Logo

শিল্প-সংস্কৃতি

অধ্যাপক ড. আবদুস সাত্তারের ‘সাত চিত্রের ময়নাতদন্ত’

Icon

রফিক সুলায়মান

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১৭:২৬

অধ্যাপক ড. আবদুস সাত্তারের ‘সাত চিত্রের ময়নাতদন্ত’

অধ্যাপক ড. আবদুস সাত্তার ও সাত চিত্রের ময়নাতদন্ত গ্রন্থের প্রচ্ছদ, ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে একুশে পদকে সম্মানিত চিত্রশিল্পী অধ্যাপক ড. আবদুস সাত্তারের নতুন শিল্পকলা বিষয়ক গ্রন্থ ‘সাত চিত্রের ময়নাতদন্ত’। বিশ্বখ্যাত সাতটি শিল্পকর্মকে তিনি চুলচেরা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন কেন এই শিল্পকর্মগুলো কালোত্তীর্ণ এবং কেন আধুনিক চিত্রভুবনেও এগুলোর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। তাঁর নিজের ‘পোড়াকাঠে গোলক’ শিল্পকর্মটি নিয়েও একটি অধ্যায় সন্নিবেশিত হয়েছে।

বাকি ছয় মহান চিত্রকর হলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, পটুয়া কামরুল হাসান, রাজা রবি বর্মা, এদভার্দ মুঙ্খ, দ্য ভিঞ্চি এবং পাবলো পিকাসো। 

প্রথমেই আলোচনা করতে চাই অধ্যাপক আবদুস সাত্তারের ‘পোড়াকাঠে গোলক’ উডব্লক ছাপচিত্রটি নিয়ে। এই শিল্পকর্মটির জন্যে তিনি ১৯৮১ সালে প্রথম এশীয় দ্বি-বার্ষিক চিত্রোৎসবে গ্র্যান্ড প্রাইজ লাভ করেছিলেন। এর থিম, উপস্থাপন এবং মর্মস্পর্শী গল্প দর্শক, শিল্পী এবং শিল্পবোদ্ধা সকলকে ভাবনার গভীরে নিয়ে যায়। পেছনে আছে ১৯৭১, মুক্তিযুদ্ধের প্রারম্ভিক প্রহর। শিল্পীর সহপাঠী শাহনেওয়াজ শহীদ হন হানাদারদের হাতে যুদ্ধ শুরুর প্রথম ঘন্টায়। সেই হৃদয়বিদারক ঘটনাকে উপস্থাপন করেছেন ‘পোড়ামাটির গোলক’ শীর্ষক ছাপচিত্রে। এই সৃষ্টির সঙ্গে তুলনীয় হতে পারে উইলিয়াম হোমস সুলিভানের আঁকা জুলিয়াস সিজারের হত্যাকাণ্ড কিংবা জাঁ-পিয়ের হাউলের আঁকা বাস্তিল দুর্গ আক্রমণ বিষয়ক চিত্রকর্ম। ১৯৮৮ সালে এই ছাপচিত্রটি পৃথিবীর সেরা প্রিন্টমেকিং শিল্পীদের এক প্রদর্শনীতে শ্রেষ্ঠ শিল্পীর স্বীকৃতি এনে দেয় শিল্পীকে। 

রাজা রবি বর্মার যে চিত্রকর্ম নিয়ে লেখক উচ্ছসিত এর নাম ‘উর্বশী’। মহাভারত ও পুরানের গল্প অনুসারে উর্বশী ছিলেন স্বর্গের এক অপ্সরা যিনি মর্ত্যের রাজা পুরুরবার প্রেমে পড়েছিলেন এবং কিছুদিন মর্ত্যে তাঁর সঙ্গে বসবাস করেছিলেন। রাজা রবি বর্মা তাঁর চিরাচরিত বাস্তববাদী (Realistic) ও উজ্জ্বল রঙের শৈলীতে উর্বশীর দিব্য সৌন্দর্য এবং রাজা পুরুরবার ভক্তি ও আকুলতা ফুটিয়ে তুলেছেন। চিত্রটিতে উর্বশীর স্বর্গীয় অবয়ব, মর্ত্যধামে তাঁর নেমে আসা কিংবা প্রস্থানের মুহূর্তের নীরব আকুতি ও আবেগ নিখুঁতভাবে প্রকাশ পেয়েছে। 

শিল্পাচার্যের দুর্ভিক্ষ চিত্রমালার অন্যতম একটি স্কেচ নিয়ে লেখক আবদুস সাত্তার বিষদ আলোচনা করেছেন। কঙ্কালসার দেহ, খালি থালা, শীর্ণ কুকুর আর একটি ক্ষুধার্ত কাক। একদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, অন্যদিকে বাংলায় চলছে দুর্ভিক্ষ। একই সময়ে লন্ডন মেট্রোতে ছবি আঁকছেন হেনরি মুর, আর কলকাতায় দুর্ভিক্ষের ছবি আঁকছেন তরুণ জয়নুল আবেদিন। মুসলিম লীগ সরকার তখন ক্ষমতায়, ইংল্যান্ডে উইনস্টোন চার্চিল। বাংলার এই দুর্ভিক্ষ দুই শাসকেরই ভিত নাড়িয়ে দেয়। অভাব, হাহাকার, মহামারি, রাস্তায় মৃত্যুর সারি, ডাসবিনে কাক আর মানুষের কাড়াকাড়ি - এই দৃশ্য নাড়া দেয় শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনকে। খসাখস কয়েক টানে আঁকতে থাকেন স্কেচ। ফুটপাত ধরে তিনি এগুতে থাকেন আর মর্মান্তিক বিষয় নিয়ে সাজাতে থেকেন শিল্পের পসরা। কলকাতা হয়ে সারা বিশ্বে এই শৈল্পিক প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে। 

শিল্পী কামরুল হাসানের ১৯৭৫ সালের দিকে আঁকা ‘নাইয়র’ একটি বহুল পরিচিত ও প্রশংসিত চিত্রকর্ম। তেলরঙ মাধ্যমে জ্যামিতিক ফর্ম ও লোকজ রেখায় আঁকা ছবিতে বাঙালি গ্রামীণ জীবনের ঐতিহ্য, নারীর রূপ এবং আত্মিক টানের এক অপূর্ব প্রকাশ ঘটেছে। এর শৈল্পিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব অপরিসীম। ছবির মূল শক্তি গাঢ় ও বলিষ্ঠ রেখা এবং রঙের ব্যবহার। এই ছবির গুরুত্ব এতটাই যে, বাংলাদেশ সরকার ১৯৮৬ সালে ‘নাইওর’ চিত্রকর্মটি অবলম্বনে একটি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে। লেখক আবদুস সাত্তার পোস্ট-মর্টেম করে দেখিয়েছেন কেন এই শিল্পকর্মটি বিশ্বমানের - এমনকি মোনালিসা, চিৎকার, সানফ্লাওয়ার সিরিজের চিত্রমালার মতোই এই কাজটি বিশ্বচিত্রভুবনে আলোচিত হওয়ার মতো কাজ।  

উপমহাদেশের বাইরের তিন শিল্পী ইউরোপের - মুঙ্খের চিৎকার, ভিঞ্চির মোনালিসা এবং পিকাসোর গোয়ের্নিকা। 

এদভার্দ মুঙ্খের চিৎকার ১৮৯৩ সালে আঁকা বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত একটি চিত্রকর্ম। নরওয়েজীয় ভাষায় এর নাম 'স্ক্রিক'। লালচে আকাশ ও জলার ধারের রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা এক আতঙ্কিত মানুষের মুখাবয়ব দিয়ে মানুষের চরম একাকীত্ব ও ভয়ের অনুভূতি প্রকাশ করা হয়েছে। এই ছবিতে বাস্তবসম্মত রঙের পরিবর্তে মানসিক তীব্রতা ও ভয় প্রকাশ করতে প্রতীকী ও উচ্চকিত রঙ ব্যবহার করা হয়েছে। রক্তিম আকাশ ও গাঢ় নীল ফিওর্ডের বৈপরীত্য এবং হলুদ-কমলার অদম্য তরঙ্গায়িত ব্যবহার দর্শকের মনে এক অজানা আতঙ্ক ও একাকীত্ব জাগিয়ে তোলে। আকাশের লাল ও কমলা রঙের তীব্র বাঁকগুলো যেন চারপাশের বাতাসকে বিষাক্ত ও উত্তপ্ত করে তোলে, যা ভেতরের মানসিক আর্তনাদের প্রতীক। নিচের ল্যান্ডস্কেপ ও জলের অংশে গাঢ় নীল, সবুজ এবং কালো রঙের ব্যবহার হতাশা, মৃত্যুভাব ও গভীর বিষাদের আবহ তৈরি করে। অন্যদিকে আকাশ ও প্রকৃতির রেখায় হলুদ এবং সবুজের অদ্ভুত ঢেউ খেলানো রূপ ছবির প্রধান চরিত্রটির আতঙ্ককে চারপাশের প্রকৃতিতে ছড়িয়ে দেয়। লেখক আবদুস সাত্তার মনে করেন, রঙের এই বৈপরীত্য ও তীব্র মিশ্রণ কোনো দৃশ্যমান সৌন্দর্য নয়, বরং শিল্পীর মনের ভয় ও চরম উদ্বেগের সরাসরি দৃশ্যরূপ।  

লিওনার্দো দা ভিঞ্চির আঁকা ‘মোনালিসা’ চিত্রকর্মটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় শিল্প রহস্য। এর মূল রহস্য লুকিয়ে আছে নারীর পরিচয়, চোখের দৃষ্টি, এবং বিখ্যাত মায়াবী হাসির পেছনে। বর্তমানে এটি প্যারিসের লুভ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে।  বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞের মতে নারীটি ফ্লোরেন্সের সিল্ক ব্যবসায়ী ফ্রান্সেসকো দেল গিওকন্দোর স্ত্রী লিসা গেরারদিনি। তবে দা ভিঞ্চির নিজের মায়ের রূপও এতে মিশে আছে বলে অনেকে মনে করেন। এক পলকে মনে হয় তিনি হাসছেন, আবার তাকালেই হাসি মিলিয়ে যায়। কারণ দা ভিঞ্চি চোখের কোণ ও ঠোঁটের কোণে এমনভাবে রঙ মিশিয়েছেন, যা সরাসরি না দেখে পাশ থেকে দেখলে হাসির দ্যোতনা তৈরি করে। লেখক আবদুস সাত্তার মোনালিসা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন, চুরি যাওয়া এবং পুণরুদ্ধার পর্বটি শ্বাসরুদ্ধকার। আগ্রহী পাঠকগণ পরিপূর্ণ শিল্পরস আস্বাদনের পাশাপাশি থ্রিলার পাঠেরও আনন্দ পাবেন। 

এই গ্রন্থের সাত নম্বর চিত্রকর্মের নাম গোয়ের্নিকা। পিকাসোর আঁকা বিশ্বনন্দিত প্রতিবাদী শিল্পকর্ম। স্পেনীয় গৃহযুদ্ধের সময় ১৯৩৭ সালের ২৬ এপ্রিল উত্তর স্পেনের গোয়ের্নিকা শহরে জার্মানি ও ইতালির যুদ্ধবিমানের নির্মম বোমা হামলার ধ্বংসলীলা ও মানুষের আর্তনাদ এতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এটি একটি বিশাল আকৃতির ক্যানভাস। এর দৈর্ঘ্য সাত দশমিক ৭৬ মিটার এবং উচ্চতা তিন দশমিক ৪৯ মিটার। শিল্পী এতে কোনো রঙিন রং ব্যবহার করেননি। শুধু সাদা, কালো ও ধূসর রঙের মাধ্যমে ভয় ও অন্ধকারের রূপ ফুটিয়ে তুলেছেন। চিত্রে একটি আহত আর্তনাদরত ঘোড়া, ষাঁড়, মৃত শিশু এবং কান্নাকাটি করা মানুষদের দেখা যায়। ছবিটি আঁকার পর দীর্ঘদিন বিশ্বজুড়ে প্রদর্শিত হয়। স্পেনে গণতন্ত্র ফেরার পর ১৯৮১ সালে এটি দেশটিতে ফিরিয়ে আনা হয়।

‘সাত চিত্রের ময়না তদন্ত’ এই সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা। বিশ্ববিখ্যাত গুরুত্বপূর্ণ চিত্রকর্মের সাথে লেখক আবদুস সাত্তার আমাদেরকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার মহৎ উদ্দেশ্যে গ্রন্থটি রচনা করেছেন। অত্যন্ত সহৃদয় স্টাইলে তিনি পাঠকদেরকে শিল্পের সঙ্গে এক গভীর বন্ধনে গেঁথে ফেলেন। বইটি শেষ না করে ওঠা যায় না। এখানেই লেখকের অনুপম কৃতিত্ব।   

‘সাত চিত্রের ময়না তদন্ত’ প্রকাশ করেছে একাত্তর প্রকাশনী। লেখক নিজেই প্রচ্ছদ করেছেন। দাম রাখা হয়েছে ৩০০ টাকা। 

রফিক সুলাইমান: শিল্প সমালোচক। 

বাংলাদেশের খবর/আরইউ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন