Logo

শিল্প-সংস্কৃতি

ইসমত চুগতাইয়ের রচনাশৈলী ও সংবেদনশীলতা

Icon

আহমেদ তেপান্তর

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১৫:২৬

অ
ইসমত চুগতাইয়ের রচনাশৈলী ও সংবেদনশীলতা

ছবি: সংগৃহীত

ইসমত চুগতাই প্রথমে ইসাবেলা থোবার্ন কলেজে এবং পরবর্তীতে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেনস কলেজে পড়াশোনা করেন। স্নাতক পড়ার সময়েই তিনি ‘প্রগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন’ এ যোগ দেন; এই সংগঠনের সদস্যদের মধ্যে মুনশি প্রেমচাঁদ, ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ, কৃষাণ চন্দ, সাদাত হাসান মান্টোর মতো ব্যক্তিত্বরা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এই আন্দোলনটি প্রথাগত সাহিত্যধারা ও পশ্চাৎপদ সমাজের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার পথ প্রশস্ত করে এবং উর্দু সাহিত্যে নতুনত্ব ও সৃজনশীলতার প্রসার ঘটায়— যা চুগতাইকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।

এ ছাড়া আন্তন চেখভ, লিও তলস্তয়, গি দ্য মোপাসাঁ এবং জর্জ বার্নার্ড শ-এর মতো বিশ্ববিখ্যাত পশ্চিমা সাহিত্যিকদের রচনাও তাঁর মনন ও লিখনশৈলীতে গভীর ছাপ ফেলেছিল। তার লেখার মনস্তাত্ত্বিক দিক নিয়ে ২০১৯ সালে পাকিস্তানভিত্তিক ফ্রাইডে টাইমস পত্রিকায় ‘প্রগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন’-এর সাবেক সভাপতি গ্রন্থ সমালোচক ও সমাজবিজ্ঞানী রাজা নাঈম একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন; যা বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো- 

ইসমত চুঘতাইয়ের গদ্যে স্বতঃস্ফূর্ততা ও তীক্ষèতার পাশাপাশি এক সৃজনশীল রত্নও নিহিত ছিল। তিনি হয়তো প্রথাগত দিক থেকে সবচেয়ে মার্জিত বা অলংকৃত গদ্যশৈলীর অধিকারী ছিলেন না, কিন্তু তার নিজস্ব এক স্বতন্ত্র শৈলী ছিল। বস্তুত, উপন্যাস ও ছোটগল্পের জন্য তার এই শৈলী ছিল অত্যন্ত উপযোগী; এতে এমন এক সৌন্দর্য ও আকর্ষণ ছিল যার সঙ্গে অন্য কোনো ছোটগল্পকারের রচনার তুলনা চলে না। তার ছোটগল্পগুলো উর্দু সাহিত্যে অসংখ্য নতুন শব্দ, রূপক, উপমা ও প্রতীকের সংযোজন ঘটিয়েছে। এসব শব্দ হয়তো বহুবার শোনা ছিল, কিন্তু উর্দু ছোটগল্পে (আফসানায়) প্রথমবারের মতো সেগুলোর ব্যবহার দেখে পাঠক এর অন্তরালে লুকিয়ে থাকা সৃজনশীল শক্তির পরিচয় পেয়েছেন। চুগতাইয়ের এই কৃতিত্বই তাকে স্বতন্ত্র এক উচ্চতায় আসীন করেছিল। পাত্রাস বোখারির ভাষায়, ‘ইসমত উর্দু ভাষাভঙ্গিতে এক নতুন যৌবন দান করেছেন।’

চুগতাইয়ের ছোট উপন্যাস ‘জিদ্দি’ (Ziddi) এমন এক তরুণের কাহিনি যে শ্রেণি-বিভক্ত সমাজে ভালোবাসার স্বাধীনতা না পেয়ে একরোখা বা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। সে নিম্নবিত্ত পরিবারের এক তরুণীকে ভালোবাসে— যা আমাদের সামাজিক ব্যবস্থায় তথাকথিত ‘নৈতিক’ মানদণ্ডে গ্রহণযোগ্য ছিল না। এই সামাজিক সংকটের কারণেই উপন্যাসের নায়ক ‘পূরণ’-এর মনে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে এবং কাহিনিটি এক মর্মান্তিক মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হয়। উপন্যাসের শেষে দেখা যায়, নায়িকা ‘আশা’ প্রেমিকের মৃতদেহের ওপর নিজের শরীরে তেল ঢেলে আগুন ধরিয়ে আত্মাহুতি দেয়। এই উপন্যাসটি ছিল রোমান্টিক আবেগের আতিশয্যে রচিত; সম্ভবত একারণেই একসময় তরুণ প্রজন্মের কাছে এটি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। কেউ কেউ মনে করতেন এটি ‘দেবদাস’ চলচ্চিত্র দ্বারা প্রভাবিত, তবে এক গবেষকের মতে, এই উপন্যাসটি আসলে একটি তুর্কি উপন্যাসের অনুপ্রেরণায় রচিত হয়েছিল।

ইসমত চুগতাইয়ের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হলো তার উপন্যাস ‘তেরহি লেকির’ (Terhi Lakeer)। ৫০০ পৃষ্ঠাব্যাপী এই উপন্যাসে কেবল লেখকের নিজস্ব পর্যবেক্ষণ ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাই প্রতিফলিত হয়নি, বরং এর প্রাণবন্ত চরিত্র ‘শাম্মান’-এর ব্যক্তিত্বের মধ্যেও অনেকাংশে লেখকের নিজস্ব সত্তার প্রতিফলন ঘটেছে। উপন্যাসের প্রচ্ছদশিল্পী বিষয়বস্তুর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি সাপের ছবি এঁকেছেন, যা যৌনতার প্রতীক। যৌনতা আমাদের সমাজের সবচেয়ে জটিল বিষয় বা সবচেয়ে আঁকাবাঁকা রেখা। দক্ষিণ এশীয় সমাজে যৌন সচেতনতা ঘিরে থাকা নৈতিক বিধিনিষেধের কারণে একজন বুদ্ধিমতী ও সক্ষম মধ্যবিত্ত তরুণী কীভাবে মানসিক দোলাচলের শিকার হয় এবং জীবনের নানা ক্ষেত্রে তার কী প্রভাব পড়ে— চুগতাই এসব বিষয় এখানে অত্যন্ত সফলভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। বস্তুত এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস; জীবনের ছোটখাটো সমস্যা ও খুঁটিনাটি বিষয়ের মধ্য দিয়ে লেখিকা যেভাবে এই মানসিক জটিলতার জটগুলো উন্মোচন করেছেন, তা এক কথায় এক সাহিত্যিক বিস্ময়। চুগতাইয়ের ছোটগল্পগুলোতে যেসব বাস্তবতা ধীরে ধীরে কিন্তু অসম্পূর্ণভাবে উঠে এসেছিল, এই উপন্যাসে তা পূর্ণাঙ্গ রূপ পেয়েছে; সম্ভবত ‘তেরহি লেকির’ (বাঁকা রেখা) ছিল সেই আখ্যান, যেখানে তিনি তাঁর যৌবনের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণগুলোকে একে একে কাজে লাগিয়েছিলেন— যেন সেই ভাণ্ডারে আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। সমাজের নানা প্রথা, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর এই উপন্যাসে যে ব্যঙ্গাত্মক সংলাপ রয়েছে, তাকেই এর শ্রেষ্ঠ সম্পদ বলা যেতে পারে। উপন্যাসটির উৎসর্গপত্রটিও ব্যঙ্গাত্মক— ‘সেই সব অনাথ শিশুর উদ্দেশ্যে, যাদের বাবা-মা এখনও জীবনের কারাগারে বন্দী।’

পণ্ডিত কিষাণ প্রসাদ কৌল এই উপন্যাসটি সম্পর্কে লিখেছিলেন- ‘‘প্রেমচাঁদের ‘গোদান’-কে যেমন তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি বা ‘মাস্টারপিস’ বলা যায়, ঠিক তেমনই ‘তেরহি লেকির’ (Terhi Lakeer) হলো ইসমত চুগতাইয়ের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। প্রেমচাঁদ যেমন ‘গোদান’-এ আমাদের গ্রামীণ জীবনের পূর্ণাঙ্গ চিত্র ও তার ব্যাখ্যা তুলে ধরে উর্দু সাহিত্যে এক বিশাল সংযোজন ঘটিয়েছিলেন, ঠিক তেমনই ‘তেরহি লেকির’-এ ইসমত আমাদের আধুনিক তরুণীর জীবনের পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র এঁকে উর্দু সাহিত্যে এক নতুন ধারার সৃষ্টি করেছেন—যার জন্য আমরা তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ [...]”

চুগতাই তাঁর শুরুর দিকের সময়কালে দুটি নাটক লিখেছিলেন: ‘সাঁপ’ (Snake) এবং ‘ফাসাদি’ (Brawler); নাটক দুটি মঞ্চায়নের জন্য রচিত না হলেও পড়ার জন্য ছিল উপভোগ্য। এগুলোতে ছিল ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ ও ঘরোয়া কথোপকথনের মিশেল। দেশভাগের দাঙ্গা নিয়ে লেখা তাঁর নাটক ‘ধানি বাঁকেন’ (Green Bangles) অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছিল। তাঁর নাটকগুলোর একটি সংকলন ‘শয়তান’ (Satan) নামে প্রকাশিত হয়েছিল।

চরিত্রচিত্রণ বা ‘ক্যারেক্টার-স্কেচ’ বিষয়ক প্রবন্ধগুলোর মধ্যে ইসমত চুগতাইয়ের ‘দোজখি’ (Hell-Bound) ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ; এটি তিনি তাঁর ভাই আজিম বেগ চুগতাইকে নিয়ে লিখেছিলেন। এই প্রবন্ধটি ছিল নিরপেক্ষ বাস্তবতা ও ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণমূলক রচনার এক বিরল দৃষ্টান্ত। হাসান আসকারির মতে, প্রগতিশীল সাহিত্যের সমগ্র ভাণ্ডারে ‘দোজখি’ এক কালজয়ী সৃষ্টির মর্যাদা লাভ করেছিল। বোম্বে থেকে শুরু হওয়া ‘আর্কিটেক্টস অফ নিউ লিটারেচার’ (Architects of Nwe Literature) শীর্ষক চরিত্রচিত্রণ সিরিজের অংশ হিসেবে চুগতাই ‘মাজাজ’-কে নিয়েও একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন, যা পরে একটি পুস্তিকা আকারে প্রকাশিত হয়।

এই নিবন্ধের আগের পর্বের শুরুতে ‘আজোকা’ (Ajoka)-র যে নাটকটির কথা উল্লেখ করেছিলাম, তাতে নাম-ভূমিকায় থাকা দুই তরুণীর জীবন তুলে ধরা হয়েছিল— যাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন নাটকটিতে কাল্পনিক রূপে উপস্থাপিত আসমা জাহাঙ্গীর। এই দুই তরুণী হলেন: সায়রা, যে নির্যাতনকারী স্বামীর কাছ থেকে বিবাহবিচ্ছেদ চাইতে গিয়ে পরিবারের ভাড়াটে আততায়ীর গুলিতে প্রাণ হারিয়েছিল; এবং মাইরা, যে আইনি লড়াইয়ে জয়ী হলেও শেষ পর্যন্ত নিজের দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল। এটি পাঠকদের মনে এই প্রশ্নটিই জাগিয়ে তুলেছিল যে, আমাদের সাইরা ও মাইরাদের সামনে কি কেবল এই পথগুলোই খোলা ছিল, নাকি কোনো তৃতীয় পথও ছিল? আমাদের সময়ের আসমা জাহাঙ্গীরের মতোই ইসমত চুগতাই কোনো আততায়ী (বা ফতোয়া)-র শিকার হননি, আবার তাঁকে নির্বাসনেও যেতে হয়নি। এর পরিবর্তে, তিনি সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই চালিয়ে গেছেন এবং লেখালেখি করেছেন; নারী অধিকারের তথাকথিত পুরুষ প্রবক্তাদের ভণ্ডামি ও নারীদের নিয়ে তাদের তৈরি করা ভ্রান্ত ধারণাগুলোকে তিনি জোরালোভাবে উন্মোচন করেছেন। এরপর তিনি আমাদের সময়ের ‘সাইরা’ ও ‘মায়রা’দের জন্য এক নতুন ভাষা বা দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার প্রয়াস নিয়েছেন— যা তাঁর অসংখ্য লেখার মধ্যে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে তাঁর স্বল্প-পরিচিত প্রবন্ধ ‘অওরত: আধি অওরত, আধা খোয়াব’ (নারী: অর্ধেক নারী, অর্ধেক স্বপ্ন)-এ; এটিই যেন তাঁর এক চিরস্থায়ী বার্তা— 

‘‘উপযুক্ত সময়ে নারীত্ব প্রকাশ করা নারীর জন্য শোভন। কিন্তু কলেজ, অফিস কিংবা বিভিন্ন দপ্তরে গিয়ে ‘নারীসুলভ ভাবমূর্তি’র ঝুড়ি বয়ে বেড়ানোর মানে কী? আমরা যখন জানি যে আজ না হোক কাল নারীদের পুরুষদের সঙ্গেই কাজ করতে হবে, তখন বর্তমানের ধ্যান-ধারণাগুলো ভুলে গিয়ে আমাদের নতুন সব নীতি বা সূত্র তৈরি করতে হবে: কলেজ বা স্কুলে আপনি মা-ও নন, আবার মেয়েও নন; প্রেমিকাও নন— আপনি কেবল একজন শিক্ষার্থী; আর অন্যরা হলেন অধ্যাপক ও শিক্ষার্থী।

অফিসে আপনি প্রেমে বিশ্বস্ত বা অবিশ্বস্ত—এর কোনোটিই নন; কেবল নিজের কাজটুকু ঠিকঠাক করুন এবং আপনার আভিজাত্য বা বিশেষ ভাবভঙ্গি ভুলে যান।

আপনার চারপাশে যারা আছেন, তারা সবাই মানুষ; পুরুষ বা নারী হিসেবে নয়, তারা কেউ কর্মকর্তা বা কেউ করণিক (ক্লার্ক); এখানে আছে টেবিল, চেয়ার আর পিয়ন। আপনি দুর্বলও নন, আবার সবলও নন; আপনি ‘কোমল লিঙ্গ’ বা ‘কঠিন লিঙ্গ’—এর কোনোটিই নন। পেশা পরিবর্তন না করা পর্যন্ত, যে কাজের জন্য আপনি পারিশ্রমিক পাচ্ছেন, সেটাই আপনার কাজ। প্রকৃতি আপনাকে এই কাজের জন্যই সৃষ্টি করেছে; কোনো স্বামী বা স্ত্রীকে প্রলুব্ধ করার জন্য নয়, বরং কেবল কাজের জন্যই আপনি এখানে এসেছেন। নিজের শারীরিক বা মানসিক শক্তি কিংবা দুর্বলতা দিয়ে কারও সুযোগ নেবেন না, আবার কারও ক্ষতিও করবেন না।

আপনার গন্তব্য কেবল বিয়ে নয়; কারণ বিয়ে মানেই গন্তব্যে পৌঁছানো নয়, বরং বিয়ের পরবর্তী জীবনটাই হলো দীর্ঘ এক পথচলা। অথচ গুরুদেব (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) বলতেন, ‘ও নারী, তুমি অর্ধেক নারী, অর্ধেক স্বপ্ন!’

কেউ যদি তাঁর স্ত্রীর মতামত জানতে চাইত, তবে হয়তো তিনি বলতেন যে গুরুদেব নিজেও ছিলেন আস্ত এক স্বপ্ন এবং সেই স্বপ্নেরই সবচেয়ে সুন্দর এক ব্যাখ্যা! [...]”

বাংলাদেশের খবর/আরইউ

Logo
সম্পাদক ও প্রকাশক মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন