• রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads
ছয় হটস্পটে ৩৩ ঝুঁকি

শত বছর মেয়াদী ডেল্টা প্ল্যানের অনুমোদন

ছবি : সংগৃহীত

সরকার

শত বছরের ডেল্টা প্ল্যান অনুমোদন

ছয় হটস্পটে ৩৩ ঝুঁকি

# জিডিপির প্রবৃদ্ধি দেড় শতাংশ বাড়বে # ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়ন # হবে ৮০ প্রকল্প ব্যয় হবে ৩ লাখ কোটি টাকার বেশি

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় ১০০ বছরের জন্য বদ্বীপ পরিকল্পনা তথা ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (এনইসি)। এতে দেশের ১ লাখ ৩৫ হাজার ৮৬ বর্গকিলোমিটার এলাকায় বিভিন্ন ঝুঁকি চিহ্নিত করে তা মোকাবেলায় বেশকিছু কর্মকৌশল ঠিক করা হয়েছে। এর আওতায় ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়ন করার জন্য ৮০ প্রকল্পের সুপারিশ আছে। এতে ব্যয় হবে ৩ হাজার ৭০০ কোটি ডলার, টাকার অঙ্কে যা ৩ লাখ কোটির বেশি। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। এর মধ্যে ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়নের কারণেই প্রবৃদ্ধি বাড়বে দেড় শতাংশ। মঙ্গলবার রাজধানীর এনইসি সম্মেলন কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এনইসি সভায় এ পরিকল্পনা অনুমোদন পায়।

সভা শেষে সংবাদ ব্রিফিংয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একশ’ বছরের পরিকল্পনা

ছয় হটস্পটে ৩৩ ঝুঁকি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আশপাশের দেশগুলোরও এমন নজির নেই। দিনটি ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হলে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি দেড় শতাংশ বাড়বে। চলমান প্রেক্ষিত পরিকল্পনার মেয়াদ শেষ হয়ে আসায় ২০২১ থেকে ২০৪১ সাল পর্যন্ত বাস্তবায়নের জন্য একটি প্রেক্ষিত পরিকল্পনা তৈরির কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।

মুস্তফা কামাল আরো বলেন, নেদারল্যান্ডস এ ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে ছয় হাজার বর্গকিলোমিটার ভূমি উদ্ধার করতে পেরেছে। দেশটির সহযোগিতাতেই এ পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। পানি বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সম্পদ। এই পানিকে আমরা সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে কৃষিতে দেশ অনেক এগিয়ে যাবে। ফলে অর্থনীতির ভিতও শক্তিশালী হবে।

এর আগে এনইসি সভায় সার-সংক্ষেপ উপস্থাপন করেন পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য ড. শামসুল আলম। তিনি এ সময় বলেন, প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহ, ইচ্ছা ও নির্দেশে জিইডির পক্ষ থেকে এই পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ঝুঁকির কারণে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলাই এর উদ্দেশ্য। উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা অর্জন এবং পানি, জলবায়ু, পরিবেশ ও ভূমির টেকসই ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলাসহ ২০৩০ সালের মধ্যে চরম দারিদ্র্য দূরীকরণ ও ২০৪১ সালের মধ্যে একটি সমৃদ্ধ দেশের মর্যাদা অর্জনের লক্ষ্যে বদ্বীপ পরিকল্পনা বাংলাদেশের স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনাগুলোর মধ্যে সমন্বয় করবে।

সভায় শামসুল আলম আরো বলেন, উন্নত দেশের পথে হাঁটতে হলে প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হবে। সে লক্ষ্য অর্জনে ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়ন অপরিহার্য। পরিকল্পনার মূল প্রতিপাদ্য জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ-খাওয়ানো। উপস্থাপনায় আরো বলা হয়, নদীভাঙনের ফলে প্রতিবছর ৫০ হাজার থেকে ৬০ হাজার পরিবার গৃহহীন হচ্ছে। বন্যায় অনেক ফসলহানি হচ্ছে। এর বাইরে শহর অঞ্চলে সুপেয় পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, কঠিন বর্জ্য ও আবর্জনা ব্যবস্থাপনা, কৃষি জমিতে ব্যাপক রাসায়নিক সারের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের মতো চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি উৎপাদক শক্তি না কমিয়ে তা যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার চেষ্টার প্রতিফলন হয়েছে বদ্বীপ পরিকল্পনায়।

সভা শেষে ব্রিফিংয়ে মন্ত্রী বলেন, ঝুঁকি বিবেচনায় দেশের ভূখণ্ডকে ছয়টি হটস্পটে ভাগ করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে উপকূলীয় অঞ্চল, বরেন্দ্র ও খরাপ্রবণ অঞ্চল, হাওর ও আকস্মিক বন্যাপ্রবণ অঞ্চল, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল, নদী ও মোহনা অঞ্চল এবং নগরাঞ্চল। এসব হটস্পটে ৩৩ ধরনের চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করা হয়েছে।

পরিকল্পনায় হটস্পটগুলোর চ্যালেঞ্জ ও সমস্যা সমাধানে বেশকিছু কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে। বন্যার ঝুঁকি কমাতে নদী ও পানিপ্রবাহের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ রাখা, পানিপ্রবাহের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নদীগুলোকে স্থিতিশীল রাখা, পর্যাপ্ত মানসম্মত স্বাদু পানি সরবরাহ করা, নদীগুলোর পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখা, নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য নৌপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যথাযথ পলি ব্যবস্থাপনা, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির জন্য চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্য রক্ষা, বন্যা ও জলাবদ্ধতার ক্ষয়ক্ষতি কমানো, পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন নিশ্চিত করা, হাওর ও আকস্মিক বন্যাপ্রবণ এলাকায় জলের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে টেকসই জীবন-জীবিকা নিশ্চিত করা, বন্যা থেকে কৃষি ও বিপন্ন জনগোষ্ঠীকে রক্ষা, টেকসই হাওর প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ব্যবস্থাপনা, সমন্বিত পানি ও ভূমিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, বন্যা ও ঝড়বৃষ্টি থেকে অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শহর রক্ষা, পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং নগর অঞ্চলের পানি নিষ্কাশন সক্ষমতা ও পানি ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ানোর বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে পরিকল্পনায়।

বদ্বীপ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে একটি ডেল্টা তহবিল গঠন করা হবে বলে জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে ৮০ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। এর জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে তিন লাখ কোটি টাকার বেশি। এতে অর্থায়ন করতে সরকারের পাশাপাশি উন্নয়ন সহযোগী, পরিবেশ ও জলবায়ু সম্পর্কিত বিভিন্ন সংস্থা, গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (জিসিএফ) থেকে অর্থ পাওয়া যাবে বলে ধারণা করেন মন্ত্রী। এর বাইরে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) খাত থেকেও অর্থ আসবে বলে ধারণা করেন মন্ত্রী।

এ সময় মন্ত্রী আরো জানান, বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ বাস্তবায়নে ২০৩০ সাল নাগাদ জিডিপির আড়াই শতাংশ অর্থ প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে জিডিপির ২ শতাংশ নতুন বিনিয়োগ এবং শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে ব্যয় করা হবে। বিনিয়োগের ৮০ ভাগ সরকারি তহবিল হতে আসবে। ২০ ভাগ আসবে বেসরকারি খাত থেকে।

সূত্র জানায়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে দেশের পানিসম্পদ নিয়ে ১০০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনার কাজ ২০১৪ সালে শুরু করে জিইডি। বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান-২১০০ শীর্ষক এ পরিকল্পনা তৈরিতে সহায়তা দিয়েছে নেদারল্যান্ডস। পরিকল্পনা তৈরির জন্য ৪৭ কোটি ৪৭ লাখ টাকা অনুদান দিয়েছে দেশটি। পরিকল্পনা প্রণয়নে নেওয়া প্রকল্পটির কাজ চলতি বছর শেষ হচ্ছে। এতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৮ কোটি টাকা।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads