Logo

ক্যাম্পাস

জাকসু নির্বাচনে প্রার্থীদের কাছে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা

Icon

আমানউল্লাহ খান, জাবি

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১৪:৪৯

জাকসু নির্বাচনে প্রার্থীদের কাছে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা

দীর্ঘ ৩৩ বছর পর আসন্ন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) নির্বাচনকে ঘিরে ক্যাম্পাসে বইছে আলোচনার ঝড়। ফ্যাকাল্টি থেকে আবাসিক হল, ক্লাসরুম থেকে হলের করিডোর— সবখানেই নির্বাচনের উত্তাপ। শুধু প্রার্থীর প্রচারণা নয়, সমানতালে চলছে ভোটারদের চুলচেরা বিশ্লেষণ। এ নির্বাচনকে ঘিরে শিক্ষার্থীরা চাইছেন নতুন ধরনের নেতৃত্ব— যারা দলের প্রতিনিধি নয়, বরং শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি হয়ে কাজ করবেন।

ভোটারদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, নেতৃত্ব নির্বাচনের মূল গুণাবলি হওয়া উচিত সততা, পরমতসহিষ্ণুতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, যোগাযোগ দক্ষতা ও দূরদর্শিতা সহ বিভিন্ন দিক। শিক্ষার্থীরা বলছেন, এই নেতৃত্বই ভবিষ্যতে ক্যাম্পাসের সংস্কৃতি বদলে দেবে। প্রার্থীরা নির্বাচিত হওয়ার পর আর ভিন্ন শ্রেণি তৈরি করবেন না, বরং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখবেন।

আগামী ১০তম জাকসু নির্বাচনে শিক্ষার্থীরা বিশেষভাবে গুরুত্ব দিচ্ছেন জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে প্রার্থীদের ভূমিকা। তাদের মতে, এটি ছিল শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষার সংগ্রাম, যা প্রার্থীর নৈতিক অবস্থান ও প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব প্রমাণ করে। ইউআরপি বিভাগের শিক্ষার্থী আব্দুল হাকিম বলেন, ‘আমরা নিজেদের নেতা নির্বাচনে প্রার্থীর গণ-অভ্যুত্থানে ভূমিকা দেখব। কারণ এ সংগ্রাম ছিল শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে, এখানেই তার অবস্থান পরিষ্কার হয়ে যায়।’

অনেকে প্রার্থীর লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতির দিকও বিবেচনা করছেন। তারা ছাত্ররাজনীতি চান, তবে সেটি যেন লেজুড়বৃত্তির মাধ্যমে বিগত সময়ের মতো প্রভাব ফেলতে না পারে। গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী লাল লমের মতে, ‘লেজুড়বৃত্তিক রাজনৈতিক প্রভাব থেকে শিক্ষার্থীদের মুক্ত রাখার প্রতিশ্রুতিই হবে নেতৃত্বের অন্যতম মানদণ্ড।’

এছাড়া অনেক ভোটার মনে করছেন, নেতৃত্ব যাচাইয়ের ক্ষেত্রে প্রার্থীর সততা ও অতীত কর্মকাণ্ডই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মানদণ্ড। শুধু নির্বাচনের সময় শিক্ষার্থীবান্ধব কথাবার্তা নয়, বরং বাস্তবে কী করেছেন, সেটাই হবে বিশ্বাসযোগ্যতার প্রমাণ। ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের শিক্ষার্থী মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, ‘প্রার্থীর অতীত কর্মকাণ্ড আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আগে কী করেছে সেটাই বলে দেবে, সে আসলেই শিক্ষার্থীদের পক্ষে কাজ করবে কিনা।’

অন্যদিকে, অনেকে প্রার্থীদের কাছ থেকে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত সমস্যা সমাধানের প্রত্যাশা করছেন। টর্চারসেল– নামধারী ‘গণরুম–গেস্টরুম’ সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি যেন আর না ঘটে, সেটি শর্ত হিসেবে দেখছেন অনেকে। আইআইটির শিক্ষার্থী মাহবুবুর রহমান মারুফ বলেন, ‘নির্বাচিত প্রতিনিধিরা শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর হবেন— এটাই প্রত্যাশা। যৌক্তিক অধিকার আদায়ে দৃঢ় ভূমিকা রাখতে হবে। অতীতে যেসব টর্চার সেল চালু ছিল, সেগুলো যেন আর ফিরে না আসে।’

ভোটারদের প্রত্যাশা এখানেই থেমে নেই। অনেকেই চান প্রার্থীরা নির্বাচনের পরেও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বজায় রাখুন। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী ফারিহা জান্নাতি বলেন, ‘প্রার্থীরা এখন সমস্যার কথা জানতে আসছে। প্রশ্ন হলো— জেতার পরও কি এভাবে শিক্ষার্থীদের কাছে আসবে? স্বজনপ্রীতি বা অপশক্তির বিরুদ্ধে কতটা সচেষ্ট হবে? এসবের জবাব না পেলে কাউকে ভোট দেওয়া কঠিন।’ 

প্রার্থীদের কাছ থেকে শিক্ষার্থীরা চান একাডেমিক পরিবেশ, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার, আবাসন ও ক্যাম্পাসকে মাদকমুক্ত রাখার কার্যকর উদ্যোগ। নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নাঈম ইসলাম বলেন, ‘প্রার্থীরা যেন প্রথমেই শিক্ষা ও গবেষণা নিশ্চিত করে। পাশাপাশি মাদকমুক্ত ক্যাম্পাস গড়ে তোলে।’ 

অন্যান্য দিকের পাশাপাশি ভোটাররা শিক্ষার্থীদের এজেন্ডার সঙ্গে প্রার্থীদের এজেন্ডা ও পরমতসহিষ্ণুতার দিকটি বিবেচনা করছেন। ক্ষমতায় বসার পরও যেন নেতারা নিজেদের শিক্ষার্থীদের চেয়ে ঊর্ধ্বে না ভাবেন— এটা নিশ্চিত করতে চান তারা। রফিক জব্বার হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মনিরুজ্জামান মনির বলেন, ‘একজন ভোটার হিসেবে আমি প্রথমেই দেখব প্রার্থীর এজেন্ডা শিক্ষার্থীদের স্বার্থের সঙ্গে মেলে কিনা। যদি পার্থক্য থাকে, তবে তারা আর শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি হয়ে উঠবেন না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পরমতসহিষ্ণুতা। যদি প্রার্থীর এ গুণ না থাকে, তবে অন্য যোগ্যতাও কোনো কাজে আসবে না।’

শিক্ষার্থীদের মধ্যে এমনও আশঙ্কা আছে যে ছাত্রনেতারা নির্বাচিত হওয়ার পর স্বজনপ্রীতি বা আর্থিক লোভে আপসকামী হয়ে পড়তে পারেন। অনেকে বিপদগামী শিক্ষকদের সঙ্গে আপস করে ক্যাম্পাসে স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। এতে শুধু প্রতিনিধিত্বই নয়, ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মনে করেন অনেকে। ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের শিক্ষার্থী তৌফিকুর রহমান তামিম বলেন, ‘আমার কাছে প্রথমেই গুরুত্বপূর্ণ হলো জবাবদিহিতা। শিক্ষকদের স্বৈরাচারী আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কিন্তু এতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় অনেক সময় ছাত্রপ্রতিনিধিদের লোভ। আমার দ্বিতীয় চাওয়া— তারা যেন অর্থের বিনিময়ে বিক্রি হয়ে না যায়। কারণ শিক্ষকরা তাদের স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার পথে যিনি বাধা হয়ে দাঁড়াবেন, তাকে দমন করতে ক্ষমতা বা অর্থ— যা দরকার তাই ব্যবহার করতে দ্বিধা করবেন না।’

আইন ও বিচার বিভাগের শিক্ষার্থী মেহজাবিন হৃদি বলেন, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা ভোট পাওয়ার আগে যেমন উদ্যম দেখান, পরে যেন তা ধরে রাখেন। শিক্ষার্থীদের আস্থা কেবল তখনই টিকে থাকবে, যখন প্রচারণার প্রতিশ্রুতিই দায়িত্ব পালনের বাস্তবতায় প্রতিফলিত হবে। তিনি বলেন, ‘ভোটার হিসেবে প্রার্থীর কাছে আমার প্রত্যাশা খুবই সরল— যেভাবে তারা নির্বাচনের আগে প্রচারণায় মনোযোগী ছিলেন, বিজয়ী হওয়ার পরেও একই গুরুত্ব ও আন্তরিকতায় দায়িত্ব পালন করুন। প্রার্থীরা ভুলে গেলে চলবে না যে ভোটাররাই তাদের নির্বাচিত করেছেন। তাই ভোটারের স্বার্থকেই সর্বাগ্রে দেখতে হবে।’

এবারের জাকসু নির্বাচন তাই শুধু প্রার্থীদের ইশতেহারের লড়াই নয়, বরং ভোটারদের প্রত্যাশারও প্রতিফলন। প্রতিবেদক অন্তত ৩০ জন ভোটারের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাদের প্রত্যাশা মোটামুটি একই— শিক্ষার্থীরা যেভাবে চাওয়া তুলছেন, নির্বাচিত প্রতিনিধিদেরও সেই অনুযায়ী কাজ করতে হবে।

এমএইচএস 

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন