আবাসন খাতে মন্দা, ঝরে পড়ছেন ব্যবসায়ীরা
বাংলাদেশের প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:৪২
আবাসন দেশের কর্মসংস্থানের অন্যতম প্রধান খাত। চরম মন্দাবস্থার শিকার এখন এ খাতটি। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে শীর্ষ অবস্থানে থাকা সত্ত্বেও আবাসন খাত অর্থনৈতিক মন্দার কারণে ক্রান্তিলগ্ন পার করছে। প্লট, ফ্ল্যাট ও বাড়ি বিক্রিতে মন্দা দেখা দেওয়ায় অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে আবাসন খাতজুড়ে। আবাসন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) তথ্যানুযায়ী, পরিকল্পিত নগরায়ণ ও সবার জন্য আবাসন এ নীতি সামনে রেখে রিয়েল এস্টেট ব্যবসা করেন।
২০১০-১২ সালে আবাসন ব্যবসায়ী ছিলেন প্রায় দেড় হাজার। আর বর্তমানে রিহ্যাবের তালিকাভুক্ত ব্যবসায়ীর সংখ্যা ৯১০ জন। গত কয়েক বছরে প্রায় ৫০০ জন ব্যবসায়ী আবাসন ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন।
জমির উচ্চমূল্য, গ্যাস সংযোগ বন্ধ, ফ্ল্যাট বিক্রি কমে যাওয়া, ক্রেতাপর্যায়ে ব্যাংক ঋণের সুদের হার বৃদ্ধিসহ নানা সমস্যার কারণে আবাসন খাতে মন্দাভাব বিরাজ করায় ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছেন।
রিহ্যাবের তথ্যানুযায়ী, ২০১০-১২ সালে বছরে প্রায় ১৫ হাজার ফ্ল্যাট বিক্রি হয়েছে। সেটি ২০২২-২৩ সালে কমে ১০ হাজারের নিচে চলে আসে। যদিও আবাসন কোম্পানিগুলো প্রতি বছর প্রায় ১৫-২০ হাজার ফ্ল্যাট নির্মাণ করে বিক্রি করতে সক্ষম। চাহিদার অতিরিক্ত ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হলে তার একটি অংশ অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে থাকে বিধায় কোম্পানিগুলো নির্মাণ কমিয়ে দেয়। এর মূল কারণ হচ্ছে উচ্চ রেজিস্ট্রেশন ব্যয়, ব্যাংক ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি, নকশা অনুমোদনে জটিলতাসহ দুদক ও এনবিআর ভীতি।
আবাসন ব্যবসায়ী ও ব্যাংক কর্মকর্তারা বলেছেন, এক সময় ফ্ল্যাট ক্রেতাদের কাছ থেকে ১৬-১৮ শতাংশ পর্যন্ত সুদ আদায় করত ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলো। ২০১৭ সালে ফ্ল্যাট ক্রয়ে বেসরকারি ব্যাংকের সুদের ৮.২৫ % থেকে ৯ % নামিয়ে আনা হয়েছে। ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমানোর পর ফ্ল্যাট বিক্রির পরিমাণ কিছুটা বাড়ে। কিন্তু হঠাৎ করে ২০১৮ সালে ব্যাংকগুলো ফ্ল্যাট ক্রয়ে ঋণের সুদের হার বাড়িয়ে ১২-১৪ শতাংশ নির্ধারণ করে।
সেই থেকে ব্যাংক ঋণের সুদের হার ১৩-১৪ শতাংশে ওঠানামা করে। এরপর ২০২৪ সালে ব্যাংক ঋণের সুদের হার বেড়ে প্রায় ১৫ শতাংশে পৌঁছে। এ বছর সুদের হার ১৩.৫০ থেকে ১৪ শতাংশ অবস্থান করছে। ব্যাংক ঋণের সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় অনেকে ঋণ নিয়ে ফ্ল্যাট কিনতে আগ্রহী নন। আবার ঋণ নিতে চাইলে ডকুমেন্টসের জটিলতায় অনেকে ঋণ পান না। ফলে ফ্ল্যাট-প্লট বিক্রিতে মারাত্মক প্রভাব পড়েছে।
জানা গেছে, ফ্ল্যাট ব্যবসায় ধস নামে ২০২২ সালে ২৩ আগস্ট ঢাকা মহানগর এলাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) গেজেট প্রকাশের পর। ড্যাপের গেজেটে ভবনের উচ্চতা কমিয়ে দেওয়া হয়। ফলে আবাসন ব্যবসায়ীরা তাদের চাহিদা মোতাবেক ভবন নির্মাণ করতে না পারায় ফ্ল্যাটের সংখ্যা কমে যায়। এতে ফ্ল্যাটের নির্মাণ ব্যয় বেশি হওয়ায় এবং ব্যবসা কমে যাওয়ায় বেশিরভাগ আবাসন কোম্পানি নতুন করে ফ্ল্যাট নির্মাণে নকশার অনুমোদন আবেদন দাখিল বন্ধ করে দেন।
আবাসন ব্যবসায়ীরা বলেন, আগে পাঁচ কাঠা জমি নয়তলা বিশিষ্ট ভবন নির্মাণ করা যেত। তখন ভবন মালিকরা কারপার্কিংসহ আটটি ফ্ল্যাট পেলে একই সংখ্যক ফ্ল্যাট ডেভেলপার পেতেন। ২০২২ সালে ড্যাপের গেজেট প্রকাশের পর সেই ভবনের উচ্চতা ৪-৫ তলায় নেমে আসে। এতে ডেভেলপারের ফ্ল্যাটের সংখ্যা কমে যাওয়ায় নির্মাণ খরচ বেড়ে যায়, যা বিক্রি করে কোনো ব্যবসা হয় না। বরং বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়ে।
এ কারণে বেশিরভাগ আবাসন কোম্পানি নতুন ভবন তৈরিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। ফলে ফ্ল্যাট নির্মাণ একেবারে কমে যায়। জানা গেছে, আবাসন খাতের গতিশীলতা ফেরাতে আবাসন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন রিহ্যাবের নেতারা অর্থ মন্ত্রণালয়, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফাইনান্স করপোরেশনসহ বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে গত কয়েক বছর ধরে বারবার বৈঠক করে আসছেন। বৈঠকে সরকারের তরফ থেকে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে আশানুরূপ কোনো ফল মেলেনি। তবে সম্প্রতি ড্যাপের গেজেট সংশোধন করে গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে।
এই গেজেট প্রকাশের ফলে ফ্ল্যাট নির্মাণ আবার বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করেন রিহ্যাব নেতারা। রিহ্যাব সূত্রে জানা গেছে, প্লট-ফ্ল্যাট ক্রয়ে উচ্চ রেজিস্ট্রেশন বেশি হওয়ায় অনেকে এ খাতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী নয়। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত প্লট রেজিস্ট্রেশনের শুধু গেইন ট্যাক্স ছিল কাঠাপ্রতি দেড় লাখ টাকা। সেই হিসাবে ৩ কাঠার একটি প্লটের গেইন ট্যাক্স ছিল সাড়ে চার লাখ টাকা। যেটি চলতি বছরের জুলাই মাসে বেড়ে দাঁড়িয়েছে সাড়ে সাত লাখ থেকে আট লাখ ৭৫ হাজার টাকা। গেইন ট্যাক্স ছাড়া অন্যান্য ফি কোনো পরিবর্তন না হলেও শুধু গেইন ট্যাক্স বাড়ানোর কারণে প্লটের রেজিস্ট্রেশন ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে।
তথ্য বলছে, সার্কভুক্ত দেশগুলোতে ফ্ল্যাটের রেজিস্ট্রেশন ফি ৫ থেকে ৭ শতাংশ। কিন্তু বাংলাদেশে রেজিস্ট্রেশন ফি হচ্ছে ১৪ থেকে সাড়ে ১৬ শতাংশ। একজন ক্রেতা এক কোটি টাকা মূল্যের একটি ফ্ল্যাট কিনলে তাকে রেজিস্ট্রেশন ব্যয় করতে হয় ১৪ লাখ টাকা। তবে স্থানভেদে এই টাকা সাড়ে ১৬ লাখে গিয়েও পৌঁছে। ফ্ল্যাটের উচ্চ রেজিস্ট্রেশন ব্যয়ের কারণে অনেকে ফ্ল্যাট কিনছেন না, আবার ফ্ল্যাট ক্রয়ের পর ব্যয় বেশি হওয়ায় রেজিস্ট্রেশন করছেন না। আবাসন কোম্পানির সঙ্গে ফ্ল্যাট ক্রেতা স্ট্যাম্পে চুক্তি করে ফ্ল্যাটে বসবাস করছেন।
অনেক সময় ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন না হওয়া কোনো কোনো ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে অন্য কারও কাছে বিক্রি করে দিচ্ছেন অথবা ফ্ল্যাট ক্রেতার কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছেন।
এ প্রসঙ্গে রিহ্যাবের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী ভূইয়া বলেন, ‘আবাসন খাতের নানা সমস্যার কারণে এ খাতে মন্দাভাব চলছে। ড্যাপের গেজেট প্রকাশের পর ২০২২ সাল থেকে ব্যবসায় মন্দাভাব চলছে। ভবনের উচ্চতা কমিয়ে দেওয়ায় ৬০ শতাংশ ভবন নির্মাণ কমে গেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের দেশে ফ্ল্যাটের ফ্ল্যাট ক্রয়ে ব্যাংক ঋণের সুদের হার বেশি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ফ্ল্যাট ক্রয়ে স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেয়। কিন্তু আমাদের ঋণের সুদের হার বেশি। এটি কমিয়ে আনতে হবে। তা ছাড়া পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় আমাদের দেশে ফ্ল্যাটের নিবন্ধন ফি অনেক বেশি। নিবন্ধন ফি বেশি হওয়ার কারণে অনেকে ফ্ল্যাট কিনতে আগ্রহ দেখান না। এটি ৬-৭ শতাংশে নামিয়ে আনা দরকার।’
বিকেপি/এনএ

