গত কয়েক বছরে ‘ঘরে বসে ইনকাম’ শব্দটি বাংলাদেশে এক ধরনের ডিজিটাল আশ্বাসে পরিণত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদিনই ভেসে উঠছে শত শত বিজ্ঞাপন। কোথাও লেখা— দিনে এক থেকে দুই ঘণ্টা কাজ করে মাসে ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা আয়। কোথাও আবার বলা হচ্ছে, কোনো দক্ষতা বা অভিজ্ঞতা ছাড়াই নিশ্চিত ইনকাম। কিন্তু এই প্রচারের আড়ালে কী সত্যিই কাজের সুযোগ আছে, নাকি এটি একটি সংগঠিত প্রতারণা নেটওয়ার্ক?
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব বিজ্ঞাপনের ভাষা সাধারণ মানুষের দুর্বলতার জায়গাগুলোকে টার্গেট করে তৈরি। ‘বেকার হলেও চলবে’, ‘ছাত্র-ছাত্রী ও গৃহিণীদের জন্য সুযোগ’, ‘কোনো ঝুঁকি নেই’— এমন বাক্য বারবার ব্যবহার করা হয়। অনেক সময় ধর্মীয় বা আবেগী ভাষাও যুক্ত করা হয়, যাতে মানুষ দ্রুত বিশ্বাস করে ফেলে।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রতারণা সরাসরি বড় অঙ্কে শুরু হয় না। প্রথমে অল্প টাকা চাওয়া হয়, সাধারণত ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা। এটাকে বলা হয় আইডি অ্যাক্টিভেশন বা ট্রেনিং ফি। টাকা দেওয়ার পর কিছু ছোট কাজ দেওয়া হয় এবং অল্প পারিশ্রমিকও দেওয়া হয়। এতে ভুক্তভোগীর বিশ্বাস বাড়ে। পরে বড় কাজ বা উচ্চ আয়ের লোভ দেখিয়ে আরও টাকা নেওয়া হয়। একপর্যায়ে যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
অনুসন্ধানে কয়েকজন ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। তাদের মধ্যে রায়হান নামের একজন বলেন, ‘শুরুতে ১ হাজার টাকা দিয়ে কাজ শুরু করেন। প্রথম সপ্তাহে ৩০০ টাকা পান। এরপর বলা হয়, বড় প্রজেক্ট পেতে হলে আরও ৫ হাজার টাকা জমা দিতে হবে। টাকা দেওয়ার পর আর কোনো কাজ বা যোগাযোগ পাওয়া যায়নি।’
আরেক ভুক্তভোগী আসাদ জানান, তাকে বলা হয়েছিল এটি একটি আন্তর্জাতিক কোম্পানি। কিন্তু কোম্পানির ওয়েবসাইট, অফিস ঠিকানা বা বৈধ কাগজপত্রের কোনো তথ্যই দেওয়া হয়নি।
প্রতারিত হলেও অনেকেই আইনি পথে যান না। কারণ হিসেবে উঠে এসেছে লজ্জা, সময়ের অভাব এবং অল্প টাকার বিষয়টি। আবার কেউ কেউ মনে করেন, অনলাইনে প্রতারণার বিচার পাওয়া কঠিন। এই সুযোগটিই কাজে লাগাচ্ছে প্রতারক চক্র।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাস্তব অনলাইন কাজ অবশ্যই আছে। তবে সেগুলোর ক্ষেত্রে কাজ আগে, টাকা পরে। কোনো বৈধ ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্ম কখনোই আগাম ফি চায় না। দক্ষতা অর্জন ছাড়া এখানে নিয়মিত আয় সম্ভব নয়।
আইনজ্ঞ মো. মাসুদ আহম্মেদের মতে, অনলাইন প্রতারণাও প্রচলিত আইনের আওতায় অপরাধ। প্রমাণ সংরক্ষণ করে অভিযোগ জানালে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। তবে সচেতনতার অভাবে বেশিরভাগ ঘটনাই অগোচরে থেকে যাচ্ছে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ নেসার আহম্মেদের কাছে এই বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নিশ্চিত আয়’ বা ‘ঝুঁকি নেই’— এমন ভাষা ব্যবহার করলে সন্দেহ করুন। অল্প কাজের বিনিময়ে অস্বাভাবিক বেশি আয়ের প্রতিশ্রুতি দিলে এড়িয়ে চলুন। প্রতিষ্ঠানের অফিস ঠিকানা, বৈধ ওয়েবসাইট বা পরিচয় স্পষ্ট না থাকলে বিশ্বাস করবেন না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বিজ্ঞাপনকে কখনোই চূড়ান্ত সত্য ধরে না নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ঘরে বসে ইনকাম নিঃসন্দেহে আধুনিক কর্মসংস্থানের একটি সম্ভাবনা। কিন্তু এই সম্ভাবনার আড়ালেই তৈরি হয়েছে প্রতারণার সুবিশাল বাজার। যাচাই ছাড়া বিশ্বাস আর দ্রুত আয়ের লোভ মানুষকে ঠেলে দিচ্ছে সুপরিকল্পিত ফাঁদের দিকে। তাই স্বপ্ন দেখার আগে প্রয়োজন বাস্তবতা বোঝার সাহস এবং সচেতন সিদ্ধান্ত।
এমবি

