• রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
ads
বিশ্ববিখ্যাত প্রয়াত দশ মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধান

বিশ্ববিখ্যাত প্রয়াত দশ মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধান

সংরক্ষিত ছবি

ফিচার

বিশ্ববিখ্যাত প্রয়াত দশ মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধান

  • প্রকাশিত ২৬ আগস্ট ২০১৮

মুসলিম আধিপত্যের ইতিহাস যেমন আলোকোজ্জ্বল, তেমন আঁধার আচ্ছন্ন। যুগে যুগে মুসলিম নেতাদের প্রভাবশালী শাসনে সমৃদ্ধ হয়েছে দেশ-জনপদ। উপকৃত হয়েছে মানুষ। ইতিহাসের সোনালি অধ্যায়ে চিরভাস্বর হয়ে আছে বহু মুসলিম ব্যক্তিত্বের নাম। তাদের অবদানের আলোচনায় সমৃদ্ধ হয়ে আছে পৃথিবীর পাঠ। কোথাও কোথাও ক্ষতচিহ্নের মতো দাগ কেটে আছে বহু মুসলিম নেতৃত্ব অবসানের গল্প। বিশ্ববিখ্যাত প্রয়াত দশ মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধানের সংক্ষিপ্ত জীবন ইতিহাস নিয়ে আজকের আয়োজন। জন্ম সাল অনুযায়ী রাষ্ট্রপ্রধানদের জীবনীতথ্যমূলক ধারাবাহিক ক্রমসূচি সাজিয়ে আয়োজনটি তৈরি করেছেন মিরাজ রহমান, কামরুল আহসান ও সৈয়দ ফয়জুল আল আমীন

 

মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক পাশা, তুরস্ক

জন্ম : ১৮৮১ , মৃত্যু : ১৯৩৮

 

মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক পাশা ছিলেন উসমানীয় সামরিক কর্মকর্তা, বিপ্লবী রাজনীতিক, লেখক এবং তুরস্কের প্রথম রাষ্ট্রপতি। তিনি নিরঙ্কুশ একনায়ক হলেও আধুনিক তুর্কি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা। আতাতুর্ক ১৮৮১ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার মা জুবায়দা হানিম ও বাবা আলি রিজা এফেন্দি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে উসমানীয় সাম্রাজ্যের পরাজয়ের পর তুরস্কের স্বাধীনতা যুদ্ধে তিনি তুর্কি জাতীয় আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। আঙ্কারায় একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি মিত্রশক্তির বাহিনীকে পরাজিত করেন। তার সামরিক অভিযানের ফলে তুরস্ক স্বাধীনতা লাভ করে।

এরপর আতাতুর্ক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংস্কার কার্যক্রম শুরু করেন। তার সংস্কার আন্দোলনের মূলনীতির ওপরই আধুনিক তুরস্ক প্রতিষ্ঠিত। তার মতবাদ ‘কামালবাদ’ নামে পরিচিত। ১৯২৪ সালে তিনি তুরস্কের শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের জন্য আমেরিকান শিক্ষা সংস্কারক জন ডেওয়েকে আঙ্কারায় আমন্ত্রণ জানান। রাষ্ট্রীয় বিদ্যালয়গুলো একটি সাধারণ পাঠ্যক্রম অনুসরণ করে, যা ‘শিক্ষার একীভূতকরণ’ বলে পরিচিতি পায়। তিনি সর্বপ্রথম সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য হ্যাট বাধ্যতামূলক করেন। তার জীবদ্দশায় শিক্ষার্থী ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য পোশাক বিধিমালা প্রণীত হয়। তার সংস্কারের সর্বশেষ অংশ ছিল পাগড়ির মতো ধর্মভিত্তিক পোশাকের পরিবর্তে আধুনিক পশ্চিমা স্যুট ও নেকটাই, সেই সঙ্গে হ্যাট পরিধান করা। ১৯৩৮ সালে তার মৃত্যুর আগপর্যন্ত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংস্কারকাজ চালিয়ে যান। এর মাধ্যমে তিনি তুর্কি সমাজকে একটি আধুনিক, গণতন্ত্রী ও ধর্মনিরপেক্ষ জাতিতে পরিণত করেন।

 

 

মুহাম্মদ নজিব, মিসর

জন্ম : ১৯০১ , মৃত্যু : ১৯৮৪  

 

মুহাম্মদ নজিব ছিলেন মিসরের প্রথম প্রেসিডেন্ট। তিনি ছিলেন সামরিক বাহিনীর একজন ঊর্ধ্বতন অফিসার। ১৯৫২ সালে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে একদল সেনাঅফিসার বিদ্রোহ করে। তার নেতৃত্বে মিসরে দীর্ঘকাল ধরে চলমান মোহাম্মদ আলী রাজত্বের শেষ বংশধর দ্বিতীয় ফুহাদের পতন হয়। রাজতন্ত্র হটিয়ে তারা প্রজাতন্ত্র কায়েম করেন। খুব অল্প দিনই তিনি ক্ষমতায় থাকতে পেরেছিলেন। তার মেয়াদকাল ছিল ১৯৫৩ সালে ১৮ জুন থেকে ১৯৫৪ সালের ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত। তারই বন্ধু এবং সহযোদ্ধা জামাল আবদেল নাসেরের সঙ্গে বিরোধিতার কারণে তাকে পদত্যাগ করতে হয়। নাসের ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। তাকে হটিয়ে নাসের ক্ষমতায় আসীন হন। ১৮ বছর গৃহবন্দি থাকার পর মিসরের তৃতীয় প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত ক্ষমতায় এসে তাকে মুক্ত করেন। মুহাম্মদ নজিবকে আধুনিক মিসরের স্থপতি বলা যায়। কারণ দীর্ঘকাল ধরে মিসর ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও ঔপনিবেশিকতার অধীনে। সেখান থেকে স্বদেশকে মুক্ত করে তিনি একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠা করেন। তা ছাড়া মিসরে জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা এবং সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতায়ও তার ভূমিকা অনস্বীকার্য। তিনি জন্মেছিলেন ১৯০১ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি। পলিটিক্যাল সায়েন্সে মাস্টার ডিগ্রি সম্পন্ন করে তিনি সামরিক বাহিনীতে চাকরি নেন। ইংরেজি, ফ্রান্স, ইতালি, জার্মানসহ তিনি অনেক ভাষায় দক্ষ ছিলেন। অনুবাদক হওয়াই ছিল তার প্রথম জীবনের ইচ্ছা। সামরিক বাহিনীতেও তিনি সফল হয়েছিলেন। ১৯৫২ সালের মিসর বিপ্লব তার জীবনকেই আমূল বদলে দিল, তিনিও বদলে দিলেন মিসরকে। তিনি ছিলেন ইসরাইলবিরোধী এক প্রবল কণ্ঠস্বর। আরব সীমান্তে ইসরাইলি বসতি তিনি কোনোদিন মেনে নেননি।

 

আহমেদ সুকর্ন, ইন্দোনেশিয়া

জন্ম : ১৯০১ , মৃত্যু : ১৯৭০ 

 

আহমেদ সুকর্ন ইন্দোনেশিয়ার প্রথম প্রেসিডেন্ট। তিনি ইন্দোনেশিয়ার জাতির জনক। ১৯৪৫ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত তিনি ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। একসময় ইন্দোনেশিয়া ছিল ব্রিটিশ, পর্তুগিজদের উপনিবেশ। তাদের হাত থেকে ক্ষমতা নিয়ে ডাচরা এখানে উপনিবেশ গড়ে তোলে। সুমাত্রা, জাভা, বোর্নিও, সিলিবিস, মালাক্কা, বলিদ্বীপসহ এরকম প্রায় একশ’ দ্বীপ নিয়ে ইন্দোনেশিয়া গঠিত। ওলন্দাজদের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করার জন্য আহমেদ সুকর্ন ১৯২৭ সালে ‘ইন্দোনেশিয়ান ন্যাশনাল পার্টি’ গঠন করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে ওলন্দাজরা জার্মানদের কাছে পরাজিত হলে ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে জাপানের সামরিক সহযোগিতায় আহমেদ সুকর্ন আন্দোলন শুরু করেন। জাপানও দীর্ঘদিন এই ভূখণ্ড দখল করে  রেখেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান পরাজিত হলে ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের ১৭ আগস্ট সুকর্নর নেতৃত্বে ইন্দোনেশিয়ার জাতীয়তাবাদী দল স্বাধীনতা ঘোষণা করে। দেশ স্বাধীন হলে আহমেদ সুকর্ন ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত হন। ১৯৬৩ সালে তিনি নিজেকে আজীবনের প্রেসিডেন্ট ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু দেশের মধ্যে কমিউনিস্টদের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার কারণে যুক্তরাষ্ট্র তাকে মেনে নেয়নি। ১৯৬৮ সালে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক চক্রান্তের কারণে সুকর্ন রাজনৈতিক জীবন থেকে অবসর গ্রহণ করতে বাধ্য হন। সুকর্নের পুরো নাম কুসনো সুসরোদিহার্দজু। তার জন্ম ১৯০১ সালের ৬ জুন, মৃত্যু ১৯৭০ সালের ২১ জুন। তিনি বান্দুং টেকনিক্যাল কলেজ থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিগ্রি লাভ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়েই তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তার শাসনামলেই ইন্দোনেশিয়া একটি আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়।

 

আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি, ইরান

জন্ম : ১৯০২ , মৃত্যু : ১৯৮০

 

আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি ছিলেন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা। তিনি মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভিকে এক ইসলামিক গণজাগরণের মধ্য দিয়ে পদচ্যুত করেন। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ আড়াই হাজার বছরের রাজতন্ত্র উৎখাত হয়ে ইরানে ইসলামী প্রজাতন্ত্র চালু হয়। আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ  খোমেনি ছিলেন একজন বিপ্লবী নেতা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইরান চলে গিয়েছিল আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদের অধীনে। তার সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক সরকার। এর আগে থেকেই ইরানে ছিল ব্রিটিশদের পুতুল সরকার। মূলত ইরানের তেলের খনিগুলোর দখল নেওয়াই ছিল এদের উদ্দেশ্য। তখন রুহুল্লাহ খোমেনি গণআন্দোলনের ডাক দেন। এর জন্য তাকে অত্যাচার নিগৃহের শিকার হতে হয়েছে বহুবার। স্বদেশ ত্যাগ করে তিনি প্রথমে ইরাক, তুরস্ক ও পরে ফ্রান্সে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। সেখান থেকেই চালিয়েছেন বৈপ্লবিক কার্যক্রম। অবশেষে এক রক্তাক্ত বিপ্লবের মধ্য দিয়ে রাজতন্ত্রের পতন ঘটান। ধূলিসাৎ করে দেন সব বিদেশি চক্রান্তও। ১৪ বছর পর যেদিন তিনি দেশে ফিরে এসেছিলেন সেদিন রাস্তায় নেমেছিল ৭০ লাখ মানুষ। তিনি ইসলামী বিপ্লবের ডাক দিলেন। ইসলামিক আইনে সংবিধান রচনা করলেন। ফরাসি ও রুশ বিপ্লবের পরে ইরানের সেই ইসলামিক বিপ্লবকে বলা হয় তৃতীয় জনবিপ্লব। ১৯৮০ সালে ক্যানসার আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৬০ বছর বয়সে তিনি মারা যান। সেই থেকে ইরান আজো তার নির্দেশিত পথে চলছে। রুহুল্লাহ খোমেনি ছোটবেলা থেকেই ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। মাত্র সাত বছর বয়সেই তিনি কোরআনে হাফেজ হয়েছিলেন। তারপর খুব অল্প বয়সেই ইসলামী জ্ঞান সম্পর্কে এতটা সুপণ্ডিত হয়ে ওঠেন যে, তাকে ইমাম আখ্যা দেওয়া হয়।

 

ফয়সাল বিন আবদুল আজিজ, সৌদি আরব

জন্ম : ১৯০৯ , মৃত্যু : ১৯৭৫

 

বাদশা ফয়সাল বিন আবদুল আজিজ আল সৌদ আধুনিক সৌদি রাষ্ট্রের পথিকৃৎ। আধুনিক সৌদি আরব গঠন ও নিমার্ণের নেপথ্যে তার অবদান সবচেয়ে বেশি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সৌদি রাষ্ট্রকে তিনি অত্যন্ত দক্ষ হাতে সুসংহত করেছেন। পাশাপাশি এক করার চেষ্টা করেছেন মুসলিম উম্মাহকে। সৌদি বাদশাহদের মধ্যে তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছিলেন। তার রাজত্বকাল ছিল ১৯৬৪ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত। তিনি জন্মেছিলেন ১৯০৯ সালে। পিতা আবদুল আজিজ ইবনে সৌদের বাদশাহী আমলে ১৯৩০ সাল থেকে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছিলেন। তিনি ছিলেন পিতার সন্তানদের মধ্যে সবচেয়ে সুযোগ্য। মাত্র ১৪ বছর বয়সে পিতা তাকে যুক্তরাজ্য সফরে পাঠিয়েছিলেন। বাদশা ফয়সাল দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং আধুনিকীকরণ ও সংস্কারে সফল হন। তার বৈদেশিক নীতির মূল দিক ছিল প্যান ইসলামিজম, কমিউনিজম বিরোধিতা, ফিলিস্তিনি দাবির সমর্থন। ১৯৬৪ সালে বড়ভাই সৌদ বিন আবদুল আজিজের কাছ থেকে একপ্রকার জোর করেই তিনি ক্ষমতা গ্রহণ করেন। তখন থেকেই সৌদি রাজবংশে ভাইয়ে ভাইয়ে প্রবল দ্বন্দ্ব মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। উলামাদের এবং রাজপরিবারের সমর্থনে ফয়সালকে বাদশাহ ঘোষণা করা হলে তিনি এক ভাষণে বলেন, আমি আপনাদের কাছে নিবেদন করছি, ভাইয়েরা আমাকে ভাই ও সেবক হিসেবে আমার প্রতি লক্ষ্য রাখবেন। তার দশ বছরের শাসনামলে তিনি সৌদিরাষ্ট্রের ব্যাপক উন্নতি করেছেন। তার জনপ্রিয়তার মূলে ছিল মুসলিম জাহানে স্বার্থে তার নিবেদিত প্রাণ। যা এখনকার আর কোনো সৌদি বাদশাহর মধ্যে তেমন একটা দেখা যায় না। ১৯৭৫ সালে তার ভাইপো ফয়সাল বিন মুসাইদের হাতে তিনি নিহত হন।

 

শেখ মুজিবুর রহমান, বাংলাদেশ

জন্ম : ১৯২০ , মৃত্যু : ১৯৭৫

 

শেখ মুজিবুর রহমান ভারতীয় উপমহাদেশের একজন অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, যিনি বাঙালির অধিকার রক্ষায় পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাকে বাংলাদেশের ‘জাতির জনক’ বা ‘জাতির পিতা’ বলা হয়ে থাকে। তিনি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী লীগের সভাপতি, বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি এবং পরবর্তী সময়ে এদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। পাকিস্তানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন এবং পাকিস্তানের গোষ্ঠীগত বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও বাঙালিদের আন্দোলনকে স্বাধীনতার পথে ধাবিত করার জন্য তিনি ব্যাপকভাবে প্রশংসিত। ২০০৪ সালে বিবিসি’র বাংলা রেডিও সার্ভিস বিশ্বব্যাপী যে জরিপ চালায়, তাতে মুজিব সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে বিবেচিত হন। শেখ মুজিব ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ তদানীন্তন ভারতীয় উপমহাদেশের বঙ্গ প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৬ সালে লাহোরে বিরোধী দলগুলোর জাতীয় সম্মেলনে তিনি ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি পেশ করেন, তাতে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের পরিপূর্ণ রূপরেখা উল্লেখিত হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে তিনি যে ভাষণ দিয়েছিলেন; সেটি পৃথিবীর সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ভাষণগুলোর মধ্যে অন্যতম ভাষণ হিসেবে বিশ্বের ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে তিনি স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন এবং বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। পরবর্তীকালে তিনি প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে একদল বিপথগামী সেনা কর্মকর্তা বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের নির্মমভাবে হত্যা করে।

 

ইয়াসির আরাফাত, ফিলিস্তিন

জন্ম : ১৯২৯ , মৃত্যু : ২০০৪

 

ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রাণপুরুষ ও মহানায়ক ইয়াসির আরাফাত। ১৯২৯ সালের ২৪ আগস্ট মিসরের কায়রোয় তাঁর জন্ম। একজন স্বাধীনতাকামী বীর হিসেবে বাংলাদেশেও যার রয়েছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা। প্যালেস্টাইন লিবারেশন অরগানাইজেশন (পিএলও)-এর চেয়ারম্যান হিসেবে আরাফাত ইসরাইলি দখলদারির বিরুদ্ধে সারাজীবন সংগ্রাম করেন। তিনি প্যালেস্টিনিয়ান অথরিটির প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৪ সালে তিনি কায়রোর ইউনিভার্সিটি অব কিং ফুয়াদ ওয়ানে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তির পর ১৯৪৮ সালে আরব-ইসরাইল যুদ্ধের সময় বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করে মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে ফিলিস্তিনের পক্ষে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৫০ সালে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করার পর তিনি ইহুদিবাদ ও জায়ানিজম সম্পর্কে পড়াশোনা করেন। একই সময় ফিলিস্তিনের মুক্তি সংগ্রামের জন্য অস্ত্র সংগ্রহ শুরু করেন। সত্তরের দশকে জর্ডান থেকে বিতাড়িত হয়ে তিনি লেবাননে অবস্থান নেন। ১৯৯১ সালের মাদ্রিদ সম্মেলন, ১৯৯৩ সালের অসলো চুক্তি এবং ২০০০ সালের ক্যাম্প ডেভিড সম্মেলনের মাধ্যমে আরাফাত ইসরাইলিদের সঙ্গে কয়েক দশকের সংঘাতের অবসান ঘটানোর প্রয়াস নেন। ১৯৯৪ সালে ঐতিহাসিক অসলো চুক্তি স্বাক্ষরের পর আইজাক রবিন, শিমন পেরেজ ও ফিলিস্তিনের অবিসংবাদিত নেতা ইয়াসির আরাফাত যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। ২০০২ থেকে ২০০৪ সালের শেষভাগ পর্যন্ত ইসরাইলি সেনাবাহিনীর হাতে নিজের রামাল্লার দফতরে কার্যত গৃহবন্দি হয়ে থাকেন। ২০০৪ সালের শেষদিকে আরাফাত অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং কোমায় চলে যান। সে বছরই নভেম্বরের ১১ তারিখে প্যারিসে চিকিৎসারত অবস্থায় ৭৫ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

 

 

এ. পি. জে. আবদুল কালাম, ভারত

জন্ম : ১৯৩১ , মৃত্যু : ২০১৫

 

আপাদমস্তক স্বপ্নবাজ আবুল পাকির জয়নুল-আবেদিন আবদুল কালাম ছিলেন ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের একাদশ রাষ্ট্রপতি। ভালোবাসতেন স্বপ্ন দেখতে, স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে যেতে আর স্বপ্ন ছড়িয়ে দিতেন আগামী প্রজন্মের কাছে। কালামের পরিবার ছিল অত্যন্ত গরিব। অল্প বয়স থেকেই পরিবারের ভরণপোষণের জন্য তাকে কাজ শুরু করতে হয়। একজন বিজ্ঞানী হিসেবে কালাম তার কর্মজীবন শুরু করলেও পরে তিনি ভারতের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। কালামের জন্ম ১৯৩১ সালের ১৫ অক্টোবর বর্তমান ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের রামেশ্বরমে। তিনি পদার্থবিদ্যা বিষয়ে সেন্ট জোসেফ’স কলেজ থেকে এবং বিমান প্রযুক্তিবিদ্যা (অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং) বিষয় নিয়ে মাদ্রাজ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) থেকে পড়াশোনা করেন। এরপর চল্লিশ বছর তিনি প্রধানত রক্ষা অনুসন্ধান ও বিকাশ সংগঠন (ডিআরডিও) এবং ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থায় (ইসরো) বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞান প্রশাসক হিসেবে কাজ করেন।

বিজ্ঞানী, রাষ্ট্রপতি এবং লেখক হিসেবে ভারতে তার অবদান অসামান্য। তার হাত ধরেই সাফল্যের শিখরে পৌঁছেছে ভারতের মহাকাশ গবেষণা। ভারতের রকেট ও মিসাইল প্রযুক্তিতে তার অবদান সবার আগে। ‘অগ্নি’ও ‘পৃথ্বি’র মতো পারমাণবিক অস্ত্রবাহী মিসাইল প্রযুক্তি পূর্ণতা পেয়েছে তার হাত ধরেই। এজন্য তাকে ‘মিসাইল ম্যান অব ইন্ডিয়া’ আখ্যায়িত করা হয়। ২০০২ সালে কালাম তৎকালীন শাসকদল ভারতীয় জনতা পার্টি ও বিরোধী দল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সমর্থনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ভারতের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ভারতরত্নসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সম্মান ও পুরস্কার লাভ করেছেন কালাম। ২০১৫ সালের ২৭ জুলাই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

 

সাদ্দাম হুসাইন, ইরাক

জন্ম : ১৯৩৭ , মৃত্যু : ২০০৬

 

সাম্প্রতিক সময়ের মুসলিম প্রেসিডেন্টদের মধ্যে ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হুসাইন সবচেয়ে আলোচিত। ২০০৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র সরকার তাকে ফাঁসি দেয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি ধ্বংসাত্মক জীবাণু অস্ত্র তৈরি করছেন। এ জন্য ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃ্ল্লেত্ব কয়েকটি রাষ্ট্র ইরাক আক্রমণ করে। যদিও পরবর্তী সময়ে এ রকম কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পরে যুক্তরাষ্ট্রের এক সামরিক অফিসার স্বীকার করেছেন, ইরাক আক্রমণ আমেরিকার জন্য ছিল সবচেয়ে বড় ভুল। এই নিয়ে আমেরিকা আন্তর্জাতিক মহলে অনেক সমালোচিতও হয়েছে। কিন্তু যা সর্বনাশ হওয়ার তা তো হয়ে গেছে। পুরো ইরাক শেষ হয়ে গেছে।

সাদ্দামের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেছে মুসলিম জাহানের একটা শক্তিও। সেই ৯০ দশক থেকেই তিনি মুসলিম বিশ্বের একটা প্রধান কণ্ঠস্বর ছিলেন। যদিও ১৯৮০ সালে ইরান আক্রমণ করার জন্য তিনি সমালোচিত হয়েছিলেন। ১৯৯১ সালে তিনি উপসাগরীয় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। জীবনের বেশির ভাগ সময় গেছে তার যুদ্ধে যুদ্ধেই। সাদ্দাম হুসাইন ১৯৩৭ সালের ২৮ এপ্রিল ইরাকের তিকরিতের ্লআল-আওজায় এক মেষপালক গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন। তার পুরো নাম সাদ্দাম হুসাইন আবদুল মাজিদ আল তিকরিতি। তার মা সুবহা তুলফা আল মুসসালাত তার নাম রাখেন সাদ্দাম। যার আরবি মানে  ‘যিনি মোকাবেলা করেন’।

স্কুলজীবনের গণ্ডি পেরুতেই তিনি ইরাকের বাথপার্টির সদস্য হন। বাথিজম হচ্ছে আরব জাতীয়তাবাদী ও সমাজতন্ত্রবাদী একটি মিশ্র চেতনা। ১৯৭৯ সালের ১৬ জুলাই তিনি ইরাকের পঞ্চম প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় আরোহণ করেন আর চার দশক দেশ শাসনের পর ২০০৩ সালের ৯ এপ্রিল তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। 

 

মুয়াম্মার আল-গাদ্দাফি, লিবিয়া

জন্ম : ১৯৪২ , মৃত্যু : ২০১১

 

আফ্রিকার লৌহমানব হিসেবে পরিচিত লিবীয় নেতা মুয়াম্মার আল-গাদ্দাফি ১৯৬৯ সালে মাত্র ২৭ বছর বয়সে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছিলেন। দীর্ঘ ৪২ বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনা করে গেছেন দোর্দণ্ড প্রতাপে। মার্কিন, ব্রিটিশ ও ইতালিয়ান সেনা ঘাঁটি উচ্ছেদের পাশাপাশি দেশের তেলসম্পদ জাতীয়করণ করে লিবিয়াকে তিনি মুসলিম বিশ্বের অন্যতম সম্পদশালী এবং শক্তিশালী একটি রাষ্ট্রে পরিণত করেছিলেন। ১৯৪২ সালের ৭ জুন লিবিয়ার সিরত শহরে এক যাযাবর বেদুইন পরিবারে জন্মগ্রহণ করা গাদ্দাফি স্কুলে অধ্যয়নকালেই সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে লিবিয়ার শাসনক্ষমতা দখল করার পরিকল্পনা করেন। ১৯৬৩ সালে তিনি বেনগাজীর সামরিক পরিষদে যোগদান করেন এবং ১৯৬৬ সালে ব্রিটেন থেকে কমিশনপ্রাপ্ত অফিসার পদে উন্নীত হয়ে লিবিয়ায় ফিরে যান। ১৯৬৯ সালের সেপ্টেম্বরে তৎকালীন রাজা মো. ইদ্রিস আল সেনুসি তুরস্কে গেলে গাদ্দাফি অল্প কয়েকজন সামরিক অফিসারের সহায়তায় এক রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে লিবিয়ার শাসনক্ষমতা দখল করেন। কিছুদিনের মধ্যেই গাদ্দাফি এবং তার অল্পবয়সী সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে অপেক্ষাকৃত সিনিয়র অফিসারদের ক্ষমতা নিয়ে দ্বন্দ্ব শুরু হলেও দ্বন্দ্ব নিরসন করে ১৯৭০ সালে তিনি একজন সফল শাসক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে লিবিয়ার বেনগাজী শহরে সর্বপ্রথম গাদ্দাফিবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়। ১৫ আগস্ট বিদ্রোহীরা নাপোলিতে ঢুকে পড়ে এবং গ্রিন স্কয়ারে পৌঁছার দুদিন পর তারা গাদ্দাফির বাসস্থানে আক্রমণ করে। পালিয়ে যাওয়ার সময় ২০ অক্টোবর সিরত শহরের বিশাল এক পাইপের ভেতর অবস্থানকালে গাদ্দাফি বিদ্রোহীদের হাতে নিহত হন।

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads