যেভাবে তৈরি হয় প্রথম শহীদ মিনার
মাহদিয়া তাবাসসুম লিমা
প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১৫:১৬
ছবি : সংগৃহীত
১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি, বেলা ১১টা ৩০ মিনিট। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাজপথে নামে ছাত্র-জনতা। ভাষার দাবিতে খণ্ড খণ্ড মিছিল বের হয়। পুলিশ লাঠিচার্জ করে, কিন্তু আন্দোলন আরও বেগবান হয়ে ওঠে। সাধারণ জনগণও এতে যোগ দেয়। সবার মুখে একটিই দাবি ছিল—রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। এদিন পুলিশের গুলিতে সালাম, রফিক, বরকত, জব্বারসহ অনেকে শহীদ হন।
আর এই শহীদদের স্মৃতি রক্ষার জন্য তখন শহীদ মিনার নির্মাণের দাবি ওঠে। এরপর প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে এর নির্মাণ নিয়ে বিভিন্ন তথ্য ও মতভেদ লক্ষ্য করা যায়।
প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণ ও পরিকল্পনা
এম. আর. আখতার মুকুলের ‘একুশের দলিল’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারির বেলা ৩টা ১০ মিনিটে আন্দোলনকারীদের ওপর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে গুলি চালানো হয়। ঠিক সেই জায়গাতেই প্রথম শহীদ মিনার নির্মিত হয়। এর সার্বিক তত্ত্বাবধান করেন মেডিকেল কলেজ ইউনিয়নের তৎকালীন ভিপি ডা. গোলাম মওলা। তাকে সহযোগিতা করেন ডা. মঞ্জুর, ডা. আলীম চৌধুরী, ডা. এস. ডি. আহমেদ ও ডা. বদরুল আলম প্রমুখ।
২২শে ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত থেকে শুরু করে ২৪শে ফেব্রুয়ারি ভোর রাত পর্যন্ত অক্লান্ত পরিশ্রমের পর শহীদ মিনারের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। প্রথম শহীদ মিনারটি চারপাশে দড়ি দিয়ে ঘেরা হয়েছিল, নিচের অংশ লাল শালু কাপড়ে মোড়ানো হয়। এছাড়া উপরে দুটি পোস্টার লাগানো ছিল—একটিতে লেখা ছিল ‘শহীদ স্মৃতি অমর হোক’ এবং অন্যটিতে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’।
মেডিকেলছাত্ররা নির্মাণাধীন নার্সেস কোয়ার্টারের ইট ও ঢাকার হোসেনী দালান এলাকার মোহাম্মদ পিয়রু সরদারের গুদাম থেকে শহীদ মিনারের সিমেন্ট, বালু ও সুড়কি সংগ্রহ করেন। ১০ ফুট × ৬ ফুট মাপের এই শহীদ মিনারের ডিজাইন করেন মেডিকেল কলেজের তৎকালীন মেধাবী ছাত্র বদরুল আলম।
প্রথম শহীদ মিনারের উদ্বোধন
এই শহীদ মিনার মোট দুইবার উদ্বোধন করা হয়। প্রথমবার ২৪শে ফেব্রুয়ারি উদ্বোধন করেন শহীদ শফিউর রহমানের পিতা মৌলভী মাহবুবুর রহমান। দ্বিতীয়বার ২৬শে ফেব্রুয়ারি উদ্বোধন করেন দৈনিক আজাদ সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দীন।
ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক বলেন, ২২ ফেব্রুয়ারি নবাবপুরে মিছিল চলাকালে ‘শহীদ স্মৃতি অমর হোক’ স্লোগান ওঠে। সেখান থেকেই শহীদ মিনার নির্মাণের চিন্তা মাথায় আসে। মাত্র একদিনের প্রস্তুতিতে শহীদ মিনার তৈরি করা হয়। নার্স, ওয়ার্ডবয় ও মেডিকেল ছাত্ররা শহীদ মিনারের নির্মাণকাজে অংশ নেন।
তৎকালীন ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ডা.এসডি আহমদ ১৯৮৬ সালে ‘কীর্তিনাশা’ পত্রিকায় স্মৃতিচারণ করে বলেন, ২৩শে ফেব্রুয়ারি আমরা সিদ্ধান্ত নিই যে, যেখানে গুলি চালানো হয়েছিল, সেখানে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করব। বদরুল আলম প্রথমে একটি নকশা আঁকেন, যা কিছু পরিবর্তনের পর অনুমোদিত হয়।
শহীদ মিনার ধ্বংস ও পুনর্নির্মাণ
২৬শে ফেব্রুয়ারি (১৯৫২) পাকিস্তান সরকার শহীদ মিনার ভেঙে ফেলে। দুটি ট্রাকে করে শহীদ মিনারের সব ইট তুলে নিয়ে যায়। সাপ্তাহিক রোববারের ১৯৮১ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারির প্রতিবেদনে রফিকুল ইসলাম উল্লেখ করেন, শহীদ মিনারের নকশা ছিল বদরুল আলম ও সাঈদ হায়দারের। মেডিকেল কলেজ ছাত্রাবাসের ইট দিয়ে এটি নির্মিত হয়। ২৩শে ফেব্রুয়ারি রাতেই ছাত্র-জনতা ১০ ফুট উঁচু ও ৬ ফুট চওড়া শহীদ মিনারটি নির্মাণ করেন। ২৪শে ফেব্রুয়ারি সকাল থেকে ২৬শে ফেব্রুয়ারি বিকাল পর্যন্ত এটি ছিল বাঙালির তীর্থক্ষেত্র। জনগণ শ্রদ্ধা জানাতে আসত, কেউ কেউ গলার গহনা দান করত।
কিন্তু ২৬শে ফেব্রুয়ারি পুলিশ ও সামরিকবাহিনী শহীদ মিনারটি ভেঙে দেয়। অবশিষ্ট থাকে শুধু স্মৃতির মিনার আর ১২ নম্বর ব্লকের বেড়ায় সাঁটানো পোস্টার, যাতে ছিল রবীন্দ্রনাথের সাহসী উচ্চারণ : ‘বীরের এ রক্তস্রোত/ মাতার এ অশ্রুধারা/এর যত মূল্য সে কি ধরার ধুলায় হবে হারা?’
এটিআর/

