• মঙ্গলবার, ২০ নভেম্বর ২০১৮, ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
ads
চিনামাটির পাহাড়ে

চিনামাটির পাহাড় ও লেক

সংগৃহীত ছবি

ফিচার

চিনামাটির পাহাড়ে

  • প্রকাশিত ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ছুটির দিনে বৃৃষ্টিবাদলের উৎপাত সবার কাছেই অসহ্য! তাই অফিস বা ব্যবসার কাজের ফাঁকে ছুটিকে কাজে লাগিয়ে ঘুরে আসুন পাহাড়-নদী, গাছ-গাছালিঘেরা আদিবাসী অধ্যুষিত নেত্রকোনার দুর্গাপুর! বাংলাদেশে যে কয়েকটি অনন্যবৈশিষ্ট্যের ট্যুরিস্ট স্পট আছে, তার মধ্যে এটি একটি। প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য দুর্গাপুর নিয়ে লিখেছেন সবুর খান

দুর্গাপুর হচ্ছে নেত্রকোনা জেলার একটি উপজেলা, যা বাংলাদেশ সীমান্তের শেষ মাথায় এবং ভারতের মেঘালয় বর্ডারের কাছাকাছি। জায়গাটি মূলত গারো উপজাতি অধ্যুষিত। ঢাকা থেকে প্রায় ১৮২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বিরিশিরি। বিরিশিরি নেত্রকোনা জেলার দুর্গাপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী একটি গ্রাম। শুরুতে এটি ইউনিয়ন পরিষদের অন্তর্ভুক্ত থাকলেও দুর্গাপুর পৌরসভা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সদরের পার্শ্ববর্তী বলে গ্রামটিকে ওয়ার্ড হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ইংরেজ শাসন আমলে স্থাপিত শত বছরের পুরনো বয়েজ ও গার্লস হাইস্কুল, সরকারি কালচারাল একাডেমি, সোমেশ্বরী নদী, সাগরদীঘি, দুর্গাপুর রাজবাড়ী, পুরাকীর্তি নিদর্শন মঠগড়, মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ আর দর্শনীয় স্থানগুলোর কারণে পর্যটকদের কাছে এটির যথেষ্ট সুনাম আছে। স্থানীয় অধিবাসীদের ৬০ ভাগ গারো আদিবাসী, ৩০ ভাগ মুসলিম, বাকি ১০ ভাগ হিন্দু ও অন্যান্য জনগোষ্ঠী।

এখানে বাসস্ট্যান্ড থাকায় এটি দেশব্যাপী একটি পরিচিত নাম। অনেকে বিরিশিরিকে দুর্গাপুর শহর থেকে আলাদা মনে করেন। কিন্তু বিরিশিরি দুর্গাপুর পৌরসভার একটি ওয়ার্ড। সোমেশ্বরী নদীই দুর্গাপুর ও বিরিশিরিকে আলাদা করেছে।

কী কী দেখবেন বিরিশিরিতে

সোমেশ্বরী এ দেশের অপরূপ সুন্দর একটি নদী। নদীতে গেলে একই সঙ্গে দেখা যাবে চর, কয়লা উত্তোলন চিত্র, কাঁশবন, জঙ্গল, ভারতীয় বর্ডার এবং মেঘে ঢাকা পাহাড়।

চিনামাটির পাহাড় এবং নীল সবুজ পানি

দুর্গাপুর উপজেলা পরিষদ থেকে ৭ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে কুল্লাগড়া ইউনিয়নের আড়পাড়া ও মাইজপাড়া মৌজায় বিজয়পুরের শসার পাড় এবং বহেরাতলী গ্রামে সাদামাটি অবস্থিত। এখান থেকে চিনামাটি সংগ্রহের ফলে পাহাড়ের গায়ে সৃষ্টি হয়েছে ছোট ছোট পুকুরের মতো গভীর জলাধার। পাহাড়ের গায়ে স্বচ্ছ নীল রঙের জলাধারগুলো দেখতে অত্যন্ত চমৎকার। বাংলাদেশের মধ্যে প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে সাদামাটির অন্যতম বৃহৎ খনিজ অঞ্চল এটি। ছোটবড় টিলা-পাহাড় ও সমতল ভূমিজুড়ে প্রায় ১৫ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ৬০০ মিটার প্রস্থ এই খনিজ অঞ্চল। খনিজসম্পদ উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৫৭ সালে এ অঞ্চলে সাদামাটির পরিমাণ ধরা হয় ২৪ লাখ ৭০ হাজার টন, যা বাংলাদেশের তিনশ বছরের চাহিদা পূরণ করতে পারে।

চিনামাটির প্রাচীন ইতিহাস না জানা গেলেও ১৯৫৭ সাল থেকে এ মাটি উত্তোলনের কাজ শুরু হয়। ১৯৬০ সালে সর্বপ্রথম কোহিনূর অ্যালুমিনিয়াম ওয়ার্কস নামে একটি প্রতিষ্ঠান এই সাদামাটি উত্তোলনের কাজ শুরু করে। পরে ১৯৭৩ সালে বিসিআইসি সাদামাটি উত্তোলনে যোগ দেয়। বিভিন্ন রঙের মাটি, পানি ও প্রকৃতির নয়নাভিরাম সৌন্দর্য মনকে বিমোহিত করে। সাদা, গোলাপি, হলুদ, বেগুনি, খয়েরি, নীলাভসহ বিভিন্ন রঙের মাটির পাহাড় চোখ জুড়িয়ে দেয়।

রানীখং চার্চ ও রানীক্ষং সাধু যোসেফের ধর্মপল্লী

সুসং দুর্গাপুর থেকে সোমেশ্বরী নদী পার হয়ে রিকশায় যেতে হয় রানীখং গ্রামে। এখানে আছে সাধু যোসেফের ধর্মপল্লী। রানীখং গ্রামের এই ক্যাথলিক গির্জাটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯১২ সালে।

সুসং জমিদারবাড়ি

দুর্গাপুর ছিল সুসং রাজ্যের রাজধানী। ৩ হাজার ৩৫৯ বর্গমাইল এলাকা এবং প্রায় সাড়ে নয়শ গ্রাম নিয়ে প্রতিষ্ঠিত সুসং রাজ্যের রাজধানী ছিল দুর্গাপুর। বর্তমানে এটি নেত্রকোনার একটি উপজেলা। সোমেশ্বর পাঠক থেকে শুরু করে তার পরবর্তী বংশধররা প্রায় ৬৬৭ বছর শাসন করেন এ রাজ্য। কিন্তু রাজকৃষ্ণ নামে এক রাজার শাসনামল থেকে সুসং রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রাজপরিবারে বিরোধের সূত্রপাত হয়। ফলে একসময় গোটা রাজ্য চারটি হিস্যায় ভাগ হয়ে যায়। চারটি পৃথক রাজবাড়ি প্রতিষ্ঠিত হয়। বাড়িগুলো ‘বড় বাড়ি’, ‘মধ্যম বাড়ি’, ‘আবু বাড়ি’ (ছোট অর্থে) ও ‘দুআনি বাড়ি’ নামে পরিচিত ছিল। ’৪৭-এর দেশবিভাগ এবং পরবর্তী সময়ে (’৫৪ সালে) জমিদারিপ্রথা উচ্ছেদ আইন পাস হওয়ার পর রাজবংশের সদস্যরা ভারতে চলে যান। এর মধ্য দিয়েই অবসান ঘটে অনেক শৌর্যবীর্যখ্যাত সুসং রাজ্যের।

সুসং রাজবাড়ি দেয়ালে ঘেরা ছিল। পরিখাবেষ্টিত রাজবাড়ির অভ্যন্তরে ছিল সৈনিকদের আবাস, বিচারালয়, কারাগৃহ, অস্ত্রাগার, চিড়িয়াখানা, হাতিশালা, রাজপরিবারের সদস্যদের প্রাসাদ, শয়নকক্ষ, কাছারি, বৈঠকখানা ইত্যাদি। ১৩০৪ খ্রিস্টাব্দের ভয়াবহ ভূমিকম্পে সুসং রাজ্যের রাজা জগৎকৃষ্ণ সিংহ প্রাচীর চাপা পড়ে নিহত হন এবং রাজবাড়ির ব্যাপক ক্ষতি হয়। বর্তমানে যে নিদর্শনগুলো টিকে আছে, তার অধিকাংশই জগৎকৃষ্ণের পরবর্তী বংশধরদের নির্মিত। সুসং রাজাদের ‘বড় বাড়ি’র সামনে তিনতলা একটি বড় ঘরকে ‘রংমহল’ বলা হতো। দেশবিভাগের পরও ঘরটি ছিল। ১৯৭০ সালে সেখানে সুসং ডিগ্রি কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়।

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কালচারাল একাডেমি

দুর্গাপুরের বাসস্ট্যান্ড বিরিশিরির পাশেই অবস্থিত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কালচারাল একাডেমি। এ অঞ্চলে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার নানা নিদর্শন সংরক্ষিত আছে এখানে। সুসং দুর্গাপুর ও এর আশপাশের উপজেলা কলমাকান্দা, পূর্বধলা, হালুয়াঘাট এবং ধোবাউড়ায় রয়েছে গারো, হাজং, কোচ, ডালু, বানাই প্রভৃতি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাস। এদের জীবনধারা যেমন বৈচিত্র্যময়, তেমনি এদের সংস্কৃতিও। এসব ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন এবং চর্চার জন্যই ১৯৭৭ সালে সুসং দুর্গাপুরে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়কালে সরকারি উদ্যোগে গড়ে তোলা হয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কালচারাল একাডেমি। এখানে প্রায় সারা বছরই নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

গারো পাহাড় এবং গারো পল্লী

গারো পাহাড় ভারতের মেঘালয় রাজ্যের গারো-খাসিয়া পর্বতমালার একটি অংশ। এর কিছু অংশ ভারতের আসাম রাজ্য এবং বাংলাদেশের নেত্রকোনা ও ময়মনসিংহ জেলায় অবস্থিত। গারো পাহাড়ের বিস্তৃতি প্রায় ৮ হাজার বর্গকিলোমিটার। সুসং দুর্গাপুরের উত্তর সীমান্তে নলুয়াপাড়া, ফারংপাড়া, বাড়মারি, ডাহাপাড়া, ভবানিপুর, বিজয়পুর ও রানীখংসহ বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে এর বিস্তার। এই পাহাড়ে প্রচুর মূল্যবান শালগাছ প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া যায়। এই পাহাড়গুলো প্রাকৃতিক মনোরম সৌন্দর্যের আধার। প্রকৃতি প্রায় ঝুলি উজাড় করে দিয়েছে এ গারো পাহাড়কে সাজাতে। বিচিত্র স্বাদের প্রকৃতির অলঙ্কার যেন মানায় এই ভূস্বর্গকেই।

থাকার জায়গা

বিরিশিরি বেড়াতে গেলে দুর্গাপুরে থাকতে হবে। এই উপজেলা সদরে পর্যটকদের জন্য বেশকিছু হোটেল ও মোটেল রয়েছে। খুব বেশি খরচ নয়। প্রায় প্রতিটি হোটেলেই খাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads