• বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ৩০ কার্তিক ১৪২৫
ads
খেলার ছলে শিখবে শিশু...

খেলাধুলা শিশুর সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষার্জনের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে

ছবি : ইন্টারনেট

ফিচার

খেলার ছলে শিখবে শিশু...

  • বেদৌরা বিনতে আফাক
  • প্রকাশিত ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৮

খেলাধুলাকে কখনোই সময়ের অপচয় বলা যাবে না। বরং একটি শিশুকে সুষ্ঠুভাবে বেড়ে উঠতে দেওয়া এবং তার মানসিক বিকাশের জন্য এটি অত্যন্ত জরুরি। খেলাধুলা শিশুর আবেগ, মানসিক, শারীরিক সেই সঙ্গে সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষার্জনের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। যখন শিশু পেশি সঞ্চালনের ওপর নিয়ন্ত্রণ অর্জন করতে থাকে, তখন থেকেই সক্রিয় খেলার মাধ্যমে শিশুর প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ব্যায়াম হয়। শিশুর মানসিক, সামাজিক, আবেগ ও ভাষিক বিকাশের ক্ষেত্রেও খেলাধুলার ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

সামাজিকতা শিক্ষা : খেলার প্রধান শর্ত হচ্ছে পরস্পরের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমে সবার সঙ্গে মিলেমিশে থাকা। একমাত্র খেলার মাধ্যমেই শিশু একসঙ্গে অনেকের সাথে মেশার সুযোগ পায়। বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে খেলতেই শিখে নেয় কী করে অন্যের সঙ্গে মিশতে হয়, অন্যদের সঙ্গে ভাবের আদান-প্রদান হয়। সহযোগিতামূলক খেলা এমন এক খেলা যা কয়েকটি শিশু মিলে এমনভাবে খেলে, যেখানে পরস্পরের সহযোগিতা প্রয়োজন। এ ধরনের খেলার মাধ্যমে শিশুর মধ্যে অন্যকে সহযোগিতা করার মনোভাব তৈরি হয়। এভাবে শিশু আত্মকেন্দ্রিক জগৎ থেকে বেরিয়ে এসে ক্রমেই সামাজিক হয়ে ওঠে। 

নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা : যে কোনো খেলা পরিচালনার জন্য একজন দলনেতা থাকে। খেলায় দলের অন্যদের সঙ্গে নিয়ে  একত্র হয়ে খেলতে হয়। দলের প্রত্যেকেই যেন খেলার নিয়ম মেনে চলে, সে জন্য দলের একজন নির্দেশনা দেয়। এতে করে শিশুর মধ্যে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা তৈরি হয়। এখানে খেলার মাধ্যমেই তারা শিখে নেয় নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতাটাও।

কর্মদক্ষতা যাচাই : খেলতে গিয়ে শিশু তার বন্ধুদের সঙ্গে নিজের কর্মদক্ষতার তুলনা করে। তাদের মধ্যে প্রতিনিয়তই এক ধরনের প্রতিযোগিতা দেখা যায় কে কার থেকে বেশি পারদর্শী তা নিয়ে, যেমন কে কেমন দৌড়াতে পারে। এভাবেই অন্যদের দেখে সে নিজের কর্মদক্ষতা সম্পর্কে অবহিত হতে পারে সে সবার চেয়ে বেশি, কম না সমান দৌড়াতে পারে। এভাবে তুলনা করতে পারার মধ্য দিয়ে নিজের সম্পর্কে তার একটা বাস্তবসম্মত ধারণা গড়ে ওঠে।

নিয়মানুবর্তিতা শিক্ষা :  প্রতিটি খেলাধুলায়ই নির্দিষ্ট একটি নিয়ম রয়েছে। এবং বন্ধুদের দলেও কিছু নিয়মকানুন রয়েছে। দলে খেলার ফলে তারা দলের রীতিনীতি কায়দাকানুন আয়ত্ত করে। এতে করে যে কোনো বিষয়ে নিয়ম মেনে চলার অভ্যাস তৈরি হয়। অন্যের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার শিক্ষাও শিশুরা খেলার মাধ্যমেই শিখে থাকে। খেলার সময় শিশু নির্ধারিত নিয়মনীতি মেনে চলার ব্যাপারে সচেতন হয়। কারণ খেলার নিয়ম না মানা হলে সে দল তার গ্রহণযোগ্যতা হারাতে পারে।

মানবিক গুণাবলি শিক্ষা : খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুর সৃজনশীলতা, কল্পনাশক্তি, সামাজিক জ্ঞানবোধ, সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব বিকশিত হয়। খেলতে গিয়ে শিশু তার সমবয়সী অন্য শিশুদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে। সেখানে অন্যদের মনোভাব যেমন বুঝতে হয়, তেমনি নিজের মনোভাব অন্যদের বোঝাতে হয়। খেলায় দলের সাথীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। এর মাধ্যমে শিশু অন্যকে সহযোগিতা করা, উদারতা, সত্যবাদিতা ইত্যাদি মানবিক গুণাবলি শিখে থাকে।

নৈতিকতা শিক্ষা : নৈতিকতার শিক্ষাটি শিশুরা মূলত বাড়িতেই পেয়ে থাকে। তবে খেলার মাধ্যমেও নৈতিকতা শিক্ষা অর্জিত হয়। কেননা খেলাধুলায় নৈতিকতা বেশ কঠোর। খেলতে গিয়ে কখনো কোনো শিশু মিথ্যা বললে অথবা প্রবঞ্চনা করলে সাথীরা তাকে খেলা থেকে বাদ দিয়ে দেয়।

লিঙ্গানুযায়ী ভূমিকা পালন : লিঙ্গানুযায়ী ভূমিকা পালনের শিক্ষা শিশু খেলার মাধ্যমেই পেয়ে থাকে। মেয়েশিশুরা হাঁড়িপাতিল নিয়ে মায়ের ভূমিকায় অভিনয়ের মাধ্যমে খেলে থাকে। ঠিক একইভাবে ছেলেশিশুটি তার বাবা অথবা ভাইয়ের ভূমিকা পালন করে। অর্থাৎ সে খেলতে গিয়ে পরিবারের মা-বাবা অথবা অন্যদের ভূমিকা গ্রহণ করতে পারে। এমনিভাবে খেলার মাধ্যমে শিশুর মনে তাদের ভবিষ্যৎ ভূমিকা সম্পর্কে ধারণা জন্মে।

কল্পনাশক্তি ও সৃজনশীলতার বিকাশ : খেলা এমন একটি মাধ্যম, যেখানে শিশু তার কল্পনাশক্তি ও সৃজনশীলতা প্রকাশের সুযোগ পায়। বিভিন্ন গঠনমূলক খেলার উত্তরণ ঘটে আর বিকাশ লাভ করে তার কল্পনাশক্তি। তবে শিশু প্রথমে খেলে সমান্তরাল খেলা, অর্থাৎ সে খেলে নিজে নিজে তবে অন্য শিশুদের উপস্থিতিতে। এরপর শিশুর আগ্রহ দেখা যায় অন্য শিশুর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের। এই সংযোগ খেলনা আদান-প্রদান থেকে শুরু করে মারামারি পর্যন্ত গড়াতে পারে।

আবেগ প্রকাশের মাধ্যম : খেলা যেমন আবেগের আনন্দদায়ক বহিঃপ্রকাশে সাহায্য করে, তেমনি শিশু যে আবেগ লুকিয়ে রাখে বা প্রকাশ করতে ভয় পায়, তা খেলার মাধ্যমে প্রকাশ করে। এ ছাড়া দেখা গেছে, যে কোনো কষ্টদায়ক অভিজ্ঞতার ফলে শিশু অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি ঘটায়। মনের সব অবদমিত ইচ্ছা ও দ্বন্দ্ব খেলার মাধ্যমে প্রকাশের সুযোগ ঘটে। সামাজিক ন্যায়-নীতি, অনুশাসনের বাধার কারণে মনের যেসব কামনা-বাসনা বা আকাঙ্ক্ষা প্রকাশের পথ পায় না, সেগুলো খেলার মাধ্যমে বেরিয়ে আসে এবং শিশুকে অপরিসীম মানসিক চাপ থেকে মুক্তি দেয়। এ কারণে খেলাধুলাকে অনেক ক্ষেত্রে শিশুর চিকিৎসার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads