রবীন্দ্রনাথ : অতীতের স্মৃতি নন, বর্তমানের পথপ্রদর্শক
আল মামুন
প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৫, ২১:৩৭
যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে—শুধু একটি গানের কলি নয়, বরং এটি বাঙালির আত্মবিশ্বাস আর মানবতার অঙ্গীকার। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যাঁর কলম ছুঁয়েছিল বাংলা সাহিত্যের শিকড় আর ডালপালা একসাথে। জন্মের দেড় শতাব্দী পেরিয়েও তিনি যেন সময়ের থেকে অনেকটাই এগিয়ে থাকা এক চিরসবুজ প্রেরণা। বাংলা সাহিত্য থেকে সমাজ, শিক্ষা থেকে রাজনীতি—সবক্ষেত্রে আজও রবীন্দ্রচিন্তা আমাদের আলো দেখায়। বিশ্বকবির জন্মতিথিতে তাঁর প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে কথা বলেছেন পাঁচ ডিসিপ্লিনের বিশিষ্টজন।
রবীন্দ্রনাথ মানেই বাংলা সাহিত্য : ড. রুবেল আনসার
বাংলা ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. রুবেল আনসার বলেন, ‘বাংলা সাহিত্য এবং সমগ্র বাঙালির জীবনযাত্রায় রবীন্দ্রনাথের অবদান তুলনাহীন। তাঁকে সাহিত্য-সংস্কৃতির মাধ্যমে ছুঁতে পারে এমন পুরুষ যুগে যুগে বিরল। তাঁর সামগ্রিক রচনা ও জীবনবোধ কেবল অতীতে নয়, বর্তমান সময়েও সমান প্রাসঙ্গিক। আসলে বাংলা সাহিত্য মানেই রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করা। অনেকে ভাবেন, শুধু নোবেল জয়ই তাঁর স্মরণীয় কীর্তি, আসলে তা নয়। গান, নাটক, সিনেমা, দুঃখ-বেদনা, পারিবারিক চাপ—সবক্ষেত্রেই আমরা তাঁর সাহিত্যে আশ্রয় খুঁজি। তিনি আমাদের অন্তর্লীন অনুভবের অংশ।’
ভবিষ্যতের পথপ্রদর্শক রবীন্দ্রনাথ : আশিক মন্ডল
সমাজবিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের আশিক মন্ডল বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ শুধু অতীতের স্মারক নন, তিনি বর্তমান এবং ভবিষ্যতের দিশারি। তাঁর সাহিত্য, সংগীত ও দর্শনের মধ্য দিয়ে আমরা ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখি। বৈষম্য আর সহিংসতায় জর্জরিত এই সময়ে রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা আমাদের শান্তি, একতা আর মানবতার পথে ডাক দেয়। তাঁর চিন্তায় রয়েছে নারী অধিকার থেকে পরিবেশ রক্ষার বার্তা। তাঁর সেই চিরায়ত আহ্বান, 'যদি তোর ডাক শুনে কেও না আসে, তবে একলা চলো রে', আজও আমাদের আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তোলে।’
রবীন্দ্রনাথের বাণী আজও আলোকবর্তিকা : তানবীরা তাবাসসুম ঋতু
শিক্ষা ডিসিপ্লিনের তানবীরা তাবাসসুম ঋতু বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিন্তা ও সৃষ্টি কালজয়ী। মানবতা, প্রকৃতি আর স্বাধীনতার যে বাণী তিনি উচ্চারণ করেছেন, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। তাঁর কবিতা, গান ও দর্শন আমাদের আত্মানুসন্ধান আর বিশ্বভ্রাতৃত্বের শিক্ষা দেয়। যখন বিশ্ব সংকটে পড়ে, তখন রবীন্দ্রনাথের রচনা আমাদের শান্তি ও সহমর্মিতার পথ দেখায়। স্বদেশি চেতনা থেকে বিশ্বনাগরিকতা পর্যন্ত তাঁর উত্তরাধিকার আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়—যেখানে সত্য, যেখানে সৌন্দর্য, সেখানেই রবীন্দ্রনাথ।’
বিশ্বমানবতার কবি রবীন্দ্রনাথ : নাজমুস সাদাত সৈকত
বাংলা ডিসিপ্লিনের নাজমুস সাদাত সৈকত বলেন, ‘ওঁম সর্বস্ব পোশ্যত প্রিয়ম— হে প্রভু, আমায় সকল সৃষ্টির নিকট প্রিয় করুন। সম্ভবত এই অথর্ব বেদের মন্ত্র বুকে ধারণ করেই রবীন্দ্রনাথ সৃষ্টির ব্রত নিয়েছিলেন। মানবপ্রেম আর সত্য সাধনায় তিনি গড়েছিলেন বিশ্বভারতী, আর ব্রিটিশের নাইট উপাধি ত্যাগ করে দেখিয়েছিলেন বাঙালির আত্মমর্যাদা। গীতাঞ্জলি হোক বা চোখের বালি, পুনশ্চ কিংবা 'দুই বিঘা জমি'—তাঁর আবেদনের প্রাসঙ্গিকতা আজও অমলিন। তাঁর হাত ধরেই বাঙালি প্রথম বিশ্বমঞ্চে আন্তর্জাতিক সম্মানে ভূষিত হয়।’ জন্মতিথিতে তাঁকে স্মরণ করে তিনি বলেন— ‘ভ্রমর বসিল পুষ্পপরে, নিঙাড়িয়া তার দ্বেষ, ফোটেনি পুষ্প আপন তরে, জীবন করিয়া শেষ।’
রবীন্দ্রনাথ আজও সাহস ও প্রেরণার উৎস : মায়িশা রহমান ঐশী
ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ ডিসিপ্লিনের মায়িশা রহমান ঐশী বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ শুধু বাংলা নয়, তিনি বিশ্ব সাহিত্যেরও অবিস্মরণীয় নাম। মানবতাবাদ, প্রকৃতিপ্রেম, শিক্ষা আর স্বাধীনচেতা মনোভাব—সবই তাঁর রচনায় ছড়িয়ে আছে। যখন মানুষ বিভাজন, সহিংসতা আর মূল্যবোধহীনতায় জর্জরিত, তখন রবীন্দ্রচিন্তা আমাদের আশ্রয় আর আলোর পথ দেখায়। তাঁর বিশ্বভ্রাতৃত্ব আর আত্মার মুক্তির দর্শন আজও প্রাসঙ্গিক। তাঁর বীরপুরুষ কবিতা আমাদের সাহসী হতে শেখায়। তাই রবীন্দ্রনাথ কেবল অতীতের স্মৃতি নন, তিনি আজও প্রেরণা।’
বিভিন্ন দিক থেকে বিশ্লেষণ করলেও এক সত্য স্পষ্ট—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আজও প্রাসঙ্গিক, আজও প্রেরণা। জন্মের দেড় শতাব্দী পরও তিনি আমাদের সাহিত্য, সংস্কৃতি আর চিন্তার কেন্দ্র। বিশ্বকবির এই জন্মদিনে তাঁর বাণীই হোক নতুন আলোর দিশারি—যদি তোর ডাক শুনে কেও না আসে, তবে একলা চলো রে।
এমএইচএস

