• বুধবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১১ আশ্বিন ১৪২৫
ads
গানের দেশ প্রাণের দেশ বাংলাদেশ

রুনা লায়লা

সংরক্ষিত ছবি

ফিচার

গানের দেশ প্রাণের দেশ বাংলাদেশ

  • প্রকাশিত ০৫ আগস্ট ২০১৮

গান বাংলাদেশের অবসর কাটানোর বিনোদন নয়, গান বাংলার মানুষের প্রার্থনা। গানের মাধ্যমে এদেশে এক সহজিয়া দর্শনের বিকাশ হয়েছে। চর্যাপদ থেকে তার ব্যাপ্তি শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, বৈষ্ণব পদাবলী, ময়মনসিংহ গীতিকা হয়ে একেবারে আধুনিক রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুলসঙ্গীত পর্যন্ত। এর মধ্যে কতশত ধরনের বাউল গান যে এদেশে বিকশিত হয়েছে, তার কোনো লেখাজোখা নেই। বিষয়বৈচিত্র্যে এমন বিপুল ভান্ডার পৃথিবীর আর কোথাও নেই। আউল-বাউল ফকিরি গানগুলোকে এদেশে বলা হয় গরিমাসঙ্গীত। যার মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে স্রষ্টার প্রতি আরাধনা। লালন ফকির, হাসন রাজা, জালাল খাঁ, রাধারমনা একেকটি নাম এদেশের মানুষ আজো শ্রদ্ধাভরে উচ্চারণ করে। তাদেরই পথ ধরে পরবর্তী সময়ে বিকশিত হয়েছে এদেশের লোকসঙ্গীত। লোকসঙ্গীতের হাত ধরেই একসময় বিকাশ হয়েছে আধুনিক গানের। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অতুলপ্রসাদ সেন আবহমান বাংলার সঙ্গীতের ধারাকেই বহন করেছেন। এদেশের লোকসঙ্গীতের বিকাশ হয়েছে কয়েকটি ধারায়- ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি, মুর্শিদী, মারফতি, দেহতত্ত্ব, ফকিরি, গাজন, কীর্তন, ধামাইল বহু ধারায়। একেকটি অঞ্চলের একেক রকম ভাব। আবহাওয়া, জলবায়ুর কারণেই এটা হয়েছে। উঁচুনিচু পথে গরুর গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার সময় উত্তরাঞ্চলের গাড়িয়ালরা গাইতো ভাওয়াইয়া গান। আর বিস্তীর্ণ হাওরে, নদীতে নৌকা ভাসিয়ে যেতে যেতে মাঝিরা আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে গেয়ে যেত ভাটিয়ালি গান। ভৌগোলিক ও পরিবেশগত অবস্থানের কারণেই ভাটিয়ালি গানের জন্ম উত্তরাঞ্চলে হওয়া সম্ভব ছিল না, আবার ভাওয়াইয়া গানের জন্ম হওয়া সম্ভব ছিল না নদীবাহিত হাওর-বাঁওড়ঘেরা ময়মনসিংহ-সিলেট অঞ্চলে। বাংলার গান নিয়ে ছোট আয়োজনে কিছু বলাটা অসম্ভব ব্যাপার। বিপুল এর ভান্ডার। আমরা চেষ্টা করেছি তার সামান্য কিছু একপাতায় সাজাতে। বাংলা গান বাংলার সবচেয়ে গরবের ধন। এদেশের মানুষের যদি গর্ব করার মতো কিছু থাকে, তা হচ্ছে তার গান। এদেশের মানুষ সুখেও গান গায়, দুঃখেও গান গায়। গানই বাংলার মানুষের প্রাণ। গ্রন্থনা ও সম্পাদনায় -কামরুল আহসান

সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে,

লালন বলে জাতের কী রূপ/দেখলাম না এই নজরে\

-লালন ফকির

লালনভক্তরা লালনের গানকে গান বলেন না, বলেন কালাম। কালাম শব্দের অর্থ বাণী বা দর্শন, কথোপকথন, যৌক্তিক আলোচনা। লালন তার গানের মধ্য দিয়ে দর্শনই প্রচার করেছেন। তার দর্শনে মিশে  গেছে বুদ্ধবাদ, সুফিবাদ, ভক্তিবাদ। হাজার বছরের ভারতীয় সংস্কৃতি, চিন্তার অন্তর্লোক তার গানে বা কালামে বহমান। গানের মধ্য দিয়ে তিনি প্রশ্ন করেছেন বিদ্যমান সমাজব্যবস্থাকে। তার সময়ে, ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে শেষ দিক পর্যন্ত বাঙালি সমাজ বিভক্ত ছিল বহু জাতপাতে। বিশেষ করে হিন্দু-মুসলমান বিভাজনে। লালন সেই জাতের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলেছেন, প্রশ্ন তুলেছেন আধ্যাত্মিক নানারকম বিশ্বাস নিয়েও। তিনি মূলত মানবতাবাদী। মানবতার সেবাই তার ধর্ম। যা আছে মানুষের মধ্যেই আছে। ‘অনন্ত রূপ সৃষ্টি করলেন সাঁই বলি সেই মানুষের তুল্য কিছুই নাই,’ তার বাণী। লালন অনুসারীরা লালনকে বাউল বলতে নারাজ। তিনি সাঁই বা ফকির। অনেকে তাকে বলেন মৈত্রী। অনেকে তাকে বুদ্ধর সমতুল্য গুরুত্ব দেন। তাকে আলোকপ্রাপ্ত মনে করেন। তাই তিনি গুরু। দার্শনিক জায়গা থেকে তিনি বাঙালি সমাজে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ। স্বয়ং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার দ্বারা, তার গান ও দর্শন দ্বারা খুব প্রভাবিত হয়েছিলেন। তার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন তৎকালীন সমাজের আরো অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তিরাও। তার একমাত্র চিত্রটি এঁকেছিলেন ঠাকুর পরিবারেরই আরেক প্রতিভাবান সন্তান জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর। লালনের জন্ম তারিখ নিয়ে কিছু বিভ্রান্তি আছে। অনুমান করা হয় তিনি ১৭৭৪ সালের দিকে জন্মেছিলেন। তিনি দীর্ঘজীবী হয়েছিলেন। প্রায় ১১৬ বছর বেঁচেছিলেন। ১৮৯০ সালে তার তিরোধান হয়। প্রতিবছর পয়লা কার্তিকে তার আশ্রম কুষ্টিয়ার ছেউরিয়ায় লালনভক্তরা এক হন। সে এক বিশাল বিরাট মিলনমেলা। ভক্ত-সাধুরা এক হয়ে একসুরে গান করেন, ‘মিলন হবে কতো দিনে...আমার মনের মানুষেরই সনে...’

 

আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি

চিরদিন তোমার আকাশ তোমার বাতাস আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি\

-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আমাদের জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, আমার আর কিছু যদি নাই থাকে, আমার গান থাকবে। সুখে-দুঃখে বাঙালিকে আমার গান গাইতেই হবে। যে-আত্মবিশ্বাস নিয়ে তিনি কথাটা বলেছিলেন তা আজো সত্য। তার গান ছাড়া আমাদের কোনো উৎসবই সম্পন্ন হয় না। বাঙালির মননে-মানসে তার গান মিশে আছে শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো। আমরা সুখেও তার গান গাই, দুঃখেও গাই। আমাদের প্রেম-প্রার্থনা- দেশাত্মবোধ সব তার গান ঘিরেই। এ এক বিস্ময়কর সৃষ্টি! অতুলনীয় তার প্রতিভা। সমগ্র বিশ্বসংগীত জগতে এমন অনন্য উদাহরণ আর নেই যে, একজন মানুষ একা সংগীতের এমন বিচিত্র ভুবন সৃষ্টি করেছেন। পূজা, প্রেম, প্রকৃতি, ঈশ্বর, মানবী, দেশমাতা সব তার গানে একাকার হয়ে গেছে। তার প্রায় সব গানই নিজের সুর করা। শুধু তার গান গেয়ে বিখ্যাত হয়ে গেছেন অসংখ্য মানুষ। শ্রেষ্ঠ রবীন্দ্রসংগীত শিল্পীদের মধ্যে আছেন পঙ্কজ মল্লিক, দেবব্রত বিশ্বাস, সুচিত্রা মিত্র, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, ইন্দ্রানী সেন, সাগর সেন, কলিম শরাফী, সাদী মুহম্মদ, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা। নাম বলে শেষ কর যাবে না। হালের একেবারে নতুন শিল্পীরাও নতুনভাবে তার গান গেয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠছেন। পারিবারিক জীবনেই তিনি সংগীত ও সাহিত্যের সংস্পর্শ পেয়েছিলেন। খুব ছোটবেলাতেই সংগীতের প্রতিভা দেখিয়েছিলেন ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলিতে, যেখানে তিনি কৈশোর বয়সে বৈষ্ণব কবিদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ব্রজবুলি ভাষায় কিছু পদ রচনা করে গেয়েছিলেন। পরে সেগুলো নিজেই সুর করে গেয়েছিলেন। তার গানেও বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতি ও প্রকৃতি বিরাজমান। তিনি যেমন বাংলার ফকির-বাউলদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন, তেমনি প্রভাবিত হয়েছেন ইউরোপীয় আধুনিক সংগীতকার, সুরকারদের দ্বারা। বাংলা গানে তিনি এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে দিয়েছিলেন। তার গান শুধু গান নয়, আমাদের একান্ত একটা আশ্রয়।

 

আমায় নহে গো ভালোবাসো শুধু ভালোবাসো মোর গান

বনের পাখিরে কে চিনে রাখে গান হলে অবসান\

-কাজী নজরুল ইসলাম

নজরুল রবীন্দ্রনাথের থেকেও বেশি গান লিখেছিলেন- চার হাজারের ওপর। পৃথিবীর কোনো ভাষায় এক হাতে এত বেশিসংখ্যক গান রচনার উদাহরণ নেই। এসব গানের বেশিরভাগই তারই সুর করা। কথা এখানেই শেষ নয়। কথা মাত্র শুরু। তার গানের বিষয় যেমন বিচিত্র সুরও তেমন বিচিত্র। লোকসংগীত থেকে একেবারে রাগমিশ্রিত সুরও তিনি ধারণ করেছেন তার বিচিত্র গানে। শ্যামাসংগীত কীর্তন, ভজন থেকে শুরু করে হামদ-নাত-গজল-দেশাত্মবোধক, প্রকৃতিবন্দনা, প্রেম, হাসির গান, ব্যঙ্গাত্মক গান, বাচ্চাদের গান, ভাটিয়ালি, পাহাড়িয়া, রণসংগীত কিছুই তিনি বাদ দেননি। নিজে যখন গান গাইতে বসতেন সারারাত শেষ করে দিতেন গান গাইতে গাইতে। তিনি বাংলাদেশের জাতীয় কবি, আর তাকে নিয়ে প্রচলিত আছে অসংখ্য মিথ, অসংখ্য গল্প। সেই ছোটবেলা থেকে লেটোর দলে গান গাইতেন। তারপর ছন্নছাড়া জীবন। যখন যেখানে মন চেয়েছে চলে গেছেন আর বাঁধনহারা পাখির মতো গান গেয়েছেন, কবিতা লিখেছেন। তার গান বিদ্রোহের হাতিয়ার। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন গান গেয়েই। আমাদের জাতীয় জীবনে তিনি এক বিরাট অনুপ্রেরণার নাম। বাংলার বাউল গান, ফকিরি গান, লোকসংগীত, রবীন্দ্রসংগীতের পরেই তার অবস্থান, কিংবা সব যেন তিনি একাই ধারণ করে আছেন। এমন কোনো সুরভঙি নেই, যে সুরে ও ভঙিতে তিনি গান লেখেননি! আব্বাস উদ্দিনের জন্য লিখেছিলেন অসামান্য কিছু ভাটিয়ালি গান। বলা যায় বাংলা আধুনিক গানের সূত্রপাতও তার হাতে। তার গান গেয়ে বিখ্যাত হয়েছেন অসংখ্য শিল্পী, রবীন্দ্রসংগীত শিল্পীদের মতোই। আঙ্গরবালা, মানবেন্দ্র,  ফিরোজা বেগম, ধীরেন বসু, অনুপ ঘোষাল, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, মোহাম্মদ রফি, অজয় চক্রবর্তী, সোহরাব হোসেন বিখ্যাত সব নজরুলগীতি শিল্পী। আমাদের দেশে ফেরদৌস আরা, শাহীন সামাদ, ফাতেমাতুজ জোহরা, সুজিত মুস্তফাও নজরুলের গানকে অনেক জনপ্রিয় করেছেন। বিদ্রোহ ও প্রেমে নজরুলের গান আমাদের সার্বক্ষণিক সঙ্গী।

 

লোকে বলে বলে রে, ঘরবাড়ি ভালা নাই আমার

কি ঘর বানাইমু আমি, শূন্যের-ই মাঝার...

-হাসন রাজা

এ গান যিনি লিখেছেন, তার জীবনে ভোগবিলাসের কোনো কমতি ছিল না। বর্ষায় বজরা নিয়ে সুন্দরী রমণী সঙ্গে নিয়ে চলে যেতেন হাওরে। সেখানে কয়েকদিন থাকতেন, পানভোজন করতেন, ফাঁকে ফাঁকে গান লিখতেন। তাও কী সব মরমি গান! যা মানবজীবনের নশ্বরতাকে একেবারে চোখের সামনে নিয়ে আসে। লালনের পর তাকেই বলা যায় বাংলার বিখ্যাত বাউল, যিনি গানের মধ্য দিয়ে দর্শনচর্চা করেছেন। হাসন রাজার বাড়ি ছিল শ্রীহট্টে, এখনকার সিলেটে। তিনি ছিলেন সেখানকার লক্ষণশ্রীর জমিদার। বিশাল ভূসম্পত্তির মালিক। কিন্তু একসময় তিনি সব ভোগবিলাস ত্যাগ করে নিজেকে পরমের কাছে সমর্পণ করেন। তার গানেও সুফিপ্রভাব পড়েছে। বাংলাদেশে তিনি খুব জনপ্রিয় বাউল। বিশেষ করে প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ তার এক নাটকে হাসন রাজার গান ব্যবহার করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে তাকে নতুন করে জনপ্রিয় করে তোলেন। হাসন রাজার জীবনী নিয়ে একটি চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে। চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেছেন চাষী নজরুল ইসলাম। সেখানে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন হেলাল খান। হাসন রাজার নামটি নিয়েও রয়েছে কিছু বিভ্রান্তি। অনেকে লেখেন ‘হাছন রাজা’। তবে ‘হাসন রাজা’ নামটিই বিশেষ পরিচিত। তার আসল নাম দেওয়ান হাসন রাজা চৌধুরী। তিনি জন্মেছিলেন ১৮৫৪ সালের ২১ ডিসেম্বর, মৃত্যু ১৯২২ সালের ৬ ডিসেম্বর। বাংলার মানুষের কাছে তার গান মরমি সাধনারই অপর নাম।

 

তুই যদি আমার হইতিরে আমি হইতাম তোর

কোলেতে বসাইয়া তোরে করিতাম আদর...

-জালালউদ্দিন খাঁ

জালালউদ্দিন খাঁ ময়মনসিংহের পূর্বাঞ্চল নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলায় জন্মেছিলেন ১৮৯৪ সালে। ১৯৭২ সালে এ মহান সাধক ইন্তেকাল করেন। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়টি পুরো ময়মনসিংহ অঞ্চল তার গানে বুঁদ হয়ে ছিল। তিনি প্রায় পীরের মর্যাদা পেয়ে গিয়েছিলেন। অসংখ্য ভক্ত-অনুরাগী-অনুসারী তার গানে জীবনদর্শন খুঁজে পেয়েছিলেন। লালন-হাসনের বাংলার এই আরেক বাউল, যিনি গানের মাধ্যমে দর্শন প্রচার করেছেন। তার গানের বিষয় আত্মতত্ত্ব, পরমতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, নিগূঢ়তত্ত্ব। গানের মধ্য দিয়ে তিনি বলেছেন- ‘আমার আমার কে কয় কারে ভাবতে গেলে চিরকাল, আমি আদি আমি অন্ত, আমার নামটি রুহজ্জামাল।’ তার গানে সুফি-দার্শনিক মনসুর আল-হাল্লাজের প্রভাব পড়েছে ব্যাপকভাবে। তার গানে আরো অনেক জটিল দর্শন-তত্ত্ব আছে। তিনি প্রায় এক হাজার গান লিখেছিলেন। তার জীবদ্দশাতেই চার খণ্ডের ‘জালাল-গীতিকা’ প্রকাশ পেয়েছিল। স্থানীয় বাউলরাই তার গান চারদিকে ছড়িয়ে দিয়েছেন। এখনো তার গান গেয়ে বেড়ান সুনীল কর্মকার, ইসলাম উদ্দিন, নূর মিয়া। একসময় আব্বাসউদ্দিন, আবদুল আলীমও তার গান গেয়েছিলেন।  জালাল খাঁর সময় ময়মনসিংহ অঞ্চলে আরো কয়েকজন বাউলসাধক জন্মেছিলেন। তাদের মধ্যে আছেন রশিদ উদ্দিন, উকিল মুন্সি, চা খাঁ পাঠান, মিরাজ আলী, তৈয়ব আলী, দুলু খাঁ, আবেদ আলী ও উমেদ আলী। সে যেন এক বাউল সাধনারই যুগ।

 

আমার বন্ধু দয়াময় তোমারে দেখিবার মনে লয়

তোমারে না দেখলে আমার জীবন কেম্নে রয়...

-রাধারমণ দত্ত

বুকের ভিতর জ্বলন্ত কলিজা নিয়ে যে মানুষটির জন্ম হয়েছিল এই বাংলায় তার নাম রাধারমণ। রাধারমণ মানেই বিচ্ছেদের আগুন, ব্যথা, কান্না। কৃষ্ণের জন্য রাধা যেমন কাঁদে, রাধারমণও তার প্রিয়ার জন্য দিবাবিশি কাঁদেন। ‘কারে দেখাবো মনের দুঃখ গো আমি বুক চিরিয়া, অন্তরে তুষেরই অনল জ্বলে গইয়া গইয়া’ রাধারমণের বিখ্যাত গান। তার অসংখ্য জনপ্রিয় গানই এখনো মানুষের মুখে মুখে ফেরে। প্রতিযুগেই তিনি নতুন করে আবির্ভূত হন নতুন কোনো বাউলশিল্পীর কণ্ঠে। সারা বাংলায় তার মতো জনপ্রিয় বাউল বোধহয় আর কেউ নন। যদি কেউ তার নামও শুনে না থাকেন, তার গান অবশ্যই শুনে থাকবেন। ‘ভ্রমর কইও গিয়া, শ্রীকৃষ্ণ বিচ্ছেদের অনলে, অঙ্গ যায় জ্বলিয়ারে ভ্রমর কইও গিয়া’-এই গান কে না শুনেছে! রাধারমণ জন্মেছিলেন ১৮৩৩ সালে শ্রীহট্টে। প্রয়াণ ১৯১৫ সালে। শ্রীহট্টের আরেক বাউলসাধক হাসন রাজার সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল, নিয়মিত পত্রালাপ হতো। রাধারমণের গানেও দেহতত্ত্ব, বাংলার বৈষ্ণব কবিদের প্রেমতত্ত্ব ও রাধা-কৃষ্ণের লীলার প্রভাব পড়েছে। রাধারমণের বাবা রাধামাধব খ্যাতিমান লোককবি জয়দেবের গীতগৌবিন্দের বাংলা অনুবাদ করেছিলেন, সেই প্রভাবও নিঃসন্দেহে তার ওপর পড়েছে। বাউল গান ছাড়াও তিনি প্রবর্তন করেছিলেন অসামান্য এক লোকনৃত্য ও সংগীত-ধামাইল গান। এ এক অসামান্য নৃত্যগীত, একান্তই বাংলার নিজস্ব ধন।

 

গান গাই আমার মনরে বুঝাই মন থাকে পাগলপারা

আর কিছু চায় না মনে গান ছাড়া...

-শাহ আবদুল করিম

বেঁচে থাকার সময় শাহ আবদুল করিমকে বলা হতো জীবন্ত কিংবদন্তি। সাম্প্রতিক সময়ে এমন লিজেন্ড কেউ চোখের সামনে দেখেননি, যিনি নিজের নাম নিজেই উচ্চারণ করেন গানে। এ রকম ব্যক্তিত্ব সাধারণত ইতিহাসের অংশ হিসেবে দেখেই আমরা অভ্যস্ত। কিন্তু আমাদের ভাগ্যের ব্যাপার, তিনি আমাদের কাল পর্যন্ত বেঁচেছিলেন। ২০০৯ সালে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। জন্মেছিলেন ১৯১৬ সালে সুনামগঞ্জের কালনী নদীর ধারে। এই কালনী নদী বহুবার বহুভাবে তার গানের মধ্যে ফিরে এসেছে। কখনো তার দুঃখের সাক্ষী হয়েছে, কখনো প্রিয়া হয়ে, কখনো প্রিয়ার কাছে খবর নিয়ে যাবার বাহন হয়ে। সারাজীবন কষ্ট আর দরিদ্রতার সঙ্গে লড়াই করেছেন। সামান্য লোককবি হিসেবেই জীবন অতিবাহিত করেছেন। জীবিত অবস্থাতেই তিনি বাউলসম্রাট খেতাব পেয়েছেন। সারাবাংলার সব বাউলের মতো তার গানেও আছে লোকপ্রভাব, আধ্যাত্মিক সাধনা ও সম্প্রীতির সুর। ভাটি অঞ্চলের মানুষের জীবনের সুখ, প্রেম-ভালোবাসার পাশাপাশি তার গান কথা বলে সব অন্যায়, অবিচার, কুসংস্কার আর সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে। জীবনের শেষ দিকে এসে তিনি সারাবাংলায় জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন কিছু তরুণ শিল্পীর প্রচারণায়। এখন এক নামেই তাকে সবাই চেনেন।

 

আধুনিক গান

বাংলা আধুনিক গানের ধারাটি বিকশিত হয়েছে বাংলা আধুনিক কবিতা ও কবিদের হাত ধরেই। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলই বাংলা আধুনিক গান প্রতিষ্ঠার দুই প্রধান পুরুষ। তাদের সঙ্গে আছেন আরো তিনজন কবি- দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রজনীকান্ত সেন ও অতুলপ্রসাদ সেন। এই পঞ্চকবি মিলে বাংলা আধুনিক গানকে প্রতিষ্ঠিত করেন অনন্য উচ্চতায়। তবে তার আগেই বাংলা আধুনিক গানের সূচনা করেন নিধু বাবু। আঠারো শতরের শেষদিকে নিধু বাবুর টপ্পা বাংলা আধুনিক গানের সূচনা করে। আধুনিক গানের একটা প্রধান প্রবণতা হচ্ছে ঈশ্বরভক্তির বদলে সাধারণ মানব-মানবীর প্রেম প্রতিষ্ঠা। বাংলা বাউল গান থেকে বেরিয়ে এসে আধুনিকেরা কথায় ও সুরে বৈচিত্র্য আনতে শুরু করেন। বাউল গানের ধারা ছিল সহজ সুর সহজ কথা। কিন্তু আধুনিক গানের বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়ালো সুরের গভীরতা ও কথার কাব্যিকতা। পরবর্তীকালে পঞ্চকবির পরে আধুনিক গান আরো বহু শাখায় বহু বৈচিত্র্যে  আবির্ভূত হয়েছে। স্বদেশ আন্দোলন, মানুষের ব্যক্তিক্ষোভ, আশা-ভালোবাসা, শ্রেণিবৈষম্য স্থান পেয়েছে আধুনিক গানে। গণসঙ্গীত আন্দোলনকর্মীরা আধুনিক গানকে করেন বিপ্লবের হাতিয়ার। পঙ্কজ মল্লিক, শচীন দেব বর্মণ, সলিল চৌধুরী, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, ভূপেন হাজারিকা, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, কিশোরকুমার বাংলা আধুনিক গানকে মধ্যবিত্তের কাছে জনপ্রিয় করে তোলেন।  যে বাঙালি সমাজ দীর্ঘকাল বুঁদ হয়ে ছিল বাউল গান, লোকগীতিতে, তাদের সরিয়ে আনলেন নগরকেন্দ্রিক জীবনধারার দিকে। আধুনিক গান মূলত নগরজীবনেরই প্রতিচ্ছবি। একসময় আধুনিক গানই হয়ে গেল মধ্যবিত্তের জীবন। এর মধ্যে কলকাতায় এলো অল ইন্ডিয়া রেডিও আকাশবাণী, ঢাকায় এলো বাংলাদেশ বেতার। রেডিও আধুনিক গানকে ঘরে ঘরে নিয়ে যেতে থাকে খুব দ্রুত। আবির্ভাব ঘটে অনেক প্রতিভাবান সুরকার, গীতিকার ও শিল্পীর। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পূর্ববাংলার নিজস্ব সংস্কৃতি বিকশিত হতে থাকে। আবু হেনা মোস্তফা কামাল, অধ্যাপক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, গাজী মাজহারুল আনোয়ারের মতো গীতিকারদের আবির্ভাব হয় এ অঞ্চলে। তাদের কথায় সুর দিতে আসেন সমর দাস, আলতাফ মাহমুদের মতো সুরকাররা। ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ভর করে বাংলাদেশের স্বাতন্ত্র্য একটি আধুনিক গানের ধারা দাঁড়িয়ে যায়। রুনা লায়লা, এন্ড্রু কিশোর, সাবিনা ইয়াসমিন, খুরশীদ আলম, ফেরদৌসী রহমান, সৈয়দ আবদুল হাদী, আঞ্জুমান আরা বেগম, শাহনাজ রহমতউল্লাহ বাংলাদেশের আধুনিক গানকে নিয়ে যান অনন্য উচ্চতায়।

 

চলচ্চিত্রের গান

বাংলা বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের বিকাশ হয়েছে যাত্রাপালার হাত ধরে। যাত্রায় যেমন গানই প্রাণ, বাংলা চলচ্চিত্রেও তাই গান প্রাধান্য পেয়েছে। অবশ্য এটা ভারতীয় চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে সত্য। মুম্বাই বা কলকাতার চলচ্চিত্রে গান ছিল আলাদা এক সৌন্দর্য। বিশেষ করে উত্তম-সুচিত্রার রোমান্টিক ছবিগুলোতে। চলচ্চিত্রকে ঘিরেই আধুনিক বাংলা গান জনপ্রিয় হয়েছে যেমনটা কলকাতায়, তেমনি ঢাকায়ও। গত শতাব্দীর পঞ্চাশ-ষাটের দশকে হেমন্ত, লতা, সন্ধ্যা, আশা, মান্না দে, কিশোরকুমার বাংলা চলচ্চিত্রের গানকে সারা বাংলায় ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাদেরই অনুপ্রেরণায় দেশভাগের পর এ বাংলায় বাংলা চলচ্চিত্রের গানকে জনপ্রিয় করেন খান আতা, আপেল মাহমুদ, নজরুল ইসলাম বাবু, সমর দাস, সুবল দাস,  আলম খান, সুজেয় শ্যাম, সত্য সাহার মতো সুরকাররা।

তাদের জন্য গান লেখেন  মো. মনিরুজ্জামান, নয়ীম গহর,  আবু জাফর, গাজী মাজহারুল আনোয়ার, আলাউদ্দিন আলী, আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলও তাদের সঙ্গে গীতিকার ও সুরকার হিসেবে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। আর তাদের কথায় ও সুরে কণ্ঠ দেওয়ার জন্য আবির্ভূত হন একঝাঁক গানের পাখি- শাহনাজ রহমতউল্লাহ, ফেরদৌসী রহমান, খুরশীদ আলম, সৈয়দ আবদুল হাদী, আবদুল জব্বার, সাবিনা ইয়াসমিন, রুনা লায়লা ও এন্ড্রু কিশোর। অসংখ্য ছবিতে ব্যবহূত অসংখ্য গান দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ ধরে মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে।

বাংলা চলচ্চিত্রের কথা বললেই চলে আসে বাংলা গানের কথা। বাঙালির সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না বাংলা চলচ্চিত্রের গান একেবারে একাকার করে ফেলেছে। সারেং বউ ছবিতে আবদুল জব্বারের গাওয়া সেই বিখ্যাত গান- ‘ওরে নীল দরিয়া আমায় দে রে দে ছাড়িয়া’ আজো মানুষ গেয়ে বেড়ায়। আজো মানুষ ভুলতে পারেনি ‘মনের মতো বউ’ ছবিতে সাবিনা ইয়াসমিনের গাওয়া সেই অসামান্য গান- ‘এ কী সোনার আলোয় জীবন ভরিয়ে দিলে ওগো বন্ধু কাছে থেকো...’, আজো তরুণ প্রজন্ম প্রাণভরে গায় ‘দোস্ত দুশমন’ ছবির সেই চটুল গান- ‘চুমকি চলেছে একা পথে সঙ্গী হলে দোষ কি তাতে’। নব্বই দশক পর্যন্ত বাংলা চলচ্চিত্রের গানের স্বর্ণযুগ ছিল। তখনো কিছু অসামান্য গানের সৃষ্টি হয়েছিল। নতুন চলচ্চিত্রের হাত ধরে এসেছিল নতুন কিছু গান। এখনো সর্বাধুনিক তরুণদের চলচ্চিত্রে গানই প্রধান প্রাণ। যতদিন বাংলা চলচ্চিত্র থাকবে, ততদিন তার সঙ্গে বাংলা গানও থাকবে।

 

বাংলা ব্যান্ডের গান

স্বাধীনতার পর আজম খান একটি ব্যান্ডদল গঠন করেন। নাম দেন উচ্চারণ। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে তার দু-একটি গান প্রচার হয়- এতো সুন্দর দুনিয়ায় কিছুই রবে নারে... ব্যস, সারা বাংলায় সাড়া পড়ে যায়। তার সঙ্গে এসে যোগ দেন তার কিছু বন্ধু- পিলু মমতাজ, ফকির আলমগীর, ফেরদৌস ওয়াহিদ। ড্রাম, গিটার, কিবোর্ড নিয়ে তারা লাফালাফি করে গান পরিবেশন করেন- নতুন গায়কি ভঙ্গি, অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গি, যা বাঙালি দেখে অভ্যস্ত নয়। ১৯৭৪-৭৫ সালের দিকে তারা পরিবেশন করেন ‘বাংলাদেশ’ শিরোনামের গানটি- রেললাইনের ওই বস্তিতে, জন্মেছিল একটি ছেলে, মা তার কাঁদে, ছেলেটি মরে গেছে। স্বাধীনতা-উত্তর দুর্ভিক্ষপীড়িত বাংলাদেশ আজম খানের বুক চিরে আর্তনাদ করে উঠল। তরুণরা দেখল এ একেবারে নতুন কণ্ঠস্বর, নতুন কথা, সময়ের দাবি। আজম খান আজন্মের জন্য পেয়ে লেগেন ‘গুরু’ উপাধি। ধরতে গেলে তিনি একাই বাংলাদেশের ব্যান্ড গানকে জনপ্রিয় করে তোলেন। তার দেখাদেখি এরপর এলেন লাকী আখান্দ ও হ্যাপী আখান্দ নামে দুই ভাই। হ্যাপী মারা গেলেন ১৯৮৭-তে। তার আগেই তিনি লিজেন্ড হয়ে গিয়েছিলেন।

নব্বই দশক বাংলা ব্যান্ডের স্বর্ণযুগ। তখন একে একে এলেন মাকসুদ, জেমস, আইয়ুব বাচ্চু। তাদের হাত ধরে আরো একঝাঁক তরুণ। নব্বই দশক যে অতিক্রম করেনি, সে কোনোদিন কল্পনাও করতে পারবে না বাংলা ব্যান্ড কী জোয়ার এনেছিল বাংলাদেশে! পুরনো সব জরাজীর্ণতা ফেলে পুরো বাংলাদেশ যেন গা-ঝারা দিয়ে উঠেছিল। বাউল গান, রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুলসঙ্গীত সব যেন পুরনো হয়ে গিয়েছিল। একঘেয়ে ধীরলয়ের সুর আর ভালো লাগছিল না। এর সঙ্গে অবশ্যই পাশ্চাত্য প্রভাবও আছে। যুগটাই তখন ব্যান্ডের। চারদিকে অস্থিরতা। তরুণ প্রজন্ম চায় নাচতে লাফাতে। তাদের কথাগুলো তাদের ভাষায় বলতে। ফিডব্যাক, সোলস, এলআরবি, মাইলস, ফিলিংস, আর্ক, চাইম তখন তুমুল জনপ্রিয় ব্যান্ডদল। তাদের দেখাদেখি অনেক ছোট ছোট ব্যান্ডদল পাড়ায়-মহল্লায় আত্মপ্রকাশ করে। এ কথা সত্য, প্রথম দিকে তাদের অনেক প্রতিবন্ধকতারও মুখোমুখি হতে হয়েছে। মুরব্বি শ্রেণির লোকজন এসব খুব ভালো চোখে দেখেননি। এ যেন অপসংস্কৃতি। কিন্তু তরুণরা দেশমাতৃকা ভুলে যায়নি। ব্যান্ডের গানেও ফিরে আসতে থাকে বাংলা সংস্কৃতি। পুরনো বাউল গানগুলো ফিরে আসতে থাকে নতুন করে। ব্যান্ড গানের মধ্য দিয়ে নতুন এক বাংলাদেশকে উপস্থাপন করে তরুণ প্রজন্ম।

 

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads