• শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads
বিশ্ববিখ্যাত মুসলিম স্থাপত্য

আবুধাবিতে অবস্থিত শেখ জায়েদ গ্র্যান্ড মসজিদ

ছবি : ইন্টারনেট

ফিচার

বিশ্ববিখ্যাত মুসলিম স্থাপত্য

  • প্রকাশিত ০৬ জুলাই ২০১৮

ওয়ালি উল্লাহ সিরাজ

ইসলামী সংস্কৃতির বহু অবদানধন্য এ পৃথিবী। চোখ ধাঁধানো বহু ইসলামী নির্মাণ রয়েছে বিভিন্ন দেশে। ইসলামী সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ একটি আয়োজন বা নির্মাণ হলো- মুসলিম স্থাপত্য। বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশে এমন কিছু স্থাপত্য নিদর্শন বা প্রাসাদ-ভবন তৈরি হয়েছে, হাজার বছর পার হওয়ার পরও তার সৌন্দর্য ও আকর্ষণে কোনো কমতি আসেনি। মুসলিম স্থাপত্য নিদর্শনগুলো শিল্পকলা-চারুকলা এবং স্থাপত্যকলা-অলঙ্করণকলায় মান উত্তীর্ণ বলেই কাল থেকে কালান্তর স্মরণীয় হয়ে আছে এবং থাকবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশেষত মুসলিম দেশে প্রতিষ্ঠিত সেরা কিছু মুসলিম স্থাপত্য নিদর্শনের পরিচিতি তুলে ধরা হলো-

সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে অবস্থিত শেখ জায়েদ গ্র্যান্ড মসজিদ : সংযুক্ত আরব আমিরাতের সবচেয়ে বড় এবং বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম ও সুন্দরতম মসজিদ এটি। মসজিদটির নামকরণ করা হয়েছে দেশটির প্রয়াত রাষ্ট্রপ্রধান শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ানের নামানুসারে। মসজিদটি নির্মাণের উপাদান হিসেবে মার্বেল পাথর, মূল্যবান স্ফটিক পাথর ও মৃৎশিল্প ব্যবহার করা হয়েছে।

এছাড়া এই মসজিদে স্থাপিত রয়েছে লাখ লাখ স্বচ্ছ পাথর দিয়ে তৈরি বিশ্বের বৃহত্তম একটি ঝাড়বাতি। সারা বিশ্বের মুসলিম-অমুসলিম পর্যটকদের কাছে শেখ জায়েদ গ্র্যান্ড মসজিদটি অন্যতম জনপ্রিয় একটি দর্শনীয় স্থান ও মুসলিম স্থাপত্য নিদর্শন হিসেবে তাৎপর্যপূর্ণ।

ইরানের শিরাজে অবস্থিত নাসির আল মুলক মসজিদ : মসজিদ নাসির আল মুলক মসজিদ ইরানের শিরাজে অবস্থিত একটি ঐতিহ্যবাহী মসজিদ। গোলাপি মসজিদ নামেও মসজিদটি বেশ পরিচিত। ১৮৮৮ সালে এটি নির্মিত। রঙিন গ্লাসের অলঙ্কার একটি বিশেষ আয়োজন ব্যবহূত হয়েছে এই স্থাপত্যটিতে। যখন এই রঙিন জানালা দিয়ে সূর্যের আলো প্রবেশ করে তখন পুরো স্থানটি সৌন্দর্যমণ্ডিত এক রঙিন আলোয় আলোকিত হয়। গোটা মসজিদটি ইরানি স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত। গোটা মুসলিম বিশ্বের অন্যতম সুন্দর একটি মুসলিম স্থাপত্য এই নাসির আল মুলক মসজিদ।

তুরস্কের ইস্তাম্বুলে অবস্থিত সুলায়মানিয়া মসজিদ : তুরস্কের ইস্তাম্বুল শহরে অবস্থিত এটি ওই দেশের সবচেয়ে বড় মসজিদ। মসজিদটি নির্মিত হয় ১৫৫০ থেকে ১৫৫৭ সালের মধ্যবর্তী সময়ে। মসজিদটি ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ লিস্টে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই স্থাপত্যটি উসমানীয় স্থাপত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হিসেবে আজো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তুরস্কের বাদশাহ প্রথম সুলায়মান এই মসজিদ নির্মাণের আদেশ দিয়েছিলেন। আর এজন্য মসজিদটির নামকরণ করা হয়েছে তার নামেই। মসজিদে একটি মিনার বসানো হয়েছে। এটি বিশ্বের প্রথম মসজিদ, যেখানে প্রথমবারের মতো একসঙ্গে চারটি মিনার স্থাপন করা হয়েছে।

স্পেনের আন্দালুসিয়ায় অবস্থিত দ্য আল-হাম্বরা : এটি মূলত একটি প্রাসাদ বা একে এককথায় যৌগিক দুর্গও বলা হয়। স্পেনের আন্দালুসিয়ার গ্রানাডা নামক স্থানে এই প্রাসাদটি অবস্থিত। স্পেনের মুসলিম নাসরি রাজবংশের শাসনামল চলাকালীন তেরোশ’ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে এই প্রাসাদটি নির্মাণ করা হয়। অসাধারণ সৌন্দর্যময়তাই এই প্রাসাদটির মূল আকর্ষণ। বাগান, ঝরনা ও চমৎকার শিল্পসম্মত বিভিন্ন অলঙ্করণ রয়েছে প্রাসাদটির ভেতরে। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান নির্বাচন কমিটি ১৯৮৪ সালে ২ নভেম্বর আল-হাম্বরাকে মানবতার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করে।

মরক্কোর কাসাব্লাংকায় অবস্থিত হাসান দ্বিতীয় মসজিদ : দ্বিতীয় হাসান মসজিদটি মরক্কোর উপকূলীয় শহর কাসাব্লাংকায় অবস্থিত। মুসলিম স্থাপত্যের অন্যতম একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা এই মসজিদটি। এটি আফ্রিকা মহাদেশের সবচেয়ে বড় মসজিদ হিসেবেও পরিচিত। ১৯৯৩ সালে এটি স্থাপিত হয়েছে। লোকমুখে বা কাসাব্লাংকায় এটিকে ভাসমান মসজিদও বলা হয়। এর কারণ হলো, মসজিদের তিন ভাগের এক ভাগ আটলান্টিক মহাসাগরে অবস্থিত। ২১০ মিটার উচ্চতা মসজিদের মিনার রয়েছে। এর উচ্চতা প্রায় ৬০তলা ভবনের সমান। সমুদ্রপথে চলমান নাবিকদের পবিত্র কাবাশরিফের পথ প্রদর্শনে সহযোগিতা কথা চিন্তা করে মিনারের উপরে একটি বিশেষ লেজার রশ্মি স্থাপিত হয়েছে। ৩০ কিলোমিটার দূর থেকেও বিশেষ এই রশ্মিটি স্পষ্ট দেখা যায়। এই মসজিদের মিনারটি বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু মিনার হিসেবে স্বীকৃত।

মরক্কোয় অবস্থিত চেফচাওয়েন : পনেরো শতকে নির্মিত হয় ঐতিহ্যবাহী এই স্থাপত্যটি। রাইফ পর্বতের পাশে অবস্থিত একটি গ্রাম চেফচাওয়েন। এই স্থাপত্যটি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক প্রামাণ্য হিসেবে বিশ্বময় স্বীকৃত। স্থাপত্যটির বেশিরভাগই নীল রঙ। এজন্য এই গ্রামটিতে নীলগ্রামও বলা হয়। নানা দেশ থেকে বহু মুসলিম-অমুসলিম পর্যটক সারা বছর এই গ্রামে আসেন। রাস্তায় হেঁটে হেঁটে দর্শকরা এই গ্রামের সৌন্দর্য উপভোগ করেন।

মিসরের আলেকজান্দ্রিয়ায় অবস্থিত মন্তাজা প্যালেস : মন্তাজা প্রাসাদটি বিশ্বের অন্যতম মুসলিম স্থাপত্য নিদর্শনের অন্যতম। ১৯৩২ সালে এটি নির্মিত হয়েছে। রাজা ফুয়াদ কর্তৃক নির্মিত একটি গ্রীষ্মকালীন প্রাসাদ হিসেবেও এই প্রাসাদের বেশ পরিচিতি রয়েছে। ভূমধ্যসাগরের তীরে এ স্থাপত্যটি অবস্থিত। তুর্কি এবং ফ্লোরেনটাইন কারুশৈলী দ্বারা প্রাসাদের স্থাপত্যকলা সজ্জিত। যে কেউ চাইলেই মনোরম বাগানে প্রবেশ করতে পারে। কারণ প্রাসাদের রাজপথ এবং বিস্তৃত রাজকীয় বাগানগুলো সবার জন্য উন্মুক্ত। 

সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে অবস্থিত বুর্জ আল আরব : সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে অবস্থিত একটি হোটেল এই বুর্জ আল আরব। গোটা বিশ্বের বৃহত্তম হোটেলগুলো তালিকায় চতুর্থ সুউচ্চ হোটেল হিসেবে এটি স্বীকৃত। ‘বেস্ট হোটেল ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’ এবং ‘বেস্ট হোটেল ইন দ্য মিডল ইস্ট’ ক্যাটাগরি মতো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পুরস্কার ও অ্যাওয়ার্ড লাভ করেছে এই বুর্জ আল আরব। কারো কারো মতামত হলো- বুর্জ আল আরব মানে হলো আরবের সম্মান। আবার কেউ বলেন, বুর্জ আল আরবের সম্পূর্ণ অর্থ হলো ‘আরবের স্তম্ভ’। আরব বিশ্বের অন্যতম ধনাঢ্য ব্যক্তি এবং আরব আমিরাতের শাসক শেখ নাহিয়ানের পারিবারিক সম্পত্তি এটি। বিশ্ববিখ্যাত এই স্থাপনাটির স্থপতি টম রাইট। স্থাপত্য পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করেছে ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাটকিনস’। এই হোটেলের নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করেছে দক্ষিণ আফ্রিকান কন্ট্রাক্টর ম্যুরে অ্যান্ড রবার্টস। ইন্টেরিয়র নকশা করেছেন কেএসি ইন্টারন্যাশনালের ডিজাইন প্রিন্সিপাল খুয়ান চিউ।

ইরানের ইস্পাহানে অবস্থিত জামে মস্ক অব ইস্পাহান : ইরানের তৃতীয় বৃহত্তম শহর ইস্পাহানের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ এটি। বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা অন্যতম একটি মুসলিম স্থাপত্য। জামে মস্ক অব ইস্পাহানটি বারোশ’ শতাব্দীতে পুনর্নির্মাণ করা হয়। সাত থেকে দশ শতাব্দীকালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। ২০১২ সালে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের স্থাপনা হিসেবেএই মসজিদ-স্থাপত্যটিকে ঘোষণা করেছে। গোটা মসজিদটি আইওয়ান নির্মাণশৈলীতে নির্মিত।

ইরানের কাশানে অবস্থিত সুলতান আমির আহমদ বাথহাউস : এটি মূলত একটি গোসলখানা। বিশ্বে অন্যতম সব মুসলিম স্থাপত্যশিল্পের এক অনন্য স্থাপনা এই বাথহাউস। ষোলোশ’ শতকে বিখ্যাত এই স্থাপত্যটি নির্মিত হয়েছে। ইরানের একটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র এটি। বিশ্বময় খ্যাতিলাভ করেছে এই মুসলিম স্থাপত্যটি। আশ্চর্য ও অলঙ্কারময় টাইলস দিয়ে সুসজ্জিত গোটা স্থাপত্যটি। স্থাপনাটির বেশির ভাগ টাইলসই নীলকান্তমণি ও স্বর্ণখচিত।  

লেখক : কন্ট্রিবিউটর, পথ ও পাথেয় 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads