শিল্প ও সাংবাদিকতায় ফরিদ আহমেদ রিপনের পথচলা
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫:৫৫
ছবি: সংগৃহীত
ছোটবেলায় থিয়েটারের আলো ঝলমলে মঞ্চে পা রেখে যে শিশুটির চোখে ভেসে উঠত এক নতুন পৃথিবীর স্বপ্নে, সে স্বপ্ন খুব সহজে ধরা দেয়নি।
আলো-আঁধারির সেই শুরু থেকে আজ কেটে গেছে চার দশকেরও বেশি সময়। যে বয়সে একটি শিশুর খেলার মাঠে মেতে থাকার কথা, সে বয়সে চরম পারিবারিক প্রতিকূলতা আর স্বজন হারানোর বেদনা বুকে চেপে তাকে সামলাতে হয়েছে বিশাল এক সংসারের হাল। তবে জীবনসংগ্রামের সেই কঠিন পথ অতিক্রম করেও যিনি থামেননি, তিনি ফরিদ আহমেদ রিপন।
চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার কাছিয়াড়ার কলাবাগান ভিলায় প্রয়াত শিক্ষাবিদ মো. কলিম উল্যাহ মিয়াজী ও ফিরোজা বেগমের ঘর আলোকিত করে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি সময়ের পরিক্রমায় আজ দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গন, গণমাধ্যম ও সমাজসেবার ক্ষেত্রে এক সুপরিচিত নাম। একাধারে তিনি প্রবীণ সাংবাদিক, নাট্যাভিনেতা, সাংস্কৃতিক সংগঠক ও মানবতাবাদী সমাজসেবক।
পরিবার সামলানো আর স্বজন হারানোর ট্র্যাজেডি: ফরিদ আহমেদ রিপনের জীবনে শোকের কালো ছায়া নেমে আসে আশির দশকের শুরুতেই। ১৯৭০ থেকে ৮০ সালের মধ্যে তিনি একে একে তার তিন আদরের বোন— মনি, এমিলি ও শাহিনকে হারিয়ে গভীর শোকে পড়েন।
এই শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই ১৯৮৩ সালে আকস্মিকভাবে মারা যান তার বাবা, প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ মো. কলিম উল্যাহ মিয়াজী।
তখন রিপনের বয়স মাত্র ২৪ বছর। অতটুকু বয়সেই বাবার অবর্তমানে সাত ছোট ভাই— ফারুক আহমদ লিটন, ফখরুল ইসলাম মিলন, ফেরদৌস আলম শুসান, নুরুন্নবী নোমান, আমান উল্যাহ আমান, আখতার-উজ-জামান ও আহসান হাবীবের গুরুদায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন তিনি।
ভাইদের লেখাপড়া ও মানুষ করার দায়িত্বের পাশাপাশি তার নিজের সংসারে সহধর্মিণী সাবিনা ইয়াসমিন এবং জ্যেষ্ঠ সন্তান সিরাজুস সালেকিন সৈকতকে নিয়ে পথচলা শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে মেজো ছেলে ফায়জুস সালেহীন শান্ত এবং ২০০৪ সালে একমাত্র কন্যা ইশরাত ফারাবী অর্পির জন্ম হয়।
তবে দুঃখের ট্র্যাজেডি সেখানে থেমে থাকেনি। ১৯৯৪ সালে গর্ভধারিণী মা ফিরোজা বেগমকেও হারান তিনি। পরপর স্বজন হারানোর এই তীব্র আঘাতে গভীরভাবে কাতর হলেও কখনো ভেঙে পড়েননি রিপন। এক হাতে সাত ভাইয়ের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ তৈরি, আর অন্য হাতে নিজের পরিবার ও সামাজিক দায়বদ্ধতা সামলে তিনি এক অনন্য মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
শিশুশিল্পী থেকে দূরদর্শনের সাবলীল অভিনেতা চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক আবহাওয়ায় বেড়ে ওঠার সুবাদে খুব ছোটবেলাতেই শিল্পের প্রতি অনুরাগী হয়ে ওঠেন ফরিদ আহমেদ রিপন। সত্তরের দশকের শেষের দিকে মাত্র সাত বছর বয়সে একটি স্থানীয় মঞ্চনাটকে শিশুশিল্পী হিসেবে তার অভিনয় জীবনের সূচনা। প্রথম নাটকেই সাবলীল বাচিক ভঙ্গি এবং অভিনয় দিয়ে দর্শক ও সমালোচকদের দৃষ্টি কাড়েন তিনি।
পরবর্তীতে বাংলাদেশ বেতার চট্টগ্রাম কেন্দ্রের শিশু-কিশোর অনুষ্ঠানে নিয়মিত অভিনয়ের পাশাপাশি আবৃত্তি ও বিতর্কেও নিজের মেধার স্বাক্ষর রাখেন।
শিশুশিল্পী হিসেবে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে একাধিক পুরস্কারেও ভূষিত হন তিনি। আশি ও নব্বইয়ের দশকে মঞ্চ ও টেলিভিশনের স্বর্ণযুগে ফরিদ আহমেদ রিপন নিয়মিত নাট্যচর্চায় যুক্ত ছিলেন। হাস্যরসাত্মক চরিত্র থেকে শুরু করে গম্ভীর ও বাস্তবমুখী ভূমিকার রূপায়ণে তিনি ছিলেন সমান স্বাচ্ছন্দ্যময়। থিয়েটার ও নাট্যাঙ্গনে তরুণ কর্মীদের যুক্ত করতে ও তাদের দিকনির্দেশনা দিতেও তিনি সর্বদাই অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।
সংবাদকর্মে আপসহীন ও সত্যের সন্ধানী: অভিনয় ও সংস্কৃতির আঙিনা ছাপিয়ে ফরিদ আহমেদ রিপনের জীবনের আরেক মূল ক্যানভাস হলো ‘সাংবাদিকতা’। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি পেশাদার সংবাদকর্মী হিসেবে পুরোদমে কাজ শুরু করেন। সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হলেও সাংবাদিকতার মাঠে তিনি ছিলেন অত্যন্ত আপসহীন, দায়িত্বশীল ও বস্তুনিষ্ঠ।
দেশের শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিক দৈনিক সমাচার, আবির্ভাব, দ্য ক্যাপিটাল নিউজ, দৈনিক তৃতীয় মাত্রা, দৈনিক গণজাগরণ এবং প্রতিদিনের বার্তাকণ্ঠ পত্রিকায় দীর্ঘকাল সিনিয়র ও দায়িত্বশীল পদে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার।
পেশাগত জীবনে তৃণমূলের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা, অন্যায়, দুর্নীতি, সামাজিক অসংগতি এবং লুপ্তপ্রায় সংস্কৃতি তুলে ধরে অসংখ্য অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করেছেন তিনি। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়ভিত্তিক গভীর ফিচার রচনার জন্য গণমাধ্যম অঙ্গনে তার বিশেষ খ্যাতি রয়েছে। তিনি বিভিন্ন আঞ্চলিক ও জাতীয় সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং বহু তরুণ ও নতুন বার্তা সংগ্রাহককে সাংবাদিকতায় হাতখড়ি দিয়েছেন।
মুক্তচিন্তা, সংস্কৃতি ও সমাজসেবা: সংস্কৃতিকে সমাজ পরিবর্তনের প্রধান হাতিয়ার মনে করা ফরিদ আহমেদ রিপন কেবল অভিনয়ে সীমাবদ্ধ থাকেননি; যুক্ত থেকেছেন অসংখ্য সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নীতি নির্ধারণে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিস্তার, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠন, জাতীয় ঐতিহ্য রক্ষা এবং মৌলবাদবিরোধী সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তিনি সব সময় প্রথম সারির যোদ্ধা হিসেবে কাজ করেছেন। শিল্প ও পেশাগত পরিচয় ছাড়িয়ে তিনি একজন মানবিক অন্তরের মানুষ। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যেমন— বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের সময় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে ত্রাণ ও চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিয়েছেন তিনি।
অনাহারে-অনাদরে দিন কাটানো প্রবীণ দুস্থ শিল্পীদের পাশে তিনি নীরবে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন পরম মমতায়। শিশুদের মানসিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের লক্ষ্যে শিশু অধিকার ও সংস্কৃতি কেন্দ্র গড়ার পেছনেও রয়েছে তাঁর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা।
এক বর্ণিল জীবনের প্রতিচ্ছবি: জীবনের শত বাধা-বিপত্তি, প্রিয়জনদের হারানোর দীর্ঘ হাহাকার আর কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েও ফরিদ আহমেদ রিপন যেভাবে নিজেকে একজন সফল ভাই, অভিভাবক, অভিনেতা, সাংবাদিক ও সমাজসেবক হিসেবে গড়ে তুলেছেনড় তা সচরাচর দেখা যায় না।
প্রবীণ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের মতে, ফরিদ আহমেদ রিপন হলেন এমন এক বিরল ব্যক্তিত্ব যিনি জীবনের সর্বক্ষেত্রে চরম দায়বদ্ধতার পরিচয় দিয়েছেন। নিজের পথচলা নিয়ে বিনীত হাসিতে তিনি বলেন, ‘জীবনজুড়ে আমি শুধু মানুষ ও সমাজকে ভালোবেসে যেতে চেয়েছি। শত কষ্টেও ভাইদের মানুষ করা ও পরিবার সামলানোর মাঝে যেমন তৃপ্তি ছিল, ঠিক তেমনি অভিনয় ও সাংবাদিকতার মাধ্যমে দেশের সেবা করার আনন্দও অপার। যতদিন বাঁচব, মানুষের ভালোবাসায় ও সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখব।’
শৈশবের সেই ছোট্ট মঞ্চের আলো থেকে শুরু করে আজকের পরিণত সময় পর্যন্ত— ফরিদ আহমেদ রিপনের এই সংগ্রামী ও বৈচিত্র্যময় জীবনকাহিনী আগামী প্রজন্মের কাছে এক অদম্য অনুপ্রেরণা হিসেবে বেঁচে থাকবে।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

