জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় : প্রতিষ্ঠার ১৯ বছরেও হয়নি জকসু আইন
জান্নাতুন নাইম, জবি
প্রকাশ: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১৯:২৫
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) প্রতিষ্ঠার ১৯ বছর পার হলেও বিশ্ববিদ্যালয় আইনে নেই কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জকসু) নির্বাচনের বিধি। বিশ্ববিদ্যালয় আইনে ছাত্র সংসদের ধারা প্রণয়ন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা চললেও হয়নি বাস্তবায়ন।
শিক্ষক সমিতি, কর্মকর্তা-কর্মচারী নির্বাচন হলেও সবসময় বাধা পেয়েছে জকসু নির্বাচন। এর মধ্যে বেশিরভাগ সময় আইনে বিধি না থাকায় নির্বাচন দিতে ব্যর্থ হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
এদিকে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার থাকাকালীন জকসু নির্বাচন চান একাধিক ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। এখন যদি ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয় তাহলে সুষ্ঠু নির্বাচন ও শিক্ষার্থীবান্ধব নেতৃত্ব তৈরি হবে বলে তাদের মত।
এ ছাড়া জুলাইয়ের অন্যতম স্পিরিট স্থিতিশীল ক্যাম্পাস জকসু নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিফলিত হবে বলে মনে করেন তারা। তবে অনেকে পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগের বিচার ও সংস্কারের পরই চান জকসু নির্বাচন। যারা জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের সময় হামলা-মামলা ও নির্যাতন করেছে তাদের বিচার না হলে জুলাইয়ে শহীদদের রক্তের সাথে বেইমানি করা হবে বলে মনে করেন তারা।
তবে গত ২ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৯তম সিন্ডিকেট সভায় ছাত্র সংসদ নির্বাচনের (জকসু) খসড়া নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। এ বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রেজাউল করিম বলেন, ‘সিন্ডিকেট সভায় গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডার মধ্যে একটি ছিল জকসুর নীতিমালা প্রসঙ্গ। যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন-২০০৫ এ ছাত্রসংসদ নির্বাচন নিয়ে কোনো ধারা বা বিধি নেই, তাই অনুমোদিত নীতিমালাটি এখন আমাদের আইন উপদেষ্টাদের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হবে। মন্ত্রণালয় হয়ে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে অধ্যাদেশ জারি হলে এটি আইন হিসেবে গৃহীত হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আশা করি, খুব শিগগিরই রাষ্ট্রপতি থেকে জকসু নীতিমালাটি অধ্যাদেশ আকারে পাস হয়ে আসবে। এটা আসার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা জকসু নির্বাচনের একটি রোডম্যাপ ঘোষণা করতে পারব। আমরা এখন ভর্তি পরীক্ষা, দ্বিতীয় ক্যাম্পাসসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কাজ করছি। এ কারণে এটা নিয়ে আপাতত কাজ কম হচ্ছে। তবে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক বিশ্ববিদ্যালয় আইনে জকসু প্রজ্ঞাপন জারি হলেই নির্বাচনের কাজ শুরু হবে।’
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৫৪ সালে জগন্নাথ কলেজ থাকাকালীন প্রথম ছাত্রসংসদ নির্বাচন হয়। সে সময় জগন্নাথ কলেজ ছাত্র সংসদ (জকসু) বলা হতো। এ নির্বাচনে ভিপি এআর ইউসুফ আর জিএস সালাউদ্দিন আহমেদ নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত জগন্নাথ কলেজ ছাত্রসংসদের ১০টি কমিটি হয়। স্বাধীনতার পরে ১৯৭২, ১৯৭৯, ১৯৮৬, ১৯৮৭ সালে আরও চারটি ছাত্রসংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৮৭ সালে সর্বশেষ জকসু নির্বাচন হয়।
২০০৫ সালে জগন্নাথ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় রূপান্তরিত হওয়ার আগপর্যন্ত ১৮ বছর ধরে কোনো ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়নি। এরপর জগন্নাথ কলেজ থেকে ২০০৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হওয়ার সময় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০০৫-এ ছাত্র সংসদের অধ্যাদেশ যুক্ত হয়নি। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার ১৯ বছরে প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয় আইনে ছাত্রসংসদ অধ্যাদেশ যুক্ত ও নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ গ্রহণ করেও সফল হতে পারেনি।
সংস্কারের পর জকসু নির্বাচন চায় ছাত্রদল
বিগত ১৫-১৬ বছর মানুষের বাক স্বাধীনতা ছিল না। দমন-পীড়ন সহ্যের বাইরে যাওয়ার ফলে জুলাইয়ে এত বড় অভ্যুত্থান সম্ভব হয়। কিন্তু জুলাই-আগস্টের পর সরকার পরিবর্তন হলেও প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে আওয়ামী দোসররা রয়েছে। তাদের বিচারের আওতায় এনে সংস্কারের পরই জকসু নির্বাচন চান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নেতৃবৃন্দ।
সংগঠনটির আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেল বলেন, ‘জুলাই-আগস্টের পূর্ববর্তী ও আন্দোলনের সময়ে গত ১৭ বছর যারা আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা-মামলা ও নির্যাতন করেছে। আমরা চাই তাদের বিচারের আওতায় আনা হোক। ফ্যাসিবাদ মুক্ত ক্যাম্পাস গড়ে তুলে তারপর জকসু নির্বাচন হোক।’
সদস্যসচিব শামসুল আরেফিন শুভ বলেন, ‘আওয়ামী লীগের প্রশাসনের পেছনে অনেক ছায়া প্রশাসন ছিল। ছায়া প্রশাসনের নির্ভরতা থেকে অনেকে বলতে চায় ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়ে গেলে অনেক অর্জন হয়ে যাবে। কিন্তু আমাদের মোড়কের পরিবর্তন প্রয়োজন নয়, আমাদের গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের ইন্টার্নাল প্রত্যকটি প্রশাসনের প্রয়োজন। একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই পরিবর্তন প্রয়োজন।’
দ্রুত জকসু নির্বাচন চায় ইসলামী ছাত্র আন্দোলন, ছাত্র ফ্রন্ট, ছাত্র অধিকার পরিষদ
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার থাকাকালীন কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জকসু) নির্বাচন চায় ইসলামী ছাত্র আন্দোল। ২০০৮ সালের পর থেকে থেকে ছাত্রলীগ যেভাবে ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিল একইভাবে অন্য কোনো ছাত্র সংগঠন যে তা করবে না, তার নিশ্চয়তা নেই বলে মনে করেন তারা।
সংগঠনটির সভাপতি ওয়াহিদুল ইসলাম বলেন, ‘যদি প্রশাসনের সদিচ্ছা থাকে এবং শক্তহাতে ছাত্র সংসদ নির্বাচন দেয় তাহলে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে।’ এই অন্তবর্তীকালীন সরকার থাকাকালীন দ্রুতই জকসু নির্বাচন চান তিনি।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র ফ্রন্টের মতে, বিশ্ববিদ্যালয় আইনে ছাত্র সংসদ (জকসু) নির্বাচন সংযুক্ত করে দ্রুতই নির্বাচন দেওয়া উচিত। ক্যাম্পাসে গনতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতেও এই প্রক্রিয়া আনা জরুরি বলে মনে করেন তারা। ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরিপূরক আকাঙ্ক্ষা মনে করে দ্রুতই জকসু নির্বাচন চান তারা।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রফ্রন্টের আহ্বায়ক ইভান তাহসীভ বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিধি নেই। কিন্তু নির্বাচন নিয়ে শিক্ষার্থীদের যে আকাঙ্ক্ষা সেই আকাঙ্ক্ষার জায়গা থেকে নীতিমালাগুলো সংযুক্ত করে নেওয়া যায়। আর এই নীতিমালা প্রণয়ন করার ক্ষেত্রে ছাত্র সংগঠনগুলোর মতামত নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। যে খসড়া নীতিমালা আলোচনা হয়েছে, তা সব ছাত্র সংগঠনে কাছে পৌঁছানো এবং ছাত্র প্রতিনিধিদের মতামতের ভিত্তিতে নীতিমালা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।’
ছাত্র অধিকার পরিষদ মনে করে, শিক্ষাথীদের অধিকার নিয়ে কাজ করবে ছাত্র সংসদ। ৫ আগস্টের পর ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়ে শিক্ষার্থীদের চাওয়া অনেক বেশি। বিগত ১৫ বছরে ছাত্রদের দাবানো কষ্টগুলো এই চাওয়ার মধ্যেই উঠে আসছে। তাই এ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্যম্পাসগুলো স্থিতিশীল করতে দ্রুত জকসু নির্বাচন চায় সংগঠনটি। সেই জায়গা থেকে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় গুলো ছাত্র সংসদ নির্বাচন করল কি না এটা না দেখে জকসু নির্বাচন দেওয়া উচিত বলে মনে করে তারা।
এ বিষয়ে শাখা ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি এ কে এম রাকিব বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের কী চাহিদা, তাদের কী প্রয়োজন- এগুলো ছাত্র সংসদের নেতারাই তুলে ধরতে পারবেন। শিক্ষকরা সেটা বুঝবেন না এবং তুলেও ধরতে পারবেন না। সেই জায়গা থেকে যত দ্রুত সম্ভব ছাত্র সংসদ নির্বাচন (জকসু) নির্বাচন হওয়া দরকার।’
দ্রুত জকসু নির্বাচন চান সাধারণ শিক্ষার্থীরা
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নানামুখী সংকট নিয়ে কাজ করবে ছাত্র সংসদ। শিক্ষার্থীদের সমস্যাগুলো তুলে ধরবে বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষের কাছে। এ ছাড়া ছাত্র সংসদ হলে কোনো রাজনৈতিক সংগঠন একক আধিপত্য করতে পারবে না বলে মনে করে সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী মুজাহিদ বাপ্পি বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘বর্তমানে ক্যাম্পাসের যাবতীয় সংকট কিংবা কার্যকলাপ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের মাধ্যমে রাজনৈতিকভাবেই সমাধান হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের কাছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কোনো প্রতিনিধি নেই। এ জন্য শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে, প্রশাসনিক স্থবিরতা কাটাতে যত দ্রুত সম্ভব আইন সংযোজন করে জকসু নির্বাচন দেওয়াটা আবশ্যক।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে সব ধরনের দল-মতের মানুষ থাকবে। তবে অনেক সময় দেখা যায় ক্যাম্পাসে কোনো ঘটনা নিয়ে কথা বললে ট্যাগ দেওয়া হয়। কিন্তু ছাত্র সংসদ সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব করবে। এ ক্ষেত্রে ট্যাগিংয়ের সুযোগ থাকবে না। এ ছাড়া আমরা বিগত সময়ে দেখেছি একটি দল একক আধিপত্য বিস্তার করেছে। ক্যাম্পাসে সুষ্ঠু রাজনীতি ফিরিয়ে আনতে এই সরকার থাকাকালীন ছাত্র সংসদ নির্বাচন দেওয়ার উপযুক্ত সময়।’
জকসু নীতিমালা সংযুক্তির জন্য গঠিত কমিটির অগ্রগতি
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় আইনে জকসু নীতিমালা সংযুক্তির জন্য ৬ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীন বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘জকসু নীতিমালা প্রণয়নে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। আমরা কমিটির সদস্যরা নীতিমালার খসড়া প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করেছি। এরপর কাজ কতদূর সেটা প্রশাসনিক দপ্তরই বলতে পারবে।’
জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘জকসু নির্বাচনের খসড়া ডাকসু, জাকসু ও চকসুর আদলে করা হয়েছে। তবে আমরা আরও ভালো করার চেষ্টা করেছি। ছাত্র সংগঠন ও প্রতিনিধিদের মতামত খসড়া নীতিমালায় নেওয়া হয়নি। তবে রাষ্ট্রপতি থেকে অধ্যাদেশ জারি হলে তাদের জানানো হবে। তখন দ্রুত জকসুর নির্বাচন দ্রুতই করা হবে।’
ছাত্র কল্যাণ পরিচালক অধ্যাপক ড. কে এ এম রিফাত হাসান বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে জকসু নীতিমালা নেই। তবে খসড়া নীতিমালা প্রস্তাব করা হয়েছে। এই নীতিমালা শিক্ষা মন্ত্রণালয় হয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে যাবে। রাষ্ট্রপতি অনুমোদন দিলে তারপরই আমরা জকসু নির্বাচন নিয়ে সামনে এগোতে পারব।’
জেএন/এমজে

