কবি, গীতিকার, নাট্যকার ও গল্পকার এ এইচ এম এনামুল হকের জন্মদিন আজ। ১৯৬৭ সালের ৪ জানুয়ারি কুমিল্লার বুড়িচং থানার রাজাপুর ইউনিয়নের শংকুচাইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার বাবা প্রয়াত মোহাম্মদ সামছুল হক এবং মা সদ্যপ্রয়াত জাহানারা বেগম। সাত ভাইবোনের মধ্যে তিনি সবার বড়।
স্কুলজীবন কেটেছে শংকুচাইল আদর্শ সরকারি প্রাথমিক ও শংকুচাইল বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে। ছোটবেলা থেকেই কাব্যচর্চার প্রতি তার গভীর আগ্রহ। মাত্র ৯ বছর বয়স থেকেই তিনি কবিতা লেখা শুরু করেন। স্কুলের দেয়ালিকা দিয়ে কবিতা প্রকাশের শুরু। উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে। এরপর ঢাকায় এসে যুক্ত হন ‘সুবচন নাট্য সংসদ’-এর সঙ্গে, যেখানে মঞ্চ নাটকে অভিনয়ের মাধ্যমে তার সাংস্কৃতিক জগতে পদার্পণ। সেসময় জনপ্রিয় রম্য পত্রিকা উন্মাদে তার কবিতা প্রকাশিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।
কবিতার পাশাপাশি তিনি গীতিকার এবং সুরকার হিসেবেও উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। 'ড্রিমস' ব্যান্ডের গানের গীতিকার ও সুরকার হিসেবে কাজ করেছেন। তার রচিত ও সুরারোপিত ‘ফিরে ফিরে চায়’ শীর্ষক একক অ্যালবামটি শ্রোতাপ্রিয়তা পেয়েছে। আগে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫২ বছরে পদার্পণ উপলক্ষে ‘অক্ষর অরিজিনালস গানের মিছিল’ শিরোনামে অক্ষর রেকর্ডস সিরিজে তার ‘নিঝুম এক রাতে’, ‘মনের এক্সরে’সহ আটটি গান প্রকাশিত হয়। এছাড়া টিভি নাটক, চলচ্চিত্র ও বিজ্ঞাপনের মডেল হিসেবেও তিনি প্রশংসিত।
এনামুল হক একজন সফল গল্পকার। কথা সাহিত্যিক আনিসুল হকের ‘হৃদিতা’ উপন্যাসে চলচ্চিত্র রূপ দিয়ে তার যাত্রা শুরু। ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে ‘হৃদিতা’ নামের চলচ্চিত্রটি সরকারি অনুদান পায়। এটি নির্মাণ করেছেন পরিচালক জুটি ইস্পাহানি ও আরিফ জাহান। তার রচিত ‘জলরঙ’ চলচ্চিত্রটি সরকারি অনুদান পায় ২০২০-২০২১ অর্থবছরে। চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছেন কবিরুল ইসলাম রানা। ২০২১-২০২২ অর্থবছরে ‘আর্জি’ নামের তৃতীয় চলচ্চিত্রটি সরকারি অনুদানের জন্য নির্বাচিত হয়। ওপার বাংলার বিখ্যাত সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা রহস্য উপন্যাস ‘ঘাট বাবু’র নাট্যরূপ দিয়ে তিনি প্রশংসিত হন।
কবিতার ক্ষেত্রে তিনি নিজস্ব ধারা সৃষ্টি করেছেন। তার ‘দ্বিবর্ণা কাব্য’ এক নতুন কাব্যাঙ্গিকের পরিচায়ক। প্রতিটি কবিতায় চরণসংখ্যা চার থেকে ষোলো, প্রতিটি চরণে চারটি শব্দ এবং শব্দগুলো শুধুই মুক্তবর্ণ—এরকম স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে গঠিত। এই ধারাকে তিনি নাম দিয়েছেন ‘এনামি’। ‘দ্বিবর্ণা কাব্য’ বইয়ের ভূমিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সৌমিত্র শেখর লিখেছেন, ‘এ এইচ এম এনামুল হক- বাংলা কাব্যের মনোহর স্বর্গোদ্যানে একজন বিনয়ী উদ্যানপালক হিসেবে আবির্ভূত।’ তিনি লিখেছেন, ‘সত্যিই তো, বাংলা কাব্যাঙ্গিকে এ যেন নতুন ধারা- যা আমাদের জানা কোনো ভাষার সাহিত্যে আগে ছিল না, বাংলাতে তো নয়ই। আমরা কি গর্ব করে বলবো না, বাংলায় এ এক নতুন কাব্যাঙ্গিক!’ সৌমিত্র শেখর আরও লিখেছেন, ‘আপাতভাবে মনে হতে পারে-চার চরণের কবিতা-এ আর এমন কী! কিন্তু প্রাগুক্ত চারটি বৈশিষ্ট্য ধারণ করে চারটি চরণ মেলানো, সত্যি কি সহজ? এরপর আছে ভাব-কোথাও চতুর্পার্শ্বের অসঙ্গতিসমূহের বিরুদ্ধে তীর্যক ব্যঙ্গ, কোথাও অমানবিকতার বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদ, কোথাও প্রেম-অপত্যস্নেহের প্রকাশ আবার কোথাও নিজের সঙ্গে নিজের পরিহাস। নব অঙ্গভাস আর ভাবের রামধনুতে সত্যি বহুবর্ণিল এনামি। 'এনামি'-এভাবেই অভিহিত করা যাক-না আমাদের এই নতুন কাব্যধারাকে।’
এ এইচ এম এনামুল হকের বিচরণ শিল্পসাহিত্যের নানা অলিগলিতে। তার কাজের পরিধিও বিস্তৃত। সৃজনশীল নানা মাধ্যমের পাশাপাশি ‘গুলশান চা’ নামে নতুন চায়ের ব্র্যান্ড নিয়ে কাজ করছেন তিনি। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঝুঁকির মুখে দাঁড়ানো পৃথিবীতে যখন মূল্যস্ফিতি অনিয়ন্ত্রিত, তখন তিনি উদ্যোগ নিয়েছেন, দরিদ্র শিশুদের বিনামূল্যে খাবার খাওয়ানোর। ইতোমধ্যে সে লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।
সাহিত্য ও সংগীতের প্রতিটি শাখায় এনামুল হকের এই বহুমুখী সৃজনশীলতা তাকে বাংলা সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ স্থান তৈরি করে দেবে বলে মনে করেন সাহিত্যানুরাগীরা।
এমএইচএস

