৫৬ বছরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় : বিস্তারের গল্প, গভীরতার খোঁজ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১২ জানুয়ারি ২০২৬, ১৯:৪৮
ঢাকার অদূরে লাল ইটের ভবন, বিস্তীর্ণ জলাশয় আর শীতের অতিথি পাখির কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আজ পেরিয়েছে ৫৫ বছর। ১৯৭০ সালের ২০ আগস্ট যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠানটি সময়ের সঙ্গে দেশের উচ্চশিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ এক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পেলেও, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর উৎসবের আড়ালে সামনে এসেছে কিছু মৌলিক প্রশ্ন। দীর্ঘ এই পথচলায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কি আদৌ একটি গবেষণাভিত্তিক আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণ রূপ নিতে পেরেছে?
১৯৭১ সালের ১২ জানুয়ারি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম আহসান এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাস হলে নাম পরিবর্তন হয়ে হয় ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়’। ২০০১ সাল থেকে দিনটি ‘বিশ্ববিদ্যালয় দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
চার বিভাগ থেকে বৃহৎ ক্যাম্পাস
১৯৭০–৭১ শিক্ষাবর্ষে অর্থনীতি, ভূগোল, গণিত ও পরিসংখ্যান এই চারটি বিভাগে ১৫০ জন শিক্ষার্থী ও ২১ জন শিক্ষক নিয়ে যাত্রা শুরু হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের। বিশিষ্ট রসায়নবিদ অধ্যাপক ড. মফিজ উদ্দিন আহমদ ছিলেন প্রথম উপাচার্য। পাঁচ দশকের বেশি সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি বিস্তৃত হয়ে দাঁড়িয়েছে ছয়টি অনুষদের অধীনে ৩৪টি বিভাগ ও চারটি ইনস্টিটিউটে। বর্তমানে প্রায় ৭০০ শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে পড়াশোনা করছেন সাড়ে ১৪ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী।
দেশের সবচেয়ে উঁচু শহীদ মিনার, মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য ‘সংশপ্তক’, ভাষা আন্দোলনের স্মরণে নির্মিত ‘অমর একুশ’, নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের নামে মুক্তমঞ্চ এবং সর্বশেষ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম স্মৃতি স্তম্ভ ‘অদম্য ২৪’ — এসব স্থাপনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক পরিচিতিকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।
প্রকৃতি ও গবেষণা : সম্ভাবনা থাকলেও কাঠামোর ঘাটতি
অতিথি পাখির অভয়ারণ্য হিসেবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিতি দেশের গণ্ডি পেরিয়েছে। প্রাণিবিদ্যা বিভাগের উদ্যোগে গড়ে ওঠা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্র ও প্রজাপতি পার্ক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে প্রশংসিত হয়েছে। তবে কোভিড পরবর্তী সময়ে পরিযায়ী পাখির আগমন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
গবেষণার ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের শীর্ষ দুই শতাংশ গবেষকের তালিকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক স্থান পেয়েছেন। যদিও শিক্ষক ও গবেষকদের মতে, এই অর্জনগুলো মূলত ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার ফল। প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা সহায়তা, পর্যাপ্ত বাজেট ও কেন্দ্রীয় গবেষণা কাঠামোর অভাব এখনো বড় বাধা হয়ে আছে।
আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়, তবু সংশয়ের জায়গা
পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত হলেও জাহাঙ্গীরনগরে আবাসন সংকট দীর্ঘদিনের বাস্তবতা ছিল। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ২১টি হল রয়েছে। সাম্প্রতিক উন্নয়ন প্রকল্পে নতুন হল যুক্ত হওয়ায় বর্তমানে আবাসন সংকট তুলনামূলক কম। তবে শিক্ষার্থীদের একাংশ বলছেন, অতীতে দলীয় রাজনৈতিক ব্লক তৈরির কারণে যে সংকট তৈরি হয়েছিল, ভবিষ্যতে তা আবার ফিরে আসবে কি না— সে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
শ্রেণিকক্ষ আছে, ল্যাব নেই
প্রায় ৭০০ একরের বিশাল ক্যাম্পাস হওয়া সত্ত্বেও একাধিক বিভাগ ও ইনস্টিটিউটে শ্রেণিকক্ষ সংকট রয়েছে। অনেক জায়গায় অস্থায়ী ব্যবস্থায় ক্লাস চলছে। আবার কয়েকটি বিভাগে প্রয়োজনীয় ল্যাব সুবিধা নেই। উদাহরণ হিসেবে জার্নালিজম বিভাগের কথা বলেন শিক্ষার্থীরা— যেখানে ব্যবহারিক শিক্ষার গুরুত্ব বেশি, অথচ নেই কোনো আধুনিক মিডিয়া ল্যাব বা স্টুডিও। এতে হাতেকলমে শিক্ষা ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ।
শিক্ষক সংকট ও নিয়োগ প্রশ্ন
অনেক বিভাগেই শিক্ষক সংকট প্রকট বলে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ। তাদের মতে, পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় পাঠদানের মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি শিক্ষক নিয়োগে যোগ্যতার চেয়ে প্রশাসনিক বা প্রভাবশালী পক্ষের সুপারিশ প্রাধান্য পাচ্ছে, এমন অভিযোগও উঠে আসে।
এ ছাড়া আইন অনুযায়ী কোনো বিভাগ থেকে একসঙ্গে সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ শিক্ষক শিক্ষা ছুটিতে থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে কোনো কোনো বিভাগে এর হার আরও বেশি বলে জানা গেছে। কিছু শিক্ষক শিক্ষা ছুটি শেষে দেশে ফিরে না আসায় সংকট স্থায়ী হয়ে উঠছে।
সেকেলে ব্যবস্থা, ডিজিটাল ঘাটতি
লাইব্রেরি ব্যবস্থাপনা, পরীক্ষা পদ্ধতি ও ফল প্রকাশ এখনো সনাতন ধারায় চলছে। প্রশাসনিক সেবার বড় অংশ ডিজিটাল না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের নিয়মিত কাজেও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
দীর্ঘদিন কার্যকর ছাত্র সংসদ না থাকায় গণতান্ত্রিক চর্চা বাধাগ্রস্ত ছিল। সম্প্রতি জাকসু কার্যক্রম শুরু হলেও নিয়মিত ও শক্তিশালী ছাত্র প্রতিনিধি কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়টি এখনো আলোচনায়।
উৎসব ও প্রশাসনের প্রত্যাশা
বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষে আজ (১২ জানুয়ারি) সকালে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শুরু হয়। উপাচার্যের নেতৃত্বে শোভাযাত্রা, স্মৃতিচারণ, রক্তের গ্রুপ নির্ণয়, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, প্রীতি ফুটবল ও হ্যান্ডবল ম্যাচ, পিঠা মেলা দিনব্যাপী নানা আয়োজন করেছে প্রশাসন।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, চলমান অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্প শেষ হলে শ্রেণিকক্ষ, লাইব্রেরি, আবাসন ও অবকাঠামোসংকট অনেকটাই কমবে। একই সঙ্গে শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ উন্নয়নের প্রত্যাশাও জানান তারা।
উৎসবের দিনে আত্মমূল্যায়ন
৫৫ বছরের পথচলায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা, সংস্কৃতি ও আন্দোলনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে— এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে শিক্ষকদের একটি অংশ ও শিক্ষার্থীরা মনে করেন, উৎসবের পাশাপাশি আত্মমূল্যায়নই এখন সময়ের দাবি।
কারণ, বিস্তারের গল্প যত বড়ই হোক, গভীরতা ছাড়া একটি বিশ্ববিদ্যালয় তার লক্ষ্য পূরণ করতে পারে না। ৫৬ বছরে পা রাখার এই মুহূর্তে জাহাঙ্গীরনগরের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ— সম্ভাবনাকে বাস্তব রূপ দেওয়া।
আমানউল্লাহ খান/এসএসকে/

