাপথে কাটে। সে হিসেবে পরিযায়ী পাখিদের নিজ দেশে খুব কম সময়ই কাটে বলা যেতে পারে। বছরের পর বছর এভাবে নিয়মিত পরিযানে পরিযায়ী পাখিদের গন্তব্যস্থল এবং যাত্রাবিরতি স্থানে বিভিন্ন পাখিদের সঙ্গে সখ্য এমনকি প্রণয়ের সম্পর্ক তৈরি হয়। অপরদিকে পরিযানের দীর্ঘ পরিক্রমায় তারা অনেক সহোদর কিংবা বন্ধুকেও হারিয়ে ফেলে।

 

মাতৃত্বের টানের চেয়েও পরিযান প্রবণতা প্রবল

আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, পাখিদের পরিযান রহস্য বিজ্ঞানীরা আজো পুরোপুরি সমাধান করতে পারেননি। পাখিদের এই পরিযান আসলে কতটা প্রাচীন, এটাই বিজ্ঞানীদের কাছে রহস্যময়। তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, প্রাচীনকালে যখন পৃথিবীর পরিবেশ ছিল দুর্যোগপূর্ণ তখন কিছু পাখি ভালো পরিবেশের আশায় আশপাশে ভালো স্থানে গিয়ে বাসা বাঁধত। বাকিরা দূর দেশে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি দিত। সেই থেকেই তাদের মধ্যে আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে পরিযানের প্রবণতা লক্ষণীয় হয়ে ওঠে।

মজার ব্যাপার হলো, পরিযায়ী পাখিদের এমন অদ্ভুত প্রবণতা লক্ষ করে বিজ্ঞানী চার্লস ডারউইন এসব পাখির ওপর কয়েকটি পরীক্ষা চালান। তিনি একটি পাখিকে তার পরিযানের আসন্ন সময়ে খাঁচাবন্দি করে রাখেন। এ পরীক্ষায় দেখা যায় পরিযানের সময় যত সামনে আসে, পাখিটিও বেরিয়ে আসার জন্য ততই মরিয়া হয়ে ওঠে। আর এই প্রবণতা এতই প্রবল যে খাঁচায় দাপাদাপিতে পাখির বুক ও ডানা রক্তাক্ত এমনকি ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। অপর এক পরীক্ষায় তিনি একটি পরিযায়ী হাঁসকে তার পরিযানের আসন্ন সময়ে ডানা বেঁধে ছেড়ে দিয়ে দেখেন ডানা মেলে না উড়তে পেরে পাখিটি শেষমেশ হেঁটেই দীর্ঘ যাত্রা শুরু করে দেয়। ডারউইন তার গবেষণায় দেখেছেন, মা পাখিরা উড়তে অক্ষম বাচ্চাকে এই ভীষণ ঠান্ডায় ফেলেই তার পরিযানে চলে যায়। তার মানে এই সময়টিতে মাতৃত্বের টান থেকেও বেশি প্রবল তার পরিযানের প্রবৃত্তি।

 

উড়ন্ত পরিযায়ীদের রহস্যময় ভি

পরিযায়ী পাখিরা আকাশে দলবদ্ধভাবে ওড়ার সময় দেখা যায় ইংরেজি ভি আকৃতির নিপুণ সৌন্দর্য সৃষ্টি করে উড়ে যায়। আকাশে মালার আকৃতি ধারণ করে ডানায় ভর করে দলবদ্ধ পাখিদের উড়ে চলা পৃথিবীর সুন্দরতম দৃশ্যের এটি একটি। এই রহস্য নিয়ে নানা বিচার বিশ্লেষণ রয়েছে। গবেষণা তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই ভি বিন্যাসে সর্বাগ্রে একটি পাখি অবস্থান করে আর পেছনে ক্রমান্বয়ে বাকি পাখিগুলো উড়তে থাকে। মজার ব্যাপার হলো, সর্বাগ্রে নেতৃত্বদানকারী পাখির অবস্থান সময়ে সময়ে পরিবর্তিত হয়। বিভিন্ন গবেষণা ও বিশ্লেষণে এই ভি বিন্যাসের দুটি তত্ত্ব প্রচলিত। প্রথমটি হলো, বাতাসের ফ্লুইড ডায়নামিক্স মেনে চলে শক্তি বাঁচানো। সম্মুখের পাখিটির উড্ডয়নের ফলে বাতাসে যে ভোর্টেক্স তৈরি হয় তা পেছনের পাখিগুলো কাজে লাগায়, ফলে তাদের ওড়ার জন্য শক্তি অপেক্ষাকৃত কম খরচ হয়। দ্বিতীয়টি হলো, এ ধরনের বিন্যাসের ফলে পাখিগুলো পরস্পরের সঙ্গে সহজে যোগাযোগ রক্ষা করতে পারে। গবেষণা তথ্য থেকে জানা যায়, দীর্ঘ পথ ভ্রমণের সময় পারস্পরিক যোগাযোগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। আবার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে যতদূর সম্ভব শক্তি ব্যবহার করাটাও জরুরি বিষয়।

 

নীড়ে ফেরা হয় না সব পাখির

বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণে জানা যায়, পাখিদের পরিযানের মুখ্য উদ্দেশ্য দুর্যোগ আবহাওয়া থেকে প্রাণ রক্ষা, খাদ্যের সহজলভ্যতা আর বংশবৃদ্ধি করা। এটি এখন স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়। এই নিয়মের টানে উত্তর গোলার্ধের অধিকাংশ পরিযায়ী পাখি দক্ষিণে আসে অফুরান পোকামাকড় আর নতুন জন্ম নেওয়া উদ্ভিদ খাওয়ার লোভে। এখানে এসে তারা খাদ্যের প্রাচুর্যের পাশাপাশি দেশীয় পাখিদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলে ভিন্ন এক পাখি সমাজ। এখানে তারা মিলেমিশে থাকে। বাসা বাঁধে, বংশবৃদ্ধি ঘটায়। এ দেশে এসে বাচ্চা ফুটিয়ে নতুন সংসার নিয়ে চলে যায় অন্য দেশে। পরিযায়ী পাখির জন্মহার যেমন বেশি, তেমনি মৃত্যুহারও বেশি। পরিযানের সময়ই অর্ধেকের বেশি পাখি মারা যায়। একটি পাখিকে সুদূর সাইবেরিয়া থেকে বাংলাদেশে আসার পথে অনেক জায়গায় বিশ্রাম নিতে হয় এবং আহার করতে হয়। কিন্তু দেখা যায়, প্রতি বছর এই পাখিটি যে এলাকায় বিশ্রাম ও খাবার গ্রহণ করত সেই আবাসস্থল মানুষের কারণে ধ্বংস হয়ে গেলে পাখিটির জীবন হুমকির মুখে পড়ে। সঙ্গে যদি বাচ্চা পাখি থাকে তাহলে আরো ভয়াবহ অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়। এভাবে অনেক পরিযায়ী পাখির জীবনাবসান ঘটে যাত্রাপথেই। আবার এসব পাখি যেখানে এসে আশ্রয় নেয় সেখানকার মানুষের লোভের ফাঁদ, বিষটোপ, গুলি, নিষ্ঠুরতার শিকার হয়ে প্রাণ হারায়। অপরদিকে অতিথি পাখিদের বিচরণ ভূমি ক্রমশ সঙ্কুচিত হওয়ায় পাখিরা হারাচ্ছে তাদের নিরাপদ আশ্রয়। এভাবে অনেক নির্মমতার শিকার হয়ে আপন নীড়ে ফেরা হয় না অনেক পরিযায়ী পাখির। তাই শুধু পরিযায়ী পাখি দিবস পালন নয়, পাখির প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন এখন সময়ের দাবি। লেখক : বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads