বিশেষ আয়োজন
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে শিক্ষার্থীদের ভাবনা
পর্ব-৩ : সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ
কাজী তানজিল
প্রকাশ: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৭:০৫
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনকে ঘিরে সবচেয়ে সরব ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে তরুণ, শিক্ষার্থী ও প্রথমবার ভোটাররা। কর্মসংস্থান, শিক্ষা, নিরাপত্তা, নারীর অংশগ্রহণ এবং সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক চর্চা— সবকিছু মিলিয়ে নতুন প্রজন্মের ভাবনা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আলাদা। ভোটকে তারা কেবল অধিকার নয়, পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে দেখছে। আশার পাশাপাশি রয়েছে দুশ্চিন্তাও। এই লেখাগুলোতে উঠে এসেছে তরুণ সমাজের সেই স্বপ্ন, প্রত্যাশা ও শঙ্কার বাস্তব প্রতিচ্ছবি। ফরিদপুর জেলার বৃহত্তর সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের শিক্ষার্থীদের মতামত তুলে ধরেছেন তানজিল কাজী
তরুণ ভোটেই নির্ধারিত হবে আগামীর পথ
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। প্রতীক বরাদ্দের পর শুরু হয়েছে জোরালো প্রচার–প্রচারণা। এই নির্বাচনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে তরুণ ও শিক্ষার্থী ভোটাররা। তরুণ প্রজন্ম জানে, ভোট কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি নিজের মত প্রকাশ এবং অধিকার প্রতিষ্ঠার শক্তিশালী মাধ্যম।
জাতীয় সংসদ থেকেই রাষ্ট্রের বাজেট প্রণীত হয়, যার ওপর নির্ভর করে শিক্ষা, গবেষণা ও উন্নয়নের ভবিষ্যৎ। শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন আধুনিক শ্রেণিকক্ষ, গবেষণায় সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা পরিবেশ। তবে আশার পাশেই রয়েছে শঙ্কা— শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেন সহিংসতা ও দলীয় দখলমুক্ত থাকে, প্রশ্নফাঁস ও অনিয়ম রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
সচেতন ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে তরুণরাই পারে নেতৃত্বের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে দেশকে একটি ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক পথে এগিয়ে নিতে।
সাদিয়া
শিক্ষার্থী, ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগ, সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ
তরুণ ভোটারদের আশা আর দুশ্চিন্তা
শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ জাতীয় সংসদ নির্বাচন— যার মাধ্যমে গড়ে উঠবে দায়িত্বশীল ও দূরদর্শী নেতৃত্ব। আমরা এমন নেতৃত্ব প্রত্যাশা করি, যারা শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা বিস্তার এবং মেধাভিত্তিক সমাজ নির্মাণে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। শিক্ষার্থীদের আকাঙ্ক্ষা এমন একটি সংসদ, যেখানে তরুণ সমাজের মতামত গুরুত্ব পাবে এবং শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবন খাতে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত হবে।
তবে এই স্বপ্নের পাশেই নানা শঙ্কা বিরাজ করে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, অনিয়ম, ভোট কারচুপি ও রাজনৈতিক অস্থিরতা শিক্ষার্থীদের বড় উদ্বেগের কারণ। অনেক সময় নির্বাচনের প্রভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়া, সেশনজট সৃষ্টি এবং নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কা দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে তোলে। পাশাপাশি নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবে প্রতিফলিত না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশাও জন্ম নেয়।
কাজী সানজিদা ইসলাম শীতল
শিক্ষার্থী, মার্কেটিং বিভাগ
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারীর নিরাপত্তা ও অংশগ্রহণ
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে ভোটারদের মধ্যে যেমন আগ্রহ রয়েছে, তেমনি রয়েছে উদ্বেগও। নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী দেশে মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৬ লাখের বেশি, যার মধ্যে নারী ভোটার সংখ্যা প্রায় ৬ কোটি ২৯ লাখ। জনসংখ্যায় নারীরা এগিয়ে থাকলেও ভোটার হিসেবে তাদের অংশগ্রহণ এখনও প্রত্যাশিত মাত্রায় নয়।
নারী ভোটারদের পিছিয়ে থাকার পেছনে শিক্ষা ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পাশাপাশি নিরাপত্তা বড় একটি কারণ। ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পথে হয়রানি, কেন্দ্রের ভিড় ও বিশৃঙ্খলা, রাজনৈতিক চাপ, পরিবারের বাধা এবং একা চলাচলের অস্বস্তি নারীদের ভোটদানে নিরুৎসাহিত করে।
নারী ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন প্রশাসনের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব রয়েছে। ভোটকেন্দ্রে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, নারী সহায়তা ব্যবস্থা নিয়মিত টহল জরুরি। পাশাপাশি নারীদের দলবদ্ধভাবে এবং সময়মতো ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোটদানে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। নারীর নিরাপদ অংশগ্রহণই সুষ্ঠু নির্বাচনের পূর্বশর্ত।
শ্রাবণী আক্তার মীম
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ
প্রথমবার ভোটাররা কী চায়? নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক ভাবনা
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রথমবার ভোটারদের ভূমিকা এবারের নির্বাচনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন প্রজন্ম আগের মতো কেবল দলীয় আনুগত্য, পরিবার কিংবা কাছের মানুষের মতের ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেয় না; বরং বাস্তবতা, কর্মসূচি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিবেচনা করেই ভোট দেওয়ার মানসিকতায় বিশ্বাসী।
আমাদের প্রধান প্রত্যাশা কর্মসংস্থান, মানসম্মত শিক্ষা, আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন। আমরা এমন নেতৃত্ব চাই, যারা কথার ফুলঝুরি নয়— বাস্তব কাজের মাধ্যমে আস্থা অর্জন করবে। একই সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও সমতার রাজনীতিতে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।
সোশ্যাল মিডিয়া ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম রাজনৈতিক দল ও তরুণদের মধ্যে মতবিনিময়ের সুযোগ বাড়িয়েছে। এতে তরুণরা সহজেই নিজেদের মত প্রকাশ করতে পারছে এবং প্রতিনিধিরাও তা বুঝে পদক্ষেপ নিতে পারছে। তবে প্রথমবার ভোটারদের মধ্যে কিছু সংশয়ও রয়েছে— কারণ তারা প্রতিশ্রুতি নয়, কথা ও কাজের মিল খোঁজে। যে দল তরুণদের কাছে দেশের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরতে পারবে, তারাই এগিয়ে থাকবে।
দ্বীপ মল্লিক
শিক্ষার্থী, রসায়ন বিভাগ
অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন : চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
একটি দেশের পরিচালনার মূল শক্তি হলো সরকার, আর সেই সরকার গঠনের একমাত্র গণতান্ত্রিক পথ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে পছন্দের প্রতিনিধি নির্বাচনের জন্য নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হওয়া অপরিহার্য। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, যা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একেবারেই ভিন্ন বাস্তবতায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, যার প্রধান উপদেষ্টা নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুস, নির্বাচন আয়োজনের দায়িত্বে রয়েছে। তবে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা দলের প্রভাব, প্রশাসনিক অসহযোগিতা, সহিংসতার আশঙ্কা ও ভোটারদের আস্থাহীনতা এই নির্বাচনের বড় চ্যালেঞ্জ। পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনীর নিরপেক্ষতা ও প্রতিবেশী দেশের প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
তবুও ড. ইউনুসের কূটনৈতিক দক্ষতা, আন্তর্জাতিক সমর্থন ও ছাত্র-জনতার আস্থায় এই নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। জনগণের প্রত্যাশা— এই নির্বাচনই দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথ খুলে দেবে।
মো. সোহেল হোসেন
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ
এসএসকে/

