সমুদ্রতীরের জ্ঞানের দীপশিখা পবিপ্রবি : ২৪ বছরের গৌরবময় অভিযাত্রা
পবিপ্রবি প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৬:৩০
পটুয়াখালী জেলা শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার উত্তরে, কুয়াকাটা মহাসড়কের কোলঘেঁষা বিস্তীর্ণ সবুজ প্রান্তরে গড়ে ওঠা পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (পবিপ্রবি) আজ প্রতিষ্ঠার ২৪ বছর পূর্ণ করল। ২০০২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি যাত্রা শুরু করা এই বিশ্ববিদ্যালয় দক্ষিণাঞ্চলের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই দিনে ক্যাম্পাসজুড়ে বইছে উৎসবের আমেজ, সঙ্গে আছে অর্জনের গর্ব ও আগামীর স্বপ্ন।
পবিপ্রবির পথচলা শুরু হয় এক দীর্ঘ বিবর্তনের মধ্য দিয়ে। এক সময়ের ‘জনতা কলেজ’ থেকে বেসরকারি কৃষি কলেজ এবং পরবর্তীতে পটুয়াখালী কৃষি কলেজ হিসেবে পরিচিত প্রতিষ্ঠানটি সময়ের চাহিদায় পূর্ণাঙ্গ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ নেয়। ২০০১ সালের ১২ জুলাই জাতীয় সংসদে ‘পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইন’ পাসের মাধ্যমে এর প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি সুদৃঢ় হয়। এরপর ২০০২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি সরকারি গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়টি। সেই থেকে প্রতি বছর দিনটি বিশ্ববিদ্যালয় দিবস হিসেবে যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপিত হয়ে আসছে।
‘মানসম্পন্ন প্রযুক্তিসমৃদ্ধ উচ্চ শিক্ষাই হোক দিন বদলের হাতিয়ার’— এই প্রত্যয়ে পরিচালিত পবিপ্রবি কেবল পাঠদানেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং দক্ষ, মানবিক ও দেশপ্রেমিক নাগরিক গড়ে তোলাই এর মূল লক্ষ্য। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে নেতৃত্ব, উদ্ভাবন ও সামাজিক দায়বদ্ধতার মানসিকতা গড়ে তোলা হচ্ছে।
বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়টি অনুষদের অধীনে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। কৃষি, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, ব্যবসায় প্রশাসন, মাৎস্যবিজ্ঞান, এ্যানিমাল সায়েন্স অ্যান্ড ভেটেরিনারি মেডিসিন, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট, নিউট্রিশন অ্যান্ড ফুড সায়েন্স, ল’ অ্যান্ড ল্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এবং ওশানোগ্রাফি অনুষদ ইতোমধ্যে একাডেমিক উৎকর্ষে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে। ইংরেজি মাধ্যমে পাঠদান শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে সহায়তা করছে।
গবেষণার ক্ষেত্রেও পবিপ্রবি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। আধুনিক আইটি ল্যাব, প্ল্যান্ট বায়োটেকনোলজি ল্যাব, ইনোভেশন ডিসেমিনেশন সেন্টারসহ বিভিন্ন গবেষণাগার ও বিষয়ভিত্তিক খামার শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ করে দিচ্ছে। কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে রয়েছে প্রায় ২৮ হাজারের বেশি বই এবং দেশি-বিদেশি ই-জার্নালের সমৃদ্ধ সংগ্রহ। ইউজিসি ডিজিটাল লাইব্রেরির সদস্য হওয়ায় আন্তর্জাতিক গবেষণা উপকরণেও সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হয়েছে।
ক্যাম্পাসের অবকাঠামোও সময়ের সঙ্গে সমৃদ্ধ হয়েছে। চারতলা বিশিষ্ট ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) এবং ৪৫০ আসনবিশিষ্ট অডিটোরিয়াম সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। প্রশাসনিক ভবনের সামনে স্থাপিত সাত বীরশ্রেষ্ঠের ভাস্কর্য এবং কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নতুন প্রজন্মকে ইতিহাস ও দেশপ্রেমের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় মসজিদ ও শ্রী শ্রী রাধাগোবিন্দ কেন্দ্রীয় মন্দির ক্যাম্পাসে ধর্মীয় সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
শিক্ষার্থীদের আবাসনের জন্য মূল ক্যাম্পাসে ছয়টি এবং বরিশাল ক্যাম্পাসে দুটি আবাসিক হল রয়েছে। আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন হেলথ কেয়ার সেন্টার সার্বক্ষণিক চিকিৎসা সেবা প্রদান করছে। নিজস্ব বাস সার্ভিস পটুয়াখালী ও বরিশাল রুটে নিয়মিত চলাচলের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের যাতায়াত সহজ করেছে।
প্রতিষ্ঠার ২৪ বছরে পবিপ্রবি আজ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে চলেছে নতুন স্বপ্ন নিয়ে। উপকূলীয় জনপদের এই বিদ্যাপীঠ জ্ঞান, গবেষণা ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে গড়ে তুলছে এক সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই মাহেন্দ্রক্ষণে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার দৃঢ় প্রত্যয়ে উচ্চারণ করছে— সমুদ্রের কোলঘেঁষা এই আলোকবর্তিকা একদিন আঞ্চলিক সীমা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও উজ্জ্বল হয়ে উঠবে।
মুশতাক/এসএসকে/

