• শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads
প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতায় প্রয়োজন যত্ন ও সচেতনতা

প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতা সম্পর্কে এখনো আমরা অনেকেই জানি না

ছবি : ইন্টারনেট

ফিচার

প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতায় প্রয়োজন যত্ন ও সচেতনতা

  • প্রকাশিত ১২ আগস্ট ২০১৮

ফারজানা বীথি

তাহমিনা আহমেদের দ্বিতীয় সন্তান জন্মের পর থেকেই পরিবারের সবাই তার আচরণে বেশকিছু পরিবর্তন লক্ষ করছে, যেমন- সন্তানকে খাওয়ানোর প্রতি অনীহা, অযথা রেগে যাওয়া ইত্যাদি। তাহমিনার স্বামী অফিসের এক সহকর্মীর কথায় তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান। আর তখনই প্রথম তিনি এবং তার পরিবার পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত হয়। প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতা সম্পর্কে এই পরিবারটির মতো এখনো আমরা অনেকেই জানি না।

প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতা কেন হয়

প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতা বা পোস্টপ্যার্টাম ডিপ্রেশন মূলত একধরনের মানসিক সমস্যা, যা সাধারণত সন্তান প্রসবের পরবর্তী সময়ে লক্ষ করা যায়। শিশুর জন্মের পর বিভিন্ন হরমোনের পরিবর্তন, পারিপার্শ্বিক প্রভাব, মানসিক ও জন্মগত বিভিন্ন উপাদান সম্মিলিতভাবে এ ধরনের সমস্যার কারণ হতে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মায়েরা এ সময়ে একটু খিটখিটে আচরণ করতে পারেন, খুব ছোট কারণে রেগে যাওয়া বা কান্নাকাটি করা ইত্যাদি। এই সমস্যাগুলোকে মায়ের আচরণগত সমস্যা হিসেবে ভেবে নিই আমরা অনেকেই। অথচ এ পরিবর্তনগুলো মূলত সন্তান জন্মদানজনিত শারীরিক ধকল, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব এবং হরমোনের বিভিন্ন জানা-অজানা প্রভাবের কারণেই ঘটে থাকে।

এসব সমস্যা বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে যায়, যেমন- মাকে ভয়াবহ আত্মগ্লানি ও বিষণ্নতা গ্রাস করে এবং বিষয়গুলো দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে কিংবা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে।

কীভাবে বুঝবেন আপনি বিষণ্নতায় ভুগছেন

প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতায় মা আক্রান্ত কি-না, সে বিষয়টি বোঝার জন্য মায়ের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে। কিছু বিষয়ে খেয়াল করলে মা বিষণ্নতায় ভুগছেন কিনা বোঝা সম্ভব। যেমন- সহজেই বিরক্ত হওয়া বা অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা, কোনো কিছুতে যথাযথ মনোযোগ দিতে না পারা, দুশ্চিন্তা করা, কান্না বা কান্নার ভাব হওয়া, অকারণে রেগে যাওয়া, দুঃখ বা অপরাধবোধের মতো নেতিবাচক অনুভূতি, পছন্দের কাজগুলোর প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলা, ঘুমের সমস্যা হওয়া, অতিরিক্ত ক্লান্তিবোধ, খাবারে অনীহা, নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা, আক্রমণাত্মক মানসিকতা তৈরি হওয়া, নিজের বা বাচ্চার ক্ষতি করতে চাওয়ার প্রবণতা, ভয়ানক দুঃস্বপ্ন দেখা ইত্যাদি। এসবের বাইরেও মায়ের মধ্যে অন্য কোনো পরিবর্তনও দেখা যেতে পারে। 

বিষণ্নতার কারণ

মায়ের বিষণ্নতার পেছনে নানা ধরনের কারণ কাজ করতে পারে। যেমন- বাচ্চা পালনের মানসিক চাপ, পরিবার ও সামাজিক সহায়তা না পাওয়া, আর্থিক অসচ্ছলতা, অপরিকল্পিত অথবা অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ, বিবাহপূর্ব গর্ভধারণ, আগের বিষণ্নতার ইতিহাস থাকলে, বৈবাহিক সম্পর্কে টানাপড়েন, কর্মজীবী মায়ের চাকরি হারানোর মতো দুশ্চিন্তা, বদমেজাজী বাচ্চা পালন করা, আদর্শ মা না হতে পারার হীনমন্যতায় ভোগা, পরিবার পরিজনের কাছ থেকে পর্যাপ্ত মানসিক সহায়তা না পাওয়া, সাম্প্রতিক তালাক বা বিচ্ছেদ ইত্যাদি বিষয় মায়ের বিষণ্নতার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে।

প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতা কাটিয়ে ওঠার জন্য করণীয়

* প্রসব-পরবর্তী ডিপ্রেশন কাটিয়ে ওঠার জন্য নিজেকেই প্রথম সচেতন হতে হবে। প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতার বিষয়টিকে কোনোভাবেই অবহেলা করা উচিত নয়। ফলে যখনই বুঝবেন আপনি বিষণ্নতায় ভুগছেন, যত দ্রুত সম্ভব বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন। তিনি বিষণ্নতার মাত্রা অনুযায়ী সাইক্রিয়াট্রিস্ট বা কাউন্সেলরের সঙ্গে আলোচনা করার পরামর্শ দেবেন। ভালো কোনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আপনাকে সহযোগিতা করতে পারবেন। সঠিক মেডিটেশন আর সাইকোথেরাপির মাধ্যমে পোস্টপ্যার্টাম ডিপ্রেশন দূর করা সম্ভব। মনে রাখবেন, এ সমস্যা একেবারেই অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়, যা শুধু আপনার সঙ্গেই ঘটছে এবং এটি সম্পূর্ণভাবে নিরাময়যোগ্য।

* সন্তান জন্মের পর মায়ের শারীরিক অবস্থা সাধারণভাবেই কিছুটা নাজুক থাকে। এ সময় কিছু কাজে অন্যের সহযোগিতা নিতে হয়। অনেকে এই নির্ভরশীলতা মেনে নিতে পারেন না। অন্যরা তাকে নিয়ে কী ভাবছেন-এসব বিষয় নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভোগেন, যা একসময় মায়ের জন্য বিষণ্নতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই এ ধরনের চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে হবে।

 * একেবারে ঘরের কোণে বসে না থেকে মাঝে মাঝে শিশুকে নিয়ে ছাদে বা বারান্দায় খোলা বাতাসে, সূর্যের আলোতে গিয়ে বসুন। সন্তানকে নিয়ে সূর্যালোক উপভোগ করুন। এ সময়টা সন্তানের সঙ্গে একান্তই আপনার।

* বন্ধু-বান্ধব, পরিজন এবং আপনি, সঙ্গ পছন্দ করেন এ রকম ব্যক্তিদের সঙ্গে সময় কাটানোর চেষ্টা করুন।

 * শিশুর জন্মের পর নানাজন নানা বিষয়ে পরামর্শ দেন। এ নিয়ে নিজেকে অযোগ্য ভাবার কোনো কারণ নেই। শিশুর ভালো-মন্দ বিষয় নিয়ে আপনার পর্যাপ্ত ধারণা নেই এমনটা ভাবারও কোনো কারণ নেই। সন্তানের জন্য আপনি মঙ্গল কামনা করেন এই বিশ্বাসটিই যথেষ্ট।

* নিজের বিশ্রামের জন্য সময় ভাগ করে নিন। প্রতিদিন নিজের জন্য কিছু সময় বের করার চেষ্টা করুন। বিশ্রামের এ সময়টিতে শিশুকে বড় কারো দায়িত্বে দিয়ে রাখুন। অনেক সময় শিশুর সঙ্গে রাত জাগতে হয় বলে দিনের বেলায় মায়ের ঘুম অত্যন্ত জরুরি। এ সময়টুকু নিজেকে বের করে নিতে হবে।

* বিষণ্নতা কাটিয়ে ওঠার জন্য নিজেকে সবসময় প্রফুল্ল রাখা প্রয়োজন। সারা দিনের ব্যস্ত সময়ের মধ্য থেকেও নিজের জন্য আলাদা একটু সময় বের করুন। একটু সময় নিয়ে আরাম করে গোসল করে নিন। সবসময় চেষ্টা করুন পরিচ্ছন্ন এবং পরিপাটি কাপড় পরতে। হালকা একটু সাজও মনকে প্রফুল্ল রাখতে সহায়তা করবে। একা একা না থেকে পরিবারের সবার সঙ্গে সময় কাটান।

প্রসূতি মায়ের পরিবার-পরিজনদেরও রয়েছে কিছু করণীয়

* নতুন মায়ের বিষণ্নতা কাটিয়ে ওঠার ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি সহনশীল এবং আন্তরিক হতে হবে নবজাতকের বাবাকে। এ সময় মায়ের হঠাৎ পরিবর্তিত আচরণগুলোকে ধৈর্যসহকারে মেনে নেওয়া এবং পরিবারের  অন্যদের এ বিষয়ে সহনশীল হওয়ার জন্য তাদের বোঝাতে হবে।

* সন্তান প্রসবের সময় মায়ের যে শারীরিক ধকল যায়, তা কাটিয়ে ওঠার জন্য মায়ের প্রয়োজন পর্যাপ্ত বিশ্রাম। কিন্তু নবজাতকের দেখাশোনার জন্য তাকে এ সময় আরো বেশি ব্যস্ত সময় কাটাতে হয়। রাতের পর রাত জাগতে হয়। ফলে স্বভাবতই শারীরিক ক্লান্তি এবং মানসিক অবসাদ মায়ের মাঝে ভর করে। এ সময় প্রসূতির প্রতি অবশ্যই সবার নমনীয় এবং সহনশীল আচরণ করা প্রয়োজন। এ সময় যতখানি সম্ভব মাকে বিশ্রামের সুযোগ দিতে হবে।

* মাকে প্রফুল্ল রাখতে হবে। তাকে যতখানি পারা যায়, পরিবারের সবাইকে মিলে সঙ্গ দিতে হবে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads