• সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads
দেলোয়ারা বেগমের সফলতার গল্প

নিজ বাড়িতেই ব্লক-বুটিক সম্পর্কে নারীদের প্রশিক্ষণ দেন দেলোয়ারা বেগম

ছবি : বাংলোদেশের খবর

ফিচার

নারী উদ্যোক্তা

দেলোয়ারা বেগমের সফলতার গল্প

  • প্রকাশিত ১২ আগস্ট ২০১৮

শওকত জামান

সংসারের কাজের ফাঁকে শখের বশে ব্লক-বুটিকের কাজ করতেন দেলোয়ারা বেগম। নিজ বাড়িতেই ব্লক-বুটিক সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেন আশপাশের নারীদের। শৈল্পিক এ কাজের নেশা কখন যে পেশায় পরিণত করে বুঝতেই পারেননি। ব্লক-বুটিকের সঙ্গে যোগ হয় হস্তশিল্প। আজ হস্তশিল্পের সফল উদ্যোক্তা তিনি। মিলেছে জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ নারী উদ্যোক্তার স্বীকৃতি। কেমন আছেন এই সফল নারী উদ্যোক্তা।বাংলাদেশের খবরের সঙ্গে আলঅপচারিতায় তার সফলতার গল্প বলেন দীপ্ত কুটিরের সত্তাধিকারী দেলোয়ারা বেগম।

তিনি জন্ম নিয়েছেন ময়মনসিংহ শহরের কাঁচিঝুলি এলাকায় হামিদ উদ্দিন রোডে। সেখানেই বেড়ে ওঠা। বৈবাহিক সূত্রে জামালপুরে আসা। বিয়ে হয়েছে জামালপুর সদর উপজেলার নিভৃত পল্লী হাজিপুর গ্রামের নিজাম উদ্দিনের সঙ্গে। ২০০১ সালে সন্তানদের ভালো স্কুলে লেখাপড়া করানোর জন্য জামালপুর শহরে বাসা ভাড়া নেন। দুই ছেলেসহ স্বামী নিয়ে চারজনের ছোট্ট সংসার। বড় ছেলে শাকির উদ্দিন দীপ্ত ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে বিবিএতে ও ছোট ছেলে ফয়সাল মাহমুদ সুপ্ত নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটিতে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়ছে। আগে থেকেই শৈল্পিক কাজের প্রতি বেশ আগ্রহ ছিল তার। বাড়িতে সংসারে কাজের ফাঁকে ব্লক-বুটিকের কাজ করতেন এবং আশপাশের মহিলাদের শিখাতেন। শখের বশে এ কাজ চলে ২০০৪ সাল পর্যন্ত। হস্তশিল্প বিশেষ করে সুচি শিল্পের জন্য বিখ্যাত জামালপুর শহর। তার মাথায় আসে সুচি শিল্পের এই শহরে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ব্লক-বুটিকের পাশাপাশি হস্তশিল্পের কাজ শুরু করলে কেমন হয়? যেই চিন্তা সেই কাজ। মাত্র পাঁচ হাজার টাকা পুঁজি হাতে নিয়ে মাঠে নেমে পড়েন। শুরু করেন ব্যবসা। গড়ে তোলেন দীপ্ত কুটির নামে হস্তশিল্পের প্রতিষ্ঠান। কঠোর পরিশ্রমে দিনকে দিন তার ব্যবসার পরিধি বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে দেখা দেয় পুঁজি সঙ্কট। তবে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। ক্ষুদ্রঋণ নেন বিভিন্ন এনজিওর কাছ থেকে। সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে থাকে দেলোয়ারার হস্তশিল্পের ব্যবসা। ২০০৯ সালে ন্যাশনাল ব্যাংক এসএমই ঋণ চালু করলে আবেদন করেন তিনি। পাঁচ লাখ টাকা ঋণ উত্তোলন করে ব্যবসায় বিনিয়োগ করেন। ব্যবসা করে দুই বছরের মধ্যে ঋণ পরিশোধ হলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ২০১১ সালে ১৫ লাখ পর্যায়ক্রমে ৫০ লাখ, সবশেষে ৭০ লাখ টাকা ঋণ দেয় তাকে। বিশাল অঙ্কের পুঁজি খাটানোয় তরতর করে বেড়ে ওঠে হস্তশিল্পের ব্যবসাটি। বর্তমানে দীপ্ত কুটিরের কারখানায় ৩৫ জন ও মাঠ পর্যায়ে দুই শতাধিক কর্মী নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তারা সুই সুতোর কারুকাজখচিত নানা বাহারি ডিজাইনের পণ্য তৈরি করছে তার প্রতিষ্ঠান। যেমন- থ্রিপিস, পাঞ্জাবি, নকশিকাঁথা, বেডশিট, কুশনকভার, শাড়ি, বিভিন্ন আইটেমের ব্যাগ ও হাতপাখাসহ নানা হস্তজাত পণ্য। গুণগত দিক থেকেও দীপ্ত হস্তশিল্পের পণ্য জেলায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এর সুনাম। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ক্রেতা আসতে থাকে। ঢাকায় এসএমই মেলা, যুব মেলা এবং ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প মেলায় অংশ নেন তারা। ২০১২ সালে যুব উন্নয়ন অধিদফতর নারী কোটায় দেলোয়ারা বেগম শ্রেষ্ঠ উদ্যোক্তার জাতীয় পুরস্কার গ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে। একই বছর শ্রেষ্ঠ আত্মকর্মী হিসেবে জাতীয় যুব পুরস্কার, বর্ষসেরা ক্ষুদ নারী উদ্যোক্তা হিসেবে জাতীয় এসএমই উদ্যোক্তা-২০১২ নির্বাচিত হন। ২০১৩ সালে এসএমই ফাউন্ডেশন থেকে ক্ষুদ্র ও নারী উদ্যোক্তা হিসেবে জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন। এ ছাড়াও বিভিন্ন মেলায় অংশ নিয়ে ২০১৩ সালে তৃণমূল নারী উদ্যোক্তা সংগঠন থেকে উদ্যোগ ও উদ্যোক্তা ক্যাটাগরিতে সন্মাননা, মানবাধিকার সন্মাননা পদক-২০১৩, সফল নারী উদ্যোক্তার পদক, ২০১৬ সালে ময়মনসিংহে এসএমই পণ্য মেলায় প্রথম, ২০১৭ সালে জাতীয় এসএমই পন্য মেলা-২০১৭-এ দ্বিতীয় পুরস্কার পান তিনি। এক পর্যায়ে দীপ্ত কুটিরের হস্তশিল্পের পণ্য পরিচিতি লাভ করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে। বাংলাদেশ উন্নয়ন ব্যুরোর মাধ্যমে নেপালে তিনবার, চীনে আটবার, ভারতের রাজধানী দিল্লিতে দু’বার, পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতায় চারবার, পশ্চিমবঙ্গের আরেক শহর শিলিগুড়িতে দু’বার ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় হস্তশিল্পের মেলাগুলোতে অংশ নেয় তার প্রতিষ্ঠান। সুযোগ পেলে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে মেলা করার ইচ্ছা রয়েছে তার।

জামালপুর জেলা হস্তশিল্প মালিক সমিতির সহ-সভানেত্রী দেলোয়ারা বেগম বাংলাদেশের খবরকে আরো জানিয়েছেন, শহরের প্রাণকেন্দ্র তমালতলা মোড়ে ৪ শতাংশ জমির ওপর দীপ্ত কুটিরের পাঁচতলা নিজস্ব ভবন নির্মাণাধীন রয়েছে। তিনি অসহায় নারীদের পুনর্বাসন কেন্দ্র গড়ে তোলার জন্য শহরের মুকুন্দবাড়ি এলাকায় ১২ শতাংশ জমি কিনেছেন। তিনি বেকার নারীদের উদ্দেশে বলেন, নিজেকে অসহায় না ভেবে হাতটি কর্মক্ষম করে অটুট লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যান, সাফল্য আসবেই। জামালপুর জেলা ব্র্যান্ডিং হস্তশিল্প হওয়ায় সম্ভাবনার দুয়ার খুলে গেছে জামালপুরের হস্তশিল্পে। শিল্পটি সমৃদ্ধ করতে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে এসএমই ফাউন্ডেশন। লোলুপ দৃষ্টি পড়েছে রাজনৈতিক নেতাদের। তারা নতুন করে মালিক সমিতি গঠন করছে জেলা ব্র্যান্ডিংয়ে অংশ নিতে। তবে সেখানে প্রকৃত ও প্রতিষ্ঠিত হস্তশিল্প প্রতিষ্ঠান মালিকরা নেই। সত্যিকারের ব্যবসায়ীরা জেলা ব্র্যান্ডিংয়ে অংশ নিতে না পারলে মুখ থুবড়ে পড়বে জেলা ব্র্যাডিং কর্মযজ্ঞটি।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads