Logo

সারাদেশ

শাপলার ডেরায় ভিন্ন রাজত্ব, চোরাই মালামালের বিনিময়ে মেলে মাদক

Icon

জুয়েল হাসান, বগুড়া প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৫, ১৬:১৬

শাপলার ডেরায় ভিন্ন রাজত্ব, চোরাই মালামালের বিনিময়ে মেলে মাদক

গ্রাফিক্স : বাংলাদেশের খবর

বগুড়া শহরের একটি এলাকায় এখনো আদিম যুগের বিনিময় প্রথা চলছে। চকসূত্রাপুর এলাকার হাড্ডিপট্টিতে চুরি ও ছিনতাইয়ের মালামাল দিলে বিনিময়ে মিলছে মাদক ও টাকা। এমন অভিযোগ উঠেছে মাদক সম্রাজ্ঞী শাপলার বিরুদ্ধে। এমনকি পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

সম্প্রতি চুরির মামলার এক আসামিকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের ওপর শাপলা ও তার অনুসারীরা হামলা চালালে তিন পুলিশ সদস্য আহত হন। এই হামলার পর পুলিশ ওই এলাকায় অভিযান অব্যাহত রেখেছে এবং গত দুদিনে ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, বগুড়ার হাড্ডিপট্টিতে মাদকের কারবার ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদক প্রকাশ্যে কেনাবেচা হওয়ায় এলাকাটি ‘মাদক হটস্পট’-এ পরিণত হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের নজরদারির অভাব থাকায় দিনেদুপুরেও মাদকের রমরমা ব্যবসা চলছে, যার মূল হোতা শাপলা। তার বিরুদ্ধে সদর থানায় ডজনখানেক মামলা রয়েছে, যার বেশিরভাগই মাদক মামলা।

সাজা ভোগের পর জামিনে মুক্ত হয়ে স্বামীসহ আবারও মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। ব্যবসা বাড়াতে নিজের ছোট বোনের স্বামীকে রংপুর থেকে নিয়ে এসেছেন বলেও জানা গেছে।

পুলিশ জানায়, সম্প্রতি বগুড়া প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক কালাম আজাদের বাড়িতে চুরির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় শাজাহানপুর থানায় একটি মামলা হয়। মামলার তদন্তকালে পুলিশ রংপুর থেকে বেলাল নামে এক আসামিকে গ্রেপ্তার করে, যার কাছ থেকে চুরি যাওয়া মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। বেলাল আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে এই চুরির ঘটনায় রনিসহ আরও কয়েকজনের নাম প্রকাশ করে। এই রনিকে গ্রেপ্তার করতে বৃহস্পতিবার (১৪ আগস্ট) হাড্ডিপট্টিতে অভিযান চালায় ডিবি পুলিশ। এ সময় শাপলা ও তার ৭০-৮০ জন অনুসারী পুলিশের ওপর হামলা চালায়। এ ঘটনায় শাপলা ও তার স্বামী আশিকসহ ৭০-৮০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে সদর থানায় মামলা করা হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, গ্রেপ্তারের ভয়ে হাড্ডিপট্টি এলাকা এখন প্রায় জনশূন্য। স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযানে নিরীহ মানুষকেও গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা আনছার আলী বলেন, ‘চুনোপুঁটি’ মাদক ব্যবসায়ীরা মাঝে মাঝে ধরা পড়লেও ‘রাঘববোয়ালরা’ এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। শাপলার পেছনে প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়া আছে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, এই এলাকায় প্রায় ৩৫ বছর ধরে মাদকের ব্যবসা চলছে। গ্রেপ্তার হলেও জামিনে বেরিয়ে আবারও ব্যবসা শুরু করে।

তিনি আরও জানান, এলাকার মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যে ফাইমা, ইলিয়াস ও ইতির মতো উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিরা রয়েছে। এদের কাছ থেকে মাদক নিয়ে শাপলা ও বেহুলাসহ অন্যরা ব্যবসা করে। মাঝে মাঝে প্রশাসনের লোকজনের আনাগোনা দেখা গেলেও সাধারণ মানুষ ভয়ে কিছু বলতে পারে না।

রুবি আক্তার নামে এক কুলি শ্রমিকের স্ত্রী বলেন, ‘তার স্বামী একজন কুলি শ্রমিক। গত রাতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এখন তিনি ছেলেমেয়ে নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন।’

জেলা গোয়েন্দা পুলিশের অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ইকবাল বাহার বলেন, ‘বগুড়া শহরের চকসুত্রাপুর হাড্ডিপট্টির মাদক সম্রাজ্ঞী ‘শহীদ’ সিয়াম শুভর পালক মা শাপলা খাতুনের বিরুদ্ধে মাদক সংক্রান্ত ১১টি মামলা রয়েছে। তার ছত্রছায়ায় অনেক চোর ও মাদক ব্যবসায়ী থাকে। বিভিন্ন জায়গায় চুরি ও চোরাই মাল শাপলাকে দেওয়া হয়। বিনিময়ে তিনি তাদের টাকা ও মাদক দেন। গ্রেপ্তার রনি স্বীকার করেছে, ওরা পাঁচ জন মিলে চুরি করেছিল। চুরি শেষে স্বর্ণগুলো শাপলা খাতুনের কাছে দিয়েছে। রনিকে গ্রেপ্তার করতে গেলে হামলার ঘটনা ঘটে। মামলা হওয়ার পর থেকে ওই এলাকায় নিয়মিত অভিযান চলছে।’

বগুড়া পৌরসভার ৮নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও জামায়াত নেতা এরশাদুল বারী এরশাদ বলেন, ‘মাদকবিরোধী অভিযানে প্রশাসন সব জায়গায় সফল হলেও হাড্ডিপট্টিতে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন করে মাদক ব্যবসায়ী তৈরি হয়েছে। নতুন ব্যবসায়ীদের তালিকা করে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে।’

বগুড়া প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক কালাম আজাদ প্রশাসনের প্রতি আস্থা প্রকাশ করে বলেন, ‘পুলিশ দ্রুতই চুরি হওয়া মালামাল উদ্ধার করতে পারবে।’

মাদক ব্যবসায়ীদের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘মাদক ব্যবসায়ী যেই হোক না কেন, তাদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া যাবে না। প্রশাসনের এমন অভিযানে আমরা গণমাধ্যমকর্মীরা সবসময় পাশে আছি।’

এ বিষয়ে বগুড়া জেলা পুলিশ সুপার জেদান আল মুসা বলেন, ‘হাড্ডিপট্টিতে মাদক ব্যবসায়ীদের ধরতে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। সকলের সহযোগিতায় এই এলাকা থেকে মাদক নির্মূল করা হবে।’

এমআই

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

মাদক কারবারি মামলা হামলা ও ভাংচুর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন