বিচারহীনতার সংস্কৃতি
যশোরে বছরে ৬০ লাশ, থামছে না খুনের মিছিল
যশোর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০১ জানুয়ারি ২০২৬, ১৫:৫৭
গ্রাফিক্স : বাংলাদেশের খবর
পারিবারিক বিরোধ, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, মাদক ও পরকীয়াসহ নানা কারণে চলতি বছরে যশোরে অন্তত ৬০টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। একের পর এক খুনের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে।
যশোর পুলিশ সুপার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ৬০টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। মাসওয়ারি হিসাবে জানুয়ারিতে ৪টি, ফেব্রুয়ারিতে ৩টি, মার্চে ৬টি, এপ্রিলে ৬টি, মে মাসে ৭টি, জুনে ৮টি, জুলাইয়ে ৬টি, আগস্টে ৬টি, সেপ্টেম্বরে ২টি, অক্টোবরে ৭টি, নভেম্বরে ৩টি এবং ডিসেম্বরে ২টি হত্যাকাণ্ড রেকর্ড করা হয়।
২২ মে অভয়নগরের ডহর মশিয়াহাটী গ্রামে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন নওয়াপাড়া পৌর কৃষকদলের সভাপতি তরিকুল ইসলাম। এ হত্যাকাণ্ডের পর ওই এলাকায় মাতুয়া সম্প্রদায়ের প্রায় ২০টি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। তদন্তে জানা যায়, মাছের ঘের নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত হলেও ঘটনায় চরমপন্থীদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ মেলে।
৯ জুন যশোর সদর উপজেলার ডাকাতিয়া গ্রামে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে মইন উদ্দিনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। একই রাতে চৌগাছার পুড়াহুদা গ্রামে ছোট ভাইয়ের ছুরিকাঘাতে বড় ভাই রবিউল ইসলাম নিহত হন।
১৪ জুন অভয়নগরের নাউলি গ্রামে প্রবাসী হাসান শেখকে গলা কেটে হত্যা করা হয়। নিহতের স্বজনদের দাবি, পূর্বশত্রুতার কারণেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। একই রাতে শার্শার দুর্গাপুর বাজারে রাজনৈতিক বিরোধের জেরে বিএনপি কর্মী লিটন হোসেন নিহত হন। এর চারদিন আগে ঈদের দিন শার্শার ডুবপাড়া গ্রামে ককটেল বিস্ফোরণে নিহত হন বিএনপি নেতা আব্দুল হাই।
সেইদিনই ঝিকরগাছার হাড়িয়া গ্রামে একটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। বেড়াতে এসে নিখোঁজ হওয়া ১০ বছরের শিশু সোহানার ধর্ষিত মরদেহ একটি পুকুর থেকে উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় পুলিশ নাজমুস সাকিব (নয়ন) নামে এক অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে।
৯ জুলাই বাঘারপাড়ার ঘোষনগর গ্রামে সুচিত্রা সেন দেবনাথ নামে এক গৃহবধূর লাশ লেপ-তোষকের স্টিলের বাক্সের ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয়। ঘটনায় তার স্বামী তপন দেবনাথকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তদন্তে পরকীয়ার সম্পর্ক সামনে আসে।
১২ জুলাই রাতে যশোর শহরের ষষ্ঠিতলা এলাকায় আশরাফুল ইসলাম বিপ্লব নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। পুলিশ জানায়, বন্ধুর তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীকে বিয়ে করায় তাকে হত্যা করা হয়।
৬ ডিসেম্বর গভীর রাতে তানভীর হোসেন নামে এক যুবক খুন হন। নিহতের প্যান্টের পকেট থেকে ৬১ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। ১৩ ডিসেম্বর যশোর সদরে প্রকাশ্যে শহিদ নামে এক যুবককে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। পূর্বশত্রুতার জেরেই এ ঘটনা ঘটে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
যশোর ক্যান্টনমেন্ট কলেজের মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ইসমত আরা বলেন, ‘বিচারহীনতা ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের ফলেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। মানুষ এখন আইনের ওপর আস্থা হারাচ্ছে এবং নিজের হাতে বিচার করতে চাচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, অপরাধের বীভৎসতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় মানুষের অবচেতন মনও প্রভাবিত হচ্ছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও পারিবারিক নৈতিক শিক্ষা জোরদারের ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) আবুল বাশার গণমাধ্যমকে বলেন, ‘২০২৫ সালে জেলায় ৬০টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। অধিকাংশ ঘটনার মোটিভ উদ্ঘাটন করা হয়েছে এবং জড়িত অনেককেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অপরাধ দমনে পুলিশের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।’
শহিদ জয়/এআরএস

