‘সাকরাইন’ আগামীকাল, পুরান ঢাকার অলিগলিতে উৎসবের আমেজ
প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১৬:০৯
পুরান ঢাকার একটি ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন উৎসব হচ্ছে সাকরাই বা পৌষসংক্রান্তি। প্রতিবছরের ন্যায় এই বছরেও পুরান ঢাকার অলিতে-গলিতে চলছে সাকরাইন উৎসবের জোর প্রস্তুতি। সাকরাইনে রঙিন ঘুড়িতে আকাশ ঢাকার অপেক্ষায় রয়েছে পুরান ঢাকা।
আগামীকাল ১৪ জানুয়ারি (বুধবার) উদযাপিত হতে যাচ্ছে এই সাকরাইন উৎসব। ঘুড়ি উড়ানো উৎসব নামে পরিচিত এই উৎসবের আমেজ লক্ষ্য করা গিয়েছে পুরান ঢাকার অলিগলি, ছাদ আর বাজারগুলোতেও। এ দিন পুরো সময় পুরান ঢাকার আকাশে উড়বে রঙিন ঘুড়ি। এরপর সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত বুড়িগঙ্গা তীরবর্তী এলাকায় আকাশ আলোকিত হবে আতশবাজি ও ফানুশে।
সরেজমিনে দেখা যায়, সূত্রাপুর, নবাবপুর, ধূপখোলা, শ্যামবাজার, শাঁখারি বাজার, তাঁতীবাজার, লক্ষ্মীবাজার, সদরঘাট, গেন্ডারিয়া, লালবাগ ও চকবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় এ উৎসবের আমেজ। ঘুড়ি বেচাকেনা, বক্স, সামিয়ানা ও বাঁশ দিয়ে ছাদ সাজানোর ব্যস্ততাও লক্ষ্য করা যায়।
ঘুড়ির দোকানগুলোতে চোখদার, রকদার, গরুদার, মাছলেঞ্জা, ফিতালেঞ্জা, চানতারা, বাক্স ঘুড়িসহ নানা নামের ঘুড়ি বিক্রি হচ্ছে। পুরান ঢাকার ঘুড়ি বিক্রির অন্যতম কেন্দ্র শাখারি বাজার। এখানে চশমাদার, কাউটাদার, পঙ্খিরাজ, প্রজাপতি, ঈগল, চিল, বাদুর, লাভ ঘুড়ি, টেক্কা, মালাদার ও বিদেশি নকশার ঘুড়ি। সাধারণ ঘুড়ির দাম ৫ থেকে ২৫ টাকা, আর বিশেষ নকশার ঘুড়ির দাম ১০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত।
জমে উঠেছে নাটাই ও সুতার বাজারও। কাঠের নাটাই, লোহার নাটাই, চাবাডী নাটাই বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১০০০ টাকায়। ড্রাগন সুতা, ভুত সুতা, বিলাই সুতা বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে। এছাড়া আতশবাজির মধ্যে রয়েছে পাঁচ শট, বারো শট কদম ফুল, তারা শট, রকেট ও নানা নামের ফানুস। তবে পুলিশের নজর এড়াতে অনেক দোকানি এসব সামগ্রী লুকিয়ে বিক্রি করছেন।
ঘুড়ি কিনতে আসা সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী তাইম বলেন, এই সময়টার জন্য আমরা পুরো এক বছর অপেক্ষা করি। ঈদের মতোই আনন্দ লাগে। অনেকগুলো ঘুড়ি কিনেছি। সাকরাইনের দিন খুব মজা করব।
পোস্তগোলা থেকে ঘুড়ি কিনতে আসা সাইম আহমেদ বলেন, আমার ছেলে ঘুড়ি কেনার বায়না ধরেছে। একসময় আমরাও অনেক ঘুড়ি উড়িয়েছি। এখন ওদের সময়। সন্তানকে আনন্দ দিতেই মূলত ঘুড়ি কিনতে আসা।
পুরান ঢাকার বাসিন্দা শ্যাম নারায়ন বলেন, সাকরাইন ঘিরে তাদের এলাকায় ছোট পরিসরে পারিবারিক মিলনমেলার আয়োজন করা হয়। ঘুড়ি উড়ানোর পাশাপাশি শিশুদের জন্য নানা খেলাধুলার ব্যবস্থাও থাকে। একই এলাকার বাসিন্দা মিজানুর রহমান বলেন, উচ্চ শব্দের সাউন্ড সিস্টেম ও ঝুঁকিপূর্ণ আগুনের খেলায় নিয়ন্ত্রণ দরকার। পরিবার নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে উৎসব করতে চাই।
এদিকে আগের মতো বেচাকেনা নেই বলছেন ব্যবসায়ীরা। পূর্বপুরুষদের এই ব্যবসায়ে ভাটা পড়েছে। একইসাথে উৎসবের আমেজও তুলনামূলক কমেছে।বলছেন দোকানিরা। তবে এখনও দুই দিন থাকায় বেচাকেনা বাড়বে বলে মনে করেন তারা। শাঁখারি বাজারের ‘পবিত্র ভাণ্ডার’-এর দোকানি দিলীপ নাগ বলেন, “বেচাকেনা মোটামুটি, আগের মতো হয় না। পাইকারি ক্রেতার সংখ্যা তুলনামূলক ভালো।
অন্যদিকে লিখন দেবরায় বলেন, প্রতিবছর সাকরাইন উপলক্ষে বাজারে লাখ লাখ টাকার ঘুড়ি ও ঘুড়ির উপকরণ বিক্রি হয়। কিন্তু এবার শুরু থেকেই বেচাকেনায় মন্দা দেখা যাচ্ছে। আবার এখন সাকারইনের সেই আমেজও কম।
আরেক ঘুড়ি বিক্রেতা স্বপ্ন বলেন, আমার বাবা আগে সাকরাইন এলেই ঘুড়ি বিক্রি করতেন। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে আমিও এখন ঘুড়ি বিক্রি করছি। বেচাকেনা মোটামুটি হলেও শেষ দিন পর্যন্ত আশাবাদী।
ইতিহাস সূত্রে জানা যায়, মুঘল আমলে ১৭৪০ সালের দিকে নায়েব-ই-নাজিম নওয়াজেশ মোহাম্মদ খানের সময় পুরান ঢাকায় সাকরাইনের সূচনা হয়। কালের পরিক্রমায় এটি পুরান ঢাকাবাসীর অন্যতম প্রধান ঐতিহ্যবাহী উৎসবে পরিণত হয়েছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বহু দেশেই এই উৎসব পালিত হয়।


