সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ
যার লোকান্তর, মহাকালের সিন্ধুর তরঙ্গে তরঙ্গায়িত
আমির হোসেন
প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১৩:১৩
ছবি: সংগৃহীত
প্রকৃত শিল্পীরা মনুষ্যত্বের সুধা পান করে জীবনে অমরত্ব অর্জন করেন। সুর ও গানের দ্বারা তারা সৃষ্টি করেন ইহ এবং পর জনমের মধ্যে বিনে সূতির মালায় গাঁথা সেতুবন্ধন। এই সেতু বেয়ে তারা বিচরণ করেন মানুষের আত্মা থেকে আত্মায়, হৃদয় থেকে হৃদয়ে। একদিন হয়তো এ নশ্বর দেহ পরিত্যাগ করে তারা আরেক আনন্দলোকে গমন করেন। এ লোকান্তর মহাকালের সিন্ধুর তরঙ্গে তরঙ্গায়িত।
তাদের সুরের বিচরণ যেখানে আত্মা থেকে আত্মায় মৃত্যু তাদের শেষ কথা নয়। শিল্পীর আত্মা অমর, অক্ষয়, অনশ্বর। কোন ভঙ্গুরতা শিল্পীর আত্মাকে কালগ্রস্ত করতে পারে না। হাজার বছরের আলো যুগ যুগ ধরে তাদের আত্মাকে গতিশীল ও জ্যোর্তিময় করে রাখে। তাদের সুর তাদের করে রাখে চিরঞ্জীব। সেই সুরের জগতে চিরঞ্জীব সাধক পুরুষ সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ।
সংগীতময়ী নদী তিতাস। বিশ্ববিশ্রুত সংগীতের এই সাধক পুরুষ সুর সম্রাট আলাউদ্দিন খাঁ-ই বলতেন আমি সংগীতের সুর পেয়েছি তিতাস নদী থেকে। ভারতখ্যাত সুরকার ও কণ্ঠশিল্পী শচীন দেব বর্মণও (এস. ডি. বর্মণ) বলতেন যে, তিনি সুরের সন্ধান পেয়েছেন তিতাস নদী থেকে। এই তিতাস নদীর তীর ঘেঁষে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর থানার অন্তর্গত শিবপুর গ্রাম। এই শিবপুরেই রয়েছে বিশ্ববিশ্রুত সংগীত পরিবার। এই পরিবারে সংগীতের ধারা শুরু হয় সবদর হোসেন খাঁ থেকে। সবদর হোসেন খাঁর ছিল পাঁচ পুত্র। ছমির উদ্দিন খাঁ, আফতাব উদ্দিন খাঁ, আলাউদ্দিন খাঁ, নায়েব আলী খাঁ ও আয়েত আলী খাঁ।
এই খাঁ পরিবারের উজ্জ্বল নক্ষত্র, সুরের জগতে চিরঞ্জীব সাধক পুরুষ সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ ১৮৬২ সালের ৮ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন। জানা যায় সুদূর অতীতে আরব ভূমি থেকে যে ক’জন পীর-দরবেশ-আউলিয়া এই দেশে ইসলামের বাণী প্রচার করতে আসেন, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর পূর্ব পুরুষ ছিলেন তাদের অন্যতম। আলাউদ্দিন খাঁর পিতা সবদর হোসেন খাঁ ওরফে সাধু খাঁও ছিলেন সংগীতানুরাগী মানুষ। তার কাছেই শৈশবে ওস্তাদজী সেতার বাজানো শেখেন। খুব অল্প বয়সেই তিনি যাত্রার সংগীতের প্রতি আকৃষ্ট হন। জারি, সারি, ভাটিয়ালি প্রভৃতি সংগীতে ও বাঙলার কীর্তন, পীরের পাঁচালি জাতীয় ধর্ম সংগীত ইত্যাদির সাথে তার পরিচয় ঘটে পিতার হাত ধরেই। সাধু খাঁ ছিলেন অত্যন্ত সরল ও অনাড়ম্বর প্রকৃতির লোক। উদারতায় ভরা ছিল তার অন্তর। তার উল্লিখিত পাঁচ পুত্র ছাড়াও ছিল দুই কন্যা।
ওস্তাদজী ছাড়াও তার আরও দুই ভাই ফকির আফতাব উদ্দিন খাঁ ও ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ ছিলেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত সংগীত শিল্পী ও সংগীতজ্ঞ। একদিকে পিতা সাধু খাঁর সেতারে বিশেষ পারদর্শিতা অপরদিকে তবলায় পুত্র আফতাব উদ্দিন খাঁর নৈপুণ্য এ দুয়ের সমন্বয়ে সুরের যে তরঙ্গ সৃষ্টি হতো তাতে পিতা-পুত্রে তন্ময় হয়ে দুলতে থাকতেন। অন্যদিকে সুরলোকের বর পুত্র শিশু আলম (আলাউদ্দিন খাঁর ডাক নাম) সুরের তালে দুলতে থাকত। সাত-আট বছর বয়সে আলাউদ্দিনকে ভর্তি করা হয় নিজ গ্রামের জমিদার বাড়ির পাঠশালায়। কিন্তু পাঠশালার লেখাপড়ায় তার মন মোটেও বসত না। পারিবারিক পরিবেশের কারণেই সংগীত জগৎ কেড়ে নিয়েছিল শিশু আলমের মনপ্রাণ। পিতা-মাতার ভয়ে তিনি পাঠশালায় যেতেন বটে। কিন্তু পাঠশালার চার দেয়াল তার কাছে অসহ্য মনে হতো। তাই তিনি পাঠে অন্যমনস্ক ও উদাসীন থাকতেন। শ্লেটের উপর আঁকতেন ইকাড়ি-বিকাড়ি কাকের ঠ্যাং, বকের ঠ্যাং। আর এজন্য কপালে জুটত শিক্ষকের শাসন। ফলে ধরাবাঁধা এ পড়াশোনার প্রতি তিনি হয়ে ওঠেন বীতশ্রদ্ধ। তাই তিনি গণ্ডিবদ্ধ এই ক্লাস ফাঁকি দিয়ে অনতিদূরে শিবমন্দিরে গিয়ে সেতার বাজানো শুনতেন। টের পেয়ে তাঁর মা তাকে শাস্তি স্বরূপ ঘরের একটি খুঁটির সঙ্গে সারা দিন বেঁধে রাখতেন এবং খাওয়া-দাওয়া পর্যন্ত বন্ধ করে দিলেন।
প্রথমটায় খুব কান্নাকাটি করলেন। কিন্তু মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলেন যে সংগীত হবে তার একমাত্র সাধনার জগৎ। তাই তিনি কোনো এক গভীর রাতে সুযোগ মতো বাড়ি ছেড়ে পালালেন। অনেক চড়াই উতরাই পেরিয়ে গিয়ে হাজির হলেন ঐশ্বর্যমণ্ডিত শহর কলকতায়। জনৈক বিশ্বেশ্বর বাবুর সহযোগিতায় শিষ্যত্ববরণ করলেন ওস্তাদ নুলো বাবুর। নুলো বাবু ছিলেন অত্যন্ত গোঁড়া হিন্দু। তিনি মুসলমানের ছায়া পর্যন্ত মাড়াতেন না। বিধায় বিশ্বেশ্বর বাবুর পরামর্শে বালক আলাউদ্দিন ‘মনোমোহন দেব উত্তরাঢ়’ নাম ধারণ করেছিলেন। আলাউদ্দিন নিখোঁজ হলো সাড়ে সাত বছর কেটে গেল। পুত্র শোকে মাতা-পিতা খুবই কাতর হয়ে পড়েছেন। পিতা-মাতার অসহনীয় দুঃখ-কষ্ট এবং নিখোঁজ ভ্রাতার প্রতি ভ্রাতৃ স্নেহ ফকির আফতাবউদ্দিনকে বিচলিত করে তুলেছিল। তিনি অনেক খোঁজাখুঁজি করে বের করলেন কলকাতার নুলোবাবুর বাড়ি। সদর দরজায় কড়া নাড়তেই তা খুলে দিল আলাউদ্দিন।
ফকির আফতাবউদ্দিন কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে রইলেন নির্বাক ও হতভম্ব হয়ে। তারপর বিকট চিৎকার দিয়ে বলে উঠলেন আলম প্রাণের ভাইটি আমার। আলাউদ্দিনও বড় ভাইয়ের পা জড়িয়ে ধরলেন। দুজনই শিশুর মতো কাঁদতে শুরু করলেন। দুই ভাইয়ের এ মিলন দৃশ্যে উপস্থিত সবার চোখ অশ্রুসিক্ত হলো। ইতোমধ্যে আলাউদ্দিন খাঁ মনোমোহন দেব উত্তরাঢ় নামে সংগীত জগতে তার স্থান দখল করে নিয়েছিল। উক্ত ঘটনার পর তার আর ছদ্মনাম ব্যবহারের প্রয়োজন হয়নি। সংকল্পে দৃঢ়, চেতনায় দীপ্ত থাকলে কত অসাধ্য যে সাধন করা যায় এবং একদিন সাফল্যের চরম শিখরে আরোহণ করা সম্ভব হয়। অজপাড়া-গাঁ শিবপুরের ঘর পালানো আলম তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ অসংখ্য রাগ সৃষ্টি করে গেছেন। অর্জন করেছেন বিশ্ব জোড়া খ্যাতি। পেয়েছেন বিরল সম্মান ও স্বীকৃতি।
তিনি ভারতের রাষ্ট্রীয় খেতাব পদ্মভূষণ ও পদ্মবিভূষণ, বিশ্ব ভারতীয় দেশী কোত্তম, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রদত্ত সম্মান সূচক ডক্টরেট ডিগ্রি, দিল্লি একাডেমির সংগীত নাট পুরস্কার ও ফেলোশিপসহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মান। তার উপদেশে কয়েকটি নতুন বাদ্যযন্ত্র উদ্ভাবিত হয়। তার মধ্যে চন্দ্রসারং ও মন্দ্রনাদের নাম উল্লেখ্যযোগ্য। সরোদ বাদ্যযন্ত্রের আধুনিক রূপ তারই অবদান। তিনি অনেক রাগ-রাগিণী সৃষ্টি করেন। হেমন্ত, দুর্গেশ্বরী, মেঘ-বাহার, প্রভাতকেলী, হেমবেহাগ, মদন মঞ্চুরী (মদিনা মঞ্জরী) ইত্যাদি তার সৃষ্ট রাগ-রাগিনীর মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য। তার অসংখ্য শিষ্যের মধ্যে উল্লেখ্য তার পুত্র আলী আকবর খাঁ, কন্যা রওশন আরা বেগম (অন্নপূর্ণা), জামাতা রবিশংকর ও ভ্রাতুষ্পুত্র বাহাদুর খান। তা ছাড়া বংশীবাদক পাল্লালাল ঘোষ, সরোদ বাদক তিমির বরণ ও তার পুত্র ইন্দ্রনীল, সরোদে শ্যাম গাঙ্গুলী ও শরণারাণী, সেতারে খাদেম হোসেন খান, নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়, তবলা ও এসরাজে ফুলঝুরি খান প্রমুখ তার শিক্ষণ প্রতিভার উজ্জ্বল নিদর্শন। তিনি আলাউদ্দিন ঘরানা সংগীতের স্রষ্টা। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ ১৯৭২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর পরলোকগমন করেন।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

