সৃজনের মাসিক পাঠচক্রে আলোচনা
‘মৃত্যু ও নির্বাসন’ এবং রাজনীতির সঙ্গে সাহিত্যের সম্পর্ক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬, ১৭:৪০
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি বাংলা একাডেমির আল মাহমুদ কর্নারে অনুষ্ঠিত হয়েছে সাহিত্য-সংস্কৃতি ও সমাজ-রাজনীতি চর্চার সংগঠন ‘সৃজন’ এর মাসিক পাঠচক্র।
পাঠচক্রের প্রথম পর্বে কবি শাহ বুলবুলের ‘মৃত্যু ও নির্বাসন’ কাব্যগ্রন্থের পাঠ পর্যালোচনায় অংশ নেন কবি হুসাইন আলমগীর, কবি সফিকুল ইসলাম, কবি ও কথাসাহিত্যিক আহমেদ বাসার ও কবি নুসরাত সুলতানা।
শাহ বুলবুলের ‘মৃত্যু ও নির্বাসন’ কাব্যগ্রন্থ সম্পর্কে হুসাইন আলমগীর বলেন, কবি মূলত কবিতার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র সমাজের দুঃখ, বঞ্চনা, হতাশা, অসঙ্গতিকে নিজস্ব ভাবনার ভেতর দিয়ে গণমানুষের সম্মুখে তুলে ধরেন। কবি শাহ বুলবুল এর ব্যতিক্রম নন। তিনি তার কাব্যগ্রন্থ ‘মৃত্যু ও নির্বাসন’ এর ভেতর দিয়ে ব্যক্তি ও সমাজের অন্তর্গত বেদনাকে তার অভিজ্ঞতার মূর্ত ক্যানভাসে, কখনো রূপক, কখনো প্রতীক, কখনো আবার বৈপরীত্যের মধ্য দিয়ে প্রকাশের স্বাক্ষর রেখেছেন। এ কবি অত্যন্ত পরিশ্রমী, কঠোর সাধানার ফল এই কাব্যগ্রন্থ। তিনি কবিতায় যেসকল শব্দ, উপমা বা প্রাসঙ্গিক শব্দ ব্যবহার করেছেন তাতে, সন্দেহের অবকাশ নেই- তিনি একজন অসাধারণ পাঠকও। তার শব্দের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ। তিনি তার শৈশব থেকে ঢাকার যান্ত্রিক জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত, এমনকি আন্তর্জাতিক সমাজের অশান্তি ও অসঙ্গতির কথা নিজস্ব আঙ্গিকে তুলে ধরেছেন।
‘মৃত্যু ও নির্বাসন’ কাব্যগ্রন্থ সম্পর্কে কবি আহমেদ বাসার বলেন, কাব্যগ্রন্থটি মৃত্যুমগ্ন অথবা মৃত্যুময়। তবে মৃত্যু এখানে ভয়ঙ্কর বা নির্মম নয়। বরং রোমান্টিক কবিদের মতো মৃত্যু এখানে হয়ে উঠেছে পার্থিব যন্ত্রণা থেকে মুক্তির পথ। কিন্তু রোমান্টিক কবিদের মতো এ কাব্যটি কেবল ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়, বরং সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্ব পরিসরে বিস্তৃত কবির কাব্য ভূগোল।
‘মৃত্যু ও নির্বাসন’ কাব্যগ্রন্থ সম্পর্কে কবি নুসরাত সুলতানা বলেন, কবি কোনো সুনির্দিষ্ট ভূগোলে আটকে থাকতে পারেন না। শাহ বুলবুল যেমন বাংলাদেশের প্রকৃতি ছেনেছুঁয়ে কবিতা লিখেছেন তেমনি একইসঙ্গে কবিতায় এসেছে বৈশ্বিক উপাদান। শাহ বুলবুলের এই কাব্যগ্রন্থে ‘মেঘের মাদুলি মন’ এর মতো নিপাট সুন্দর আরও কিছু কবিতা আমরা পেয়েছি। শুয়োপোকা যেমন প্রজাপতি হয়ে যায় তেমনি একজন সাধারণ আটপৌরে মানুষ দুঃখ, বৃহৎ বেদনাবোধ, হতাশা, বিচ্ছেদ-বিরহ, গ্লানিতে পুড়ে পুড়ে হয়ে ওঠেন সফল এবং নান্দনিক কবি। শাহ বুলবুল বেদনার বিষে জর্জরিত হয়ে উঠবেন এবং একুশ শতক মহাকালকে উপহার দেবে এক দুর্দমনীয়, নান্দনিক কবিতা।
পাঠচক্রের দ্বিতীয় পর্বে ‘উচ্চশিক্ষা ও রাজনীতি: সাহিত্যের সম্পর্ক’ বিষয়ে বক্তব্য দেন লেখক, শিক্ষক ও চিন্তক শিবলী আজাদ। শিবলী আজাদ বলেন, উচ্চশিক্ষা, রাজনীতি ও সাহিত্যের মাঝে পজিটিভ কো-রিলেশন বিদ্যমান। উচ্চশিক্ষা মানুষের মন-মননবোধ ও সাহিত্য অনুধাবনে সাহায্য করে। ডিসকার্সিভ জ্ঞানের জন্ম হয় উচ্চশিক্ষার প্রসারে। টেক্সট পাঠ করার হরেক পদ্ধতি আবিষ্কার হয়। জ্ঞান বিস্তারের পাশাপাশি সাহিত্যিক বোধ জাগ্রত হয়। নতুন ঘরানার উদ্ভব ঘটে, সাহিত্যের দিগন্ত হয় বিস্তৃত। এপ্রিশিয়েশনের ক্ষমতা বাড়ায় উচ্চশিক্ষা। নতুন নতুন লেখকের আবির্ভাব নিশ্চিত করে।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে কবি গাজী গিয়াস উদ্দিনের পঠিত একক কবিতার ওপর আলোচনা করেন প্রফেসর ড. আনোয়ারুল হক এবং প্রফেসর ড. সেলিম আকন্দ। গাজী গিয়াস উদ্দিনের কবিতা নিয়ে আনোয়ারুল হক বলেন, তার কবিতায় স্বদেশচেনা আছে, আছে ফিলিস্তিনের ক্ষুধার্ত শিশুটির জন্য মর্মযাতনা। জায়নবাদ, পুঁজিবাদী অপশক্তির অবসান ঘটিয়ে মানবমুক্তির বাসনা তাঁর কবিতাকে আলাদা বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। কবি গাজী গিয়াস উদ্দিন আত্মমুক্তি ও কাব্য-সাধনায় তার অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হবেন এই শুভকামনা সবসময়।
গাজী গিয়াস উদ্দিনের কবিতা নিয়ে প্রফেসর ড. সেলিম আকন্দ বলেন, সাহিত্যের সকল শাখায় গাজী গিয়াস উদ্দিনের সফল পদচারণা। উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, প্রবন্ধ সমালোচনা, সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা ইত্যাদি রচনা ও সম্পাদনায় সমান দক্ষ তিনি। দেশভাগ, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস, ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি ইত্যাদি বিষয় তার আরাধ্য সাধনার ক্ষেত্র। তবে তিনি ব্যাপকভাবে পরিচিত একজন কবি হিসেবে। অর্থ ও ইঙ্গিতবাহী সুনির্বাচিত শব্দ, প্রাসঙ্গিক অনুপ্রাস, জুতসই উপমা, উৎপ্রেক্ষা, চিত্রকল্প, মানানসই অলংকার আর গদ্যছন্দ সহযোগে তিনি তার হৃদয়ের ভাবনাপুঞ্জকে কবিতায় রূপ দেন। তার কবিতায় ইতিহাস, ঐতিহ্য, সভ্যতা, ভূগোল আর পুরাণের ব্যবহার তাকে কুশলী কবিতে পরিণত করেছে। নগর সভ্যতার বহুদূরে এক লোকালয়ে এই প্রচার বিমুখ নিভৃতচারী কবির বসবাস। অথচ কবিতার নির্মিতিতে তাকে উত্তর-আধুনিককালের একজন নিরীক্ষাধর্মী সফল কবি বলে অভিহিত করা যায়।
পাঠচক্রে উপস্থিত কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য- মো: খলিলুর রহমান, আরিফ মঈনুদ্দিন, সাদমান সজীব, মুহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেন, হাইকেল হাশমী, সুরাইয়া ফারজানা হাসান, ইব্রাহীম খলিল, মেহেদী হাসান, আরিফা ইসলাম, শাহরিয়া দিনা, সালেহা ফেরদৌস, খালিদা তালুকদার, ফারহানা তানিয়া, আশিক রেজা, রাইয়ান রেজা, বোরহান মাসুদ, শারমিন হক, সুলেখা আক্তার শান্তা, ফরিদুল ইসলাম নির্জন, আশিকা নিগার, বাবু বরকতউল্লাহ, মো. মঞ্জুর আহমেদ, মো. ইরফান প্রধান, ফারজানা ববি, মুর্শিদা রহমান, রফিক লিটন, সুমাইয়া তাসতনিয়া নিশা, সালেহা তারিন, মাশরুবা তাসনিন মাফি, তাসকিন খান, স্বরন দে, কুসুম তাহেরা, ওয়াসি, আইভি আক্তার, মো. ইয়াসিন, মো. আহসান হাবীব, এমদাদ হোসাইন, মো. নাহিদ সরওয়ার, ফরিদা ফারহানা, মো. আমজাদ হোসেন, মো. কুদ্দুস প্রমানিক, তৌহিদ আহাম্মেদ লিখন প্রমুখ।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

