Logo

শিল্প-সংস্কৃতি

মজিদ মাহমুদের দেওয়ান-ই-মজিদ পাঠ

Icon

রফিক সুলায়মান

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬, ১৬:৫৪

মজিদ মাহমুদের দেওয়ান-ই-মজিদ পাঠ

কবি হাফিজ, নজরুল ও মজিদ মাহমুদ, ছবি: সংগৃহীত

পারস্যের ক্লাসিক্যাল কবিদের রচনা সারা বিশ্বে বিপুল জনপ্রিয়- একথা নতুন করে বলার কিছু নেই। এক মৌলানা জালালুদ্দিন রুমির মসনবী শরীফ বর্তমান পৃথিবীর সবচে জনপ্রিয় গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত। এরপরই আছে বিভিন্ন কবিদের দিওয়ান ও রুবাইয়াৎ।

রুবাইয়াৎ সম্পর্কে সামান্য আলোকপাত করা যেতে পারে। চার লাইনের পঙক্তি; প্রথম, দ্বিতীয় ও চতুর্থ চরণের অন্ত্যমিল থাকতেই হবে। তৃতীয় চরণটি স্বাধীন। ভাব প্রকাশের ক্ষেত্রেও বাধ্যবাধকতা আছে। প্রথম দুই লাইনে কোনো প্রসঙ্গ, দার্শনিক ভাবনা, প্রেম বা প্রকৃতির বর্ণনা উপস্থাপন করা হয়। তৃতীয় লাইনে একটি চমকপ্রদ মোড় বা ভাবনার বিকাশ ঘটে। চতুর্থ বা শেষ লাইনে পুরো কবিতার মূল বক্তব্য বা সমাপ্তিসূচক গভীর বার্তা প্রদান করা হয়। 

অন্যদিকে দিওয়ান প্রধানত গজলধর্মী রচনা। দিওয়ান রচনায় অনন্য সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন মরমী কবি শামসউদ্দিন মুহম্মাদ হাফিজ শিরাজী।  

গত কদিন ধরে আমি যে গ্রন্থটি পড়ছি এর নাম 'দেওয়ান ই মজিদ’। লিখেছেন সব্যসাচী লেখক মজিদ মাহমুদ। এটি উৎসর্গ করা হয়েছে সর্বজন শ্রদ্ধেয় পারস্যের কবি হাফিজ শিরাজীকে। কবি সেখানে বিনয়ের সাথে লিখেছেন : ‘মজিদ বলে হাফিজের তরে / এই পদ্যটি লেখা হলো / সিরাজে যেয়ে বলো বুলবুল / বাংলার কবি সালাম জানালো।’

‘দেওয়ান ই মজিদ’ গ্রন্থে কবিতার সংখ্যা ৩৭টি, সাথে আছে একটি অসাধারণ ভূমিকা। মজিদ মাহমুদ ভূমিকায় জানিয়েছেন, বাংলার স্বাধীন সুলতান গিয়াসউদ্দিন আযম শাহ্ একবার পারস্যের কবি হাফিজকে নিমন্ত্রণ করেছিলেন বাংলায়। হাফিজ আসতে পারেননি, তবে এই আমন্ত্রণ তাঁকে প্রীত করেছিলো। সুলতান গিয়াসউদ্দিন আযম শাহ্-কে তিনি 'বাংলার বুলবুল' আখ্যা দিয়ে একটি কবিতাও লিখেছিলেন। মূল ফার্সি : শক্করশিকান শওদন্ত হামী-আ-আনে বেঙ্গলা,/ ক’জ-হিন্দ গুজর মীকুনদ ই কন্দ-ই-পার্সী। ব্রিাটশ অনুবাদক আর্থার জে আরবুরি’র অনুবাদে পাই : How happy in their sugar-pecking these Indian Parrots all, / Who banquet on this Persian candy transmitted to Bengal! হাফিজের এই কবিতাটি প্রত্যেক বাঙালি ও উপমহাদেশের পাঠকদের পাঠ করা উচিত।  

আমরা জানি পারস্যের কবিরা দিওয়ান-এ প্রতীকী ভাষা ব্যবহার করেছেন।  যেমন সুফি দর্শনে ‘মদ’ হলো ঐশী প্রেমের সুধা বা আধ্যাত্মিক পরমানন্দ, যা পান করলে মানুষের জাগতিক অহংকার দূরিভূত হয়। আর ‘সাকী’ হলেন মুর্শিদ (আধ্যাত্মিক গুরু) বা স্বয়ং স্রষ্টা, যিনি এই প্রেমের সুধা বিতরণ করেন। হাফিজের মতো তিনিও মনে করেন, কেবল বুদ্ধি বা যুক্তি দিয়ে স্রষ্টাকে ছোঁয়া অসম্ভব; তাকে পেতে হলে হৃদয়ে নিষ্কাম ও সীমাহীন প্রেম থাকতে হবে। অর্থাৎ মানুষের সৃষ্টিই হয়েছে ভালোবাসার জন্য। তাঁর প্রথম কবিতায়ই স্রষ্টার বিচ্ছেদে কবির আত্মার তীব্র হাহাকার এবং মিলনের আকুলতা প্রকাশ পেয়েছে। এটাই দিওয়ানের মূল কথা বা ঐশ্বর্য। মজিদ মাহমুদ গ্রন্থের প্রথম কবিতায় লিখছেন : ‘উৎসবে আমি করবো না পান / যত পুরাতন হোক না মদ / আমার দুয়ারে মাল্য হাতে / যতদিন না পড়ে প্রিয়ার পদ।’ ইরানের কবি হাফিজের মতোই দার্ঢ্য উচ্চারণ!    

অন্যদিকে ‘কামনা’ কবিতায় মজিদ মাহমুদ নিজের লুকোচুরি স্বভাব উপস্থাপন করেছেন এভাবে : ‘পান-পেয়ালার মধ্যে দেখি / তোমার দুটি করুণ চোখ / সত্যগোপন হাসির ছলে / কথায় কথায় করি শ্লোক।’ এই পঙক্তিতে হাফিজ এবং নজরুলের মিলিত হাহাকার ধরা পড়েছে। নজরুলের ‘যাও মেঘদূত’ গীতিকবিতায় একই সুর উথলে উঠেছে। ‘গুড়েবালি’ কবিতায় মজিদ মাহমুদের হাতে নজরুল বাঙময় হয়েছেন অনন্য ব্যাঞ্জনায় : ‘তোমার প্রেমের শরাব পেতে / ছিল এক কবি নজরুল / মুখ খোলেনি দুকুড়ি বছর / তোমার দেখার এমন মাশুল।’ 

গ্রন্থটি হাফিজের করকমলে উৎসর্গীত হলেও মজিদ মাহমুদ জানাচ্ছেন এই গ্রন্থ রচনার প্রয়াসের সাথে তাঁর কোনো যোগাযোগ প্রত্যক্ষভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তিনি নিজেও হাফিজের শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিয়েছেন। এবং হাফিজের মরমীয়বাদের পর্দা বিদীর্ণ করে সেখানে পৌঁছানো কোনো কবির পক্ষেই সম্ভব নয় - এটাও ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন। বিনম্রতায় স্বীকার করেছেন যে পারস্যে হাফিজের জন্ম না হলে বাংলায় এই গ্রন্থের সৃষ্টি হতো না।  

‘দেওয়ান ই মজিদে’ সংকলিত কবিতাগুলোয় মানবীয় আবেগ, দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ, বিবিধ বাসনা এবং নিখিল সত্তার প্রতি গভীর ভালোবাসা প্রকাশিত হয়েছে। যারা ফার্সি সাহিত্যের নিবিড় পাঠক তাঁরা বাংলা ভাষায় ‘দেওয়ান’ পাঠ শুরু করলে শেষ করার আগে থামা অসম্ভব।

দেওয়ান-ই-মজিদ: মজিদ মাহমুদ। প্রকাশনী: আশ্রম। প্রচ্ছদ: আহসান আহমেদ। পৃষ্ঠা: ৬৪।  

বাংলাদেশের খবর/আরইউ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন