Logo

রাজধানী

ঢাকায় বাড়ছে লোডশেডিং

Icon

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬, ২১:১০

ঢাকায় বাড়ছে লোডশেডিং

ছবি: সংগৃহীত

তীব্র গ্যাস-সংকট এবং চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় ঢাকায় লোডশেডিং আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে, যা একই সঙ্গে গৃহস্থালী জীবন, শিল্প উৎপাদনসহ দৈনন্দিন নানা কাজে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। 

শনিবার সন্ধ্যায় ঢাকা জোনে চাহিদার বিপরীতে ৫৯৯ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হয়, যার ফলে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সুপেয় পানির বহুমুখী নাগরিক সংকটে চরম ভোগান্তিতে পড়েন নগরবাসী। 

ঢাকায় লোডশেডিং বাড়ায় দিন-রাত মিলিয়ে বিভিন্ন এলাকায় একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীকে। বিশেষ করে সন্ধ্যার সময় চাহিদার তুলনায় সরবরাহ ঘাটতি থাকায় লোডশেডিংয়ের মাত্রা বাড়ছে চরম আকার ধারণ করেছে।

শনিবার সন্ধ্যার পিক আওয়ারে ঢাকা জোনে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ছয় হাজার ৪৮৯ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে ৫৯৯ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়েছে। এর আগের দিন শুক্রবার একই সময়ে চাহিদা ছিল পাঁচ হাজার ৬৩৫ মেগাওয়াট, বিপরীতে লোডশেডিং হয়েছিল ২১৪ মেগাওয়াট।

পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত কয়েক দিনে ঢাকার বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতিতে বেশ ওঠানামা হয়েছে। ২০ আগস্ট সন্ধ্যার পিক আওয়ারে ছয় হাজার ২৫১ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে লোডশেডিং করা হয় ৫৫৪ মেগাওয়াট। ১৯ আগস্ট লোডশেডিং ছিল ৬৪০ মেগাওয়াট।

এর আগে ১৮ আগস্ট সন্ধ্যার পিক আওয়ারে ঢাকা জোনে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ছয় হাজার ১৮৪ মেগাওয়াট। ওই সময় লোডশেডিং করতে হয়েছিল ১৫৪ মেগাওয়াট।

তথ্য অনুযায়ী, ১৮ আগস্ট থেকে ২২ আগস্ট এর মধ্যে এই পাঁচ দিনের মধ্যে ১৯ আগস্ট সবচেয়ে বেশি ৬৪০ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে। তবে ২২ আগস্ট চাহিদা বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি লোডশেডিংও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২১ আগস্টের তুলনায় পরদিন ঢাকায় লোডশেডিং বেড়েছে ৩৮৫ মেগাওয়াট।

বিশেষ করে ২১ আগস্ট পাঁচ হাজার ৬৩৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে যেখানে ২১৪ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছিল, একদিন পর ছয় হাজার ৪৮৯ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৯৯ মেগাওয়াটে। অর্থাৎ একদিকে চাহিদা বেড়েছে ৮৫৪ মেগাওয়াট, অন্যদিকে লোডশেডিং বেড়েছে ৩৮৫ মেগাওয়াট।

বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাসের সংকট, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা অনুযায়ী বিদ্যুৎ না পাওয়া এবং চাহিদার তুলনায় সরবরাহ ঘাটতির কারণে লোডশেডিং পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না থাকলে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যায়। তখন চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং করতে হয়।

সম্প্রতি দেশে গ্যাস সরবরাহ সংকটও অব্যাহত রয়েছে। ফলে গ্যাসভিত্তিক বেশ কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। এতে বিদ্যুতের সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হচ্ছে।

গ্যাস সংকটে বন্ধ ফুয়াং ফুডের কারখানা: গ্যাসের প্রয়োজনীয় চাপ না পাওয়া এবং কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির কারণে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ফুয়াং ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড তাদের কারখানা ছয় মাসের জন্য বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রোববার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) মাধ্যমে কোম্পানিটি এ তথ্য জানিয়েছে।

কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, শনিবার অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের সভায় কারখানায় লে-অফ ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গ্যাসের প্রয়োজনীয় চাপ না পাওয়ায় উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এর সঙ্গে কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছে কোম্পানিটি।

‘এখন পানি আসছে না, কার কাছে বলব এই দুঃখ’: ‘সংসার আর ভালো লাগে না। বিদ্যুৎ নেই, চুলায় গ্যাস নেই, ওয়াসার লাইনে পানি নেই। এত যন্ত্রণা আর সহ্য হয় না, মন চায় সবকিছু ছেড়ে দূরে কোথাও পালিয়ে যাই।’

রাজধানীর আজিমপুরের বাসিন্দা আজহারুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা হোসেন স্বামীর কাছে এভাবেই নিজের ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করছিলেন।

আজহারুল ইসলাম বলেন, গত কয়েক দিন ধরে অব্যাহত লোডশেডিং, গ্যাস ও পানি সংকটের মারাত্মক বিরূপ প্রভাব পড়েছে পরিবারে। কোনো কিছুই স্বাভাবিকভাবে চলছে না।

তিনি জানান, গত এক সপ্তাহ ঘন ঘন লোডশেডিং হচ্ছে। দিনে অন্তত দুই থেকে তিন বার এক থেকে দেড় ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ থাকছে না। ভাদ্রের তীব্র গরমে ঘেমে অস্থির হচ্ছে পরিবারের ছোট-বড় সদস্যরা। গ্যাস না থাকায় রান্নাবান্না বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে, আর ইদানিং ওয়াসার লাইনেও ঠিকমতো পানি পাওয়া যাচ্ছে না।

শুধু আজহারুল ইসলাম বা তার স্ত্রী সেলিনা হোসেনই নন, রাজধানীর অধিকাংশ বাসিন্দারই একই অভিযোগ। মূলত গ্যাসের সরবরাহ ঘাটতির কারণেই এ সামগ্রিক সংকট তৈরি হয়েছে।

দেশে প্রতিদিন গ্যাসের মোট চাহিদা তিন দশমিক আট বিলিয়ন ঘনফুট। কয়েক দিন আগেও সরবরাহ কমে এক দশমিক ছয় থেকে এক দশমিক সাত বিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছিল যা গত ১৬ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন রেকর্ড।

পেট্রোবাংলার নির্ভরযোগ্য দায়িত্বশীল সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, রোববার দুপুর ১২টায় দেশে সর্বমোট দুই দশমিক ৩৮২ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হয়। মোট উৎপাদিত গ্যাসের মধ্যে এক দশমিক ৬২০ বিলিয়ন ঘনফুট আসে দেশীয় উৎস থেকে এবং শূন্য দশমিক ৭৬২ বিলিয়ন ঘনফুট আসছে আমদানিকৃত এলএনজি (এলএনজি) থেকে।

গ্যাসের সামগ্রিক সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। আগে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো দৈনিক প্রায় ৬৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পেলেও বর্তমানে তাদের জন্য এক বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস বরাদ্দ করা হচ্ছে।

অন্যদিকে সার কারখানাগুলোকে দেওয়া হচ্ছে ১৪০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে শিল্প, আবাসিক ও অন্যান্য খাতের জন্য অবশিষ্ট থাকছে মাত্র ৮৫০ মিলিয়ন ঘনফুট, যেখানে কয়েক সপ্তাহ আগেও এসব খাতে বরাদ্দ দেওয়া হত এক দশমিক ছয় থেকে এক দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ঘনফুট।

গ্যাস সংকটের কারণে বাসায় বিকল্প হিসেবে এলপিজি সিলিন্ডার বা ইনডাকশন চুলা ব্যবহার করতে গিয়ে পরিবারগুলোর মাসে এক থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়তি খরচ হচ্ছে। একই সঙ্গে লোডশেডিংয়ের কারণে আইপিএস ও চার্জার ফ্যানের চাহিদাও তুঙ্গে।

বাংলাদেশের খবর/আরইউ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন