• বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads
আদিবাসী সংস্কৃতি

বৈসাবি উৎসবের দৃশ্য

সংগৃহীত ছবি

ফিচার

আদিবাসী সংস্কৃতি

  • প্রকাশিত ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৮

পুষ্প মোহন চাকমা, বিলাইছড়ি (রাঙামাটি)

পার্বত্য চট্টগ্রাম দেশের এক-দশমাংশ একটি পাহাড়ি ভূখণ্ড। এ ভূখণ্ডে বহু ক্ষুদ্র জাতিসত্তা স্মরণাতীত কাল থেকে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে বসবাস ও জীবনধারণ করে আসছে। ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর মধ্যে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, পাংখোয়া, বম, খিয়াং ও লুসাইসহ কয়েকটি জাতিসত্তা রয়েছে। এদের নিজস্ব জাতিসত্তাভিত্তিক স্বতন্ত্র ভাষা-সংস্কৃতি রয়েছে। জাতিসত্তাসমূহের ভিন্ন ভিন্ন ঐতিহ্যবাহী উৎসব ও ধর্মীয় সংস্কৃতি রয়েছে। রয়েছে খাবার ও পোশাক-পরিচ্ছদেও বৈচিত্র্যতা।

বসবাস ও জীবনধারণ : পাহাড়ে আদিবাসী ক্ষুদ্র জাতিসত্তাসমূহ বিশেষ করে জাতিগোষ্ঠীভিত্তিক পাড়ায় বসবাস ও জীবনধারণ করত। আবাস্থলসমূহ সাধারণত গাছ, বাঁশ ও শন দিয়ে তৈরি হতো। অতীতে ঘরগুলো ছিল উঁচু মাচাংয়ে। বর্তমানে আধুনিকতা ও মিশ্র সংস্কৃতির কারণে মাচাং ঘর প্রায় বিলুপ্তির পথে। তবে গ্রামগঞ্জে এখনো মাচাংঘর ব্যবহূত হয়। কারণ মাচাংঘর অনেকটা পরিবেশবান্ধব এবং আরামদায়ক। পাহাড়ে সমতল জমি না থাকায় তারা জুমচাষে জীবনধারণে বাধ্য। ফলে পাহাড়েই তাদের জীবনধারণ করতে হতো। তাই তাদের দীর্ঘ জীবন ধারার বাস্তবতায় এ জুমচাষও একটি সংস্কৃতি বহন করে চলছে।

ভাষা : প্রত্যেক জাতিসত্তার নিজস্ব ভাষা রয়েছে। এর মধ্যে চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যাদের ভাষা একই রকম, শুধু উচ্চারণগত কিছু পার্থক্য রয়েছে। অনুরূপ পাংখো ও বমদের ভাষার মধ্যেও সামান্য পার্থক্য রয়েছে। তবে উভয়ে উভয়ের ভাষা পারদর্শী। এ ছাড়া অন্য সব জাতির মাতৃভাষা সম্পূর্ণ আলাদা ও স্বতন্ত্র। চাকমা ও মারমাদের নিজস্ব ভাষার বর্ণ বা হরফ রয়েছে।

বিবাহ বন্ধন : বিবাহ বন্ধন একটি সামাজিক অধিকার ও স্বীকৃতির বিষয়। সব জাতিসত্তার বিবাহ বন্ধনে নিজস্ব সামাজিক নিয়ম অনুযায়ী একটি সামাজিক স্বীকৃতির প্রয়োজন হয়। দেখা গেছে, প্রায় সব জাতিসত্তার তাদের পাড়ার মোড়ল বা মুরব্বিদের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির মধ্যদিয়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে হয়। পাশাপাশি বর-কনের পক্ষের সমাজের লোকদের প্রীতিভোজের মধ্যদিয়ে বিবাহকার্য সম্পাদন করা হয়। তবে বিবাহের সম্পাদন প্রক্রিয়ায় একজন ওঝা বা ঘটক থাকে। চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যারা বিবাহ বন্ধন প্রক্রিয়াকে ‘চুঙুলাং’ বলে। তবে অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর এ বিবাহ বন্ধন প্রক্রিয়া ভিন্নও হতে পারে। এ বিষয়ে পুরোটা জানা যায়নি। সমাজের বিধবা স্ত্রীরাও ইচ্ছে করলে দ্বিতীয় বিয়ে বা সংসার করতে পারে। তবে তাও সামাজিকভাবে স্বীকৃতি নিতে হয়। 

ধর্ম ও ধর্মীয় উৎসব : সব জাতিসত্তারই ধর্ম-অর্চনা রয়েছে। চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা ও মারমারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। অনেক ত্রিপুরাও বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করে আবার অনেকে খ্রিস্টান ধর্মও গ্রহণ করে থাকে। তবে ত্রিপুরারা অধিকাংশই সনাতন ধর্ম অবলম্বন করে থাকেন। পাংখুরা খ্রিস্টান ধর্ম অবলম্বন করে থাকে­­। আর অন্য জাতিসত্তারা কেউ খ্রিষ্টান আর  কেউ সনাতন ধর্ম পালন করে থাকে।

বৌদ্ধদের বড় ধর্মীয় উৎসব দানোত্তম মহান কঠিন চীবর দান। যা বছরে একটি বিহারে একবারই করা হয়ে থাকে। পাংখু বা খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান হলো ক্রিসমাস বা বড়দিন। প্রতি বছর ২৫ ডিসেম্বর এই দিনটি তারা আড়ম্বরপূর্ণভাবে পালন করে থাকে।

পোশাক-পরিচ্ছদ : প্রত্যেক জাতিসত্তার নিজস্ব ভিন্ন ভিন্ন পোশাক-পরিচ্ছদ রয়েছে। বিশেষ করে নারীদের পোশাকের মাধ্যমে এর ভিন্নতা জানা যায়। তবে পুরুষদের ক্ষেত্রে পোশাকের ভিন্নতা বোঝা যায় না। কারণ তারা ফ্যাক্টরিজাত কাপড় পরিধান করে থাকে। যেমন- প্যান্ট, লুঙ্গি, গামছা, ধুতি, শার্ট, গেঞ্জি ও পাঞ্জাবি ইত্যাদি। তবে এককালে নিজেদের তৈরি সুতা দিয়ে কাপড় তৈরি করে শার্ট বানিয়ে পরতেন পুরুষরাও। নারীদের পোশাকগুলো নিজেদের হাতে বোনা। তবে সব নারী তাদের পোশাক তৈরি করতে দক্ষ নন। কারণ এ পোশাক তৈরি করা অনেক কঠিন। তাদের এ পোশাকের যে ছোট ছোট কারুকাজ আছে তা জানা সবার পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না। এ কারুকাজগুলো করতে একটি আলাম বা ডেমো নকশা থাকে। সেটা অনুসরণ করেই কাপড়গুলো কোমর তাঁতে বুনতে হয়। আর এগুলো একটি বুনতে প্রায় ২০ থেকে ২৫ দিন সময় লাগে। কারো কারো ক্ষেত্রে এর চেয়েও বেশি সময় লাগে।

তবে আজকাল নারীরাও প্রায় বাঙালি ড্রেস পরিধান করে থাকে। যেমন- শাড়ি, সালোয়ার-কামিজসহ আধুনিক বিভিন্ন রকমের ও ডিজাইনের ড্রেস পরিধান করে চলছে। যা একটি আধুনিক পরিবেশেই মানিয়ে তুলছে।

খেলাধুলা

পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমাদের মধ্যে ‘ঘিলা খারা’ খুবই জনপ্রিয় খেলা। এ খেলা ‘ঘিলা’ নামক এক ধরনের গোলকৃতির বীচির সাহায্যে খেলা হয়। বিশেষ করে ‘বিজু’ উৎসবে গ্রামাঞ্চলে রাতভর এ খেলা খেলতে দেখা যায়। এ খেলা কিশোর-কিশোরী ও যুবক-যুবতীরাই বেশি খেলে থাকে। অন্যান্য উপজাতিও এ খেলা খেলে থাকে। এ ছাড়া ‘ফোর খারা’ (দাঁড়িয়াবান্ধা), ‘গুডু খারা’ (হাডুডু), ‘পত্তি খারা’ (বউচি) ‘নাদেং খারা’ ‘বলি খারা’ ইত্যাদি খেলা বেশ জনপ্রিয়। এসব খেলা এতদাঞ্চলের গ্রামীণ জনজীবনে বিনোদনের খোরাকও জুগিয়ে থাকে।

চিকিৎসা পদ্ধতি : একসময় যখন আজকের চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুন্নত ছিল বা আমাদের হাতের নাগালে ছিল না, তখন স্থানীয়ভাবে বৈদ্য বা কবিরাজ ছিল। তারাই একমাত্র রোগ চিকিৎসার কাণ্ডারি ছিল এ পিছিয়ে পড়া সমাজে। তারা তখন তান্ত্রিক শক্তি দিয়ে অথবা বিভিন্ন গাছ-গাছালি ও লতা-পাতার সমন্বয়ে চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসতেন। এ ছাড়া অনেক ধরনের পূজা দিয়েও চিকিৎসা করে থাকতেন এ বৈদ্যরা। আজকাল এ সনাতন চিকিসা পদ্ধতি বহুলাংশে কমে গেছে।

সংখ্যালঘু হিসেবে যুগ যুগ ধরে ইতিহাসের বিভিন্ন শাসক-শোষক মহলের নিষ্পেষণের কবলে থাকায় সভ্যতার উন্নয়নে পিছিয়ে ছিল এ ক্ষুদ্র জাতিসমূহ। ফলে তারা ছিল মৌলিক চাহিদা পূরণে অক্ষম ও বঞ্চিত। পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান আমলসহ বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ধীরে ধীরে শিক্ষায় এগিয়ে গেলে তারা মৌলিক অধিকার সম্পর্কে ধারণা অর্জন করে। পরাধীনতার মর্ম উপলব্ধি করে এবং স্বাধীনতার সুখ ও স্বপ্ন দেখে। যার স্বপ্নে ৭০ দশকের পরেই তারা ডাক দেয় আত্মনিয়ন্ত্রাণাধিকার আদায়ের সংগ্রামের। পরে দীর্ঘদিনের সর্বহারা দুঃসাহসিক সংগ্রামের ফসল হিসেবে ৯৭-এ সরকারের সঙ্গে পার্বত্যচুক্তি নামে স্মারক রচিত হয়। আজ সেই স্মারকের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের একটি সম্পর্ক বন্ধন তৈরি হয়েছে দেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম নামে একটি অঞ্চলের নাগরিক হিসেবে।

জাতিসত্তাসমূহ স্মরণাতীতকাল হতে এ দেশে বসবাস ও জীবন ধারণ করে থাকায় নিজেদের এদেশের আদিবাসী নাগরিক হিসেবে দাবি করে আসছে। কিন্তু সরকার তাদের আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি না দিলেও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিসেবে তারা সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃতি পায়।

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads