• শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads
বদলে যাবে দেশের চেহারা

পদ্মা সেতু

সংগৃহীত ছবি

ফিচার

১০ মেগা প্রকল্প

বদলে যাবে দেশের চেহারা

  • জাহিদুল ইসলাম
  • প্রকাশিত ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮

২০০৯-১০ অর্থবছর পর্যন্ত সরকারি বিনিয়োগ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) সাড়ে চার শতাংশে সীমাবদ্ধ ছিল। গত অর্থবছরে তা ৭ দশমিক ৩০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এ সময়ে ২৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে সরকারের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮০ হাজার ৮৬৯ কোটি টাকায়। ৯ বছরে এডিপির আকার ছয়গুণ বাড়লেও সরকারি বিনিয়োগ ২২ থেকে ২৩ শতাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। অবকাঠামো খাতে বড় প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ না হওয়ায় সরকারি ব্যয় বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারছে না বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নেওয়া ১০ মেগা প্রকল্পের কাজ শেষ হলে বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের অর্থনীতির চেহারাই বদলে যাবে বলে মনে করছেন তারা। 

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য ড. শামসুল আলম বলেন, বড় আকারের প্রকল্পের মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু হতে বাড়তি সময় লাগে। তবে প্রাথমিক প্রক্রিয়া শেষ করে মূল কাজ শুরু হলে দ্রুত প্রকল্পের কাজ শেষ হয়ে যায়। তিনি বলেন, বর্তমানে বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্পের মাঠপর্যায়ে কাজ চলছে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এসব প্রকল্পের কাজ শেষ হলে পরিবহন, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আমূল পরিবর্তন আসবে। এতে করে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে উৎসাহী হবেন। এর ধারাবাহিকতায় বাড়বে কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও আয়। দেশের চিত্র পাল্টে দিতে মেগা প্রকল্পগুলো বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে বলে তিনি মনে করেন। 

পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বড় আকারের ৯ মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ৮৬ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা। এসব প্রকল্পের মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে আছে পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজ। দেশের দক্ষিণ অঞ্চলের জেলাগুলোকে অর্থনীতির মূলধারায় নিয়ে আসতে ২০০৯ সালে এ সেতু নির্মাণের কাজ হাতে নেওয়া হয়। এ সেতুর কাজ শেষ হলে দেশের জিডিপি প্রায় ১ দশমিক ২৩ ভাগ বাড়বে বলে আশা করছে সেতু বিভাগ। ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নেওয়া প্রকল্পে ইতোমধ্যে ১৫ হাজার ৫২৮ কোটি ৭৮ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। অর্থব্যয়ের হিসাবে সার্বিক অগ্রগতি হয়েছে ৫১ দশমিক ৪৩ শতাংশ। মূল সেতু নির্মাণকাজের অগ্রগতি ৬২ শতাংশ। এছাড়া নদীশাসন কাজ হয়েছে ৩৭ দশমিক ৫০ শতাংশ। জাজিরা প্রান্তে সংযোগ সড়কের কাজ ৯৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ শেষ হয়েছে। মাওয়া প্রান্তে সংযোগ সড়ক ও সার্ভিস এরিয়া-২ এর কাজ হয়েছে শতভাগ। 

যানজটের কারণে প্রতিদিন রাজধানী ঢাকায় নষ্ট হচ্ছে বিপুল পরিমাণ কর্মঘণ্টা। এ যানজট থেকে ঢাকাবাসীকে মুক্তি দিতে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয় ২০১২ সালের ১ জুলাই। ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি ৭ লাখ টাকার প্রকল্পে এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৬৮৭ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। বরাদ্দের ১৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ অর্থ এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত লাইন স্থাপনের কাজ এগিয়ে চলছে। প্যাকেজ-১ এর শতভাগ কাজ শেষ হয়েছে। ৭ শতাংশ কাজ হয়েছে প্যাকেজ-২ এর আওতায়। এ ছাড়া প্যাকেজ-৩ এর ১০ শতাংশ, প্যাকেজ-৮ এর ১০ দশমিক ২০ শতাংশ কাজ হয়েছে। প্যাকেজ-৪, ৫, ৬ ও ৭-এর আওতায় কাজও চলমান আছে। 

রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয় ১৯৬৩ সালে। এর পরেও কয়েক দফায় নেওয়া উদ্যোগ আলোর মুখ দেখেনি। বিকল্প জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে মেগা এ প্রকল্পের মূল কাজ এগিয়ে যাচ্ছে। এ কেন্দ্রের প্রাথমিক অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পের কাজ শেষ পর্যায়ে আছে। ১ লাখ ১৩ হাজার ৯২ কোটি ৯১ লাখ টাকা ব্যয় ধরে চলছে মূল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ। এর কাজ শেষ হলে জাতীয় গ্রিডে যোগ হবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। ইতোমধ্যে প্রকল্পটির আওতায় ৮ হাজার ৪৬১ কোটি ৮ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। এ পর্যন্ত আর্থিক অগ্রগতি প্রায় সাড়ে ৭ শতাংশ। প্রকল্পের প্রথম রিঅ্যাক্টর স্থাপন শুরু হয়েছে অনেক আগেই। দ্বিতীয় রিঅ্যাক্টর স্থাপনের কাজও উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। 

ব্যাপক বিতর্ক থাকলেও রামপালে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজও এগিয়ে চলেছে। এ বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হবে কয়লা। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ওপর চাপ কিছুটা কমে আসবে। ১৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্পে ইতোমধ্যে ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৬০৭ কোটি টাকা ৬৩ লাখ টাকা। প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি ১৬ শতাংশের বেশি। এ কেন্দ্র নির্মাণে ইপিসি ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করেছে। 

কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ী দ্বীপকে বিদ্যুৎ হাবে উন্নীত করেছে সরকার। এ বিদ্যুৎ হাবে সবচেয়ে এগিয়ে আছে মাতারবাড়ী ২*৬০০ মেগাওয়াট আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কোল ফায়ার্ড পাওয়ার শীর্ষক প্রকল্পের কাজ। ২০১৪ সালের ১ জুলাই থেকে চলমান প্রকল্পে এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৫ হাজার ২০৫ কোটি ৫২ লাখ টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ৩৫ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা। বরাদ্দের ১৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ অর্থ ব্যয় করে মাঠপর্যায়ে কাজ হয়েছে ১৭ দশমিক ৭২ শতাংশ। কেন্দ্রটি স্থাপনে দেড় হাজার একর ভূমি অধিগ্রহণের কাজ প্রায় শেষপর্যায়ে আছে। 

গভীর সমুদ্রবন্দর না থাকায় আমদানি-রফতানি বাণিজ্য পরিচালনায় বড় ধরনের সমস্যায় রয়েছেন দেশের উদ্যোক্তারা। বড় আকারের জাহাজে কলম্বো বা সিঙ্গাপুর পর্যন্ত পণ্য এনে ছোট আকারের জাহাজে তা চট্টগ্রাম বা মোংলা সমুদ্রবন্দরে আনা হয়। সরাসরি পণ্য আমদানি-রফতানি নিশ্চিত করতে ৩ হাজার ৩৫০ কোটি ৫১ লাখ টাকা ব্যয় ধরে পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হয় ২০১৫ সালে। এ প্রকল্পে ইতোমধ্যেই ৭১৭ কোটি ৬২ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি ২১ শতাংশের বেশি। 

প্রক্রিয়াধীন পদ্মা সেতুর সুফল আরো বিস্তৃত করতে এ সেতুতে রেল সংযোগের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ লক্ষ্যে চীনের সহায়তায় নেওয়া হয়েছে ৩৯ হাজার ২৪৬ কোটি ৮০ লাখ টাকার প্রকল্প। এর কাজ শেষ হলে ঢাকা থেকে গোপালগঞ্জ হয়ে যশোর পর্যন্ত রেললাইন স্থাপন হবে। পর্যায়ক্রমে রেল যোগাযোগের আওতায় আসবে বরিশাল জেলা। এ পর্যন্ত প্রকল্পটিতে ৩ হাজার ৩৪৬ কোটি ৫৬ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। বরাদ্দের ৮ দশমিক ৫২ শতাংশ অর্থ ব্যয় করে ভৌত কাজ হয়েছে ১৩ শতাংশ। 

বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারের সঙ্গে রেল সংযোগ স্থাপন করতে প্রকল্প নেওয়া হয় ২০১০ সালে। এ লক্ষ্যে দোহাজারী থেকে রামু কক্সবাজার এবং রামু থেকে মিয়ানমারের কাছে ঘুমধুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েল গেজ ট্র্যাক নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮ হাজার ৩৪ কোটি  ৪৮ লাখ টাকা। এর কাজ শেষ হলে কক্সবাজারে দেশি-বিদেশি পর্যটক বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। এতে ৩ হাজার ১০৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। ৭ শতাংশ আর্থিক অগ্রগতির বিপরীতে ভৌত অগ্রগতি ১৭ দশমিক ২৩ শতাংশ। গ্যাসের চাহিদা বৃদ্ধির বিপরীতে কমে আসছে মজুত। ফলে শিল্পায়ন ধরে রাখতে অত্যাবশ্যক এই জ্বালানি আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে মহেশখালীতে চলছে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের কাজ। এ টার্মিনালের মাধ্যমে ইতোমধ্যেই সীমিত আকারে গ্যাস আমদানি শুরু হয়েছে। গত বছরের ১৮ জুলাই টার্মিনাল ব্যবহার সংক্রান্ত চুক্তি হয়েছে। জিও টেকনিক্যাল সার্ভের কাজ শুরু হয়েছে। সেই সঙ্গে জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। এ টার্মিনাল থেকে গ্যাস সঞ্চালনে মহেশখালী-আনোয়ারা, আনোয়ারা-ফৌজদারহাট ও চট্টগ্রাম-ফেনী-বাখরাবাদ গ্যাস পাইপলাইন স্থাপনের জন্য এক বছরের মধ্যে জমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads