উন্নয়নের মুখোশে লুটপাট : বান্দরবানে এলজিইডির সড়কে অনিয়ম
বান্দরবান প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১৫:১৫
উন্নয়নের নামে বান্দরবানে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) বাস্তবায়িত বান্দরবান সদর উপজেলার চিম্বুক সড়ক থেকে ফারুক পাড়া হয়ে বড় পাহাড় পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ প্রকল্পে ভয়াবহ অনিয়ম ও লুটপাটের অভিযোগ।
সরকারি নীতিমালা ও কারিগরি নির্দেশনা উপেক্ষা করে সড়ক নির্মাণে বালির পরিবর্তে ব্যবহার করা হচ্ছে পাহাড় কেটে নেওয়া মাটি ও নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী। এতে একদিকে যেমন পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে, অন্যদিকে নতুন নির্মিত সড়কের স্থায়িত্ব নিয়ে গভীর শঙ্কায় পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সরেজমিনে দেখা যায়, জেলার সদর উপজেলার চিম্বুক সড়ক থেকে ফারুক পাড়া হয়ে বড় পাহাড় পর্যন্ত প্রায় ২ কিলোমিটার ৩ কোটি ১০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে গ্রামীণ সড়ক নির্মাণ কাজে বালুর পরিবর্তে ব্যবহার করা হচ্ছে পাহাড়ি লাল মাটি, ছাঁকনিবিহীন বালু ও নিম্নমানের ইটের খোয়া।
কোথাও কোথাও পাহাড় কেটে নেওয়া কাঁচা মাটি সরাসরি সড়কের সাব-বেস ও বেস লেয়ারে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা যেকোনো বৃষ্টিতেই ধুয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কাজের শুরু থেকেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে দ্রুত বিল তুলতেই ব্যস্ত। মান নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তদারকি কার্যত নেই বললেই চলে। ফলে প্রকল্পের কাগজে-কলমে কোটি টাকার উন্নয়ন হলেও বাস্তবে তা টিকবে কয়েক মাসও নয়— এমন আশঙ্কা এখন প্রকাশ্যে।
ফারুক পাড়া এলাকার বাসিন্দা লালকুপ বম বলেন, ‘এই সড়কগুলো জনগণের টাকায় হচ্ছে। কিন্তু কাজ দেখে মনে হচ্ছে ঠিকাদার আর কিছু অসাধু কর্মকর্তার পকেট ভরানোর জন্যই প্রকল্প। বর্ষা এলেই সবকিছু ভেঙে যাবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘এখানে কোনো ধরনের বালুর অস্তিত্ব নেই, পার্শ্ববর্তী পাহাড় থেকে মাটি কেটে সড়কে দেওয়া হচ্ছে। এভাবে যদি সড়ক নির্মাণ করা হয় তাহলে আমার কোনো কাজেই আসবে না, উল্টো ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তাই আমরা চাই, সড়কের কাজ সঠিক তদারকির মাধ্যমে করা হোক।’
সড়ক নির্মাণ কাজে নিয়োজিত স্কেভেটর ড্রাইভার মাসুদ বলেন, ‘ঠিকাদার আমাদেরকে যেভাবে কাজ করতে বলেছে সেভাবে করছি। পার্শ্ববর্তী পাহাড় থেকে মাটি কেটে সড়কে দেওয়া হচ্ছে বলেন স্বীকার করেন স্কেভেটর ড্রাইভার।’
এ বিষয়ে বান্দরবান সদর উপজেলার এলজিইডির সহকারী প্রকৌশলী অনুপম সিকদার বলেন, ‘সড়ক নির্মাণে বালুর পরিবর্তে পাহাড়ের মাটি ব্যবহারের কোনো নিয়ম নেই। তবে সড়কের দূরত্ব, কাজের মূল্য, ঠিকাদারি লাইসেন্সের নামসহ বিস্তারিত তথ্য জানা নেই বলে জানান তিনি।’
প্রকৌশল বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ি মাটি কখনোই টেকসই সড়ক নির্মাণের উপযোগী নয়। এতে পানি শোষণ ক্ষমতা বেশি হওয়ায় অল্প সময়ের মধ্যেই সড়কে ধস, ফাটল ও ভাঙন দেখা দেয়। অথচ এসব ঝুঁকি জেনেও মানহীন সামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে, যা সরাসরি রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়।
এদিকে পরিবেশবিদরা বলছেন, সড়ক নির্মাণের নামে পাহাড় কেটে মাটি ব্যবহার করা শুধু অনিয়মই নয়, এটি পরিবেশ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থার ওপর মারাত্মক আঘাত। এতে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বাড়ছে, নষ্ট হচ্ছে জীববৈচিত্র্য।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো— এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরবতা। অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও এলজিইডির কোনো কার্যকর তদন্ত বা ব্যবস্থা এখনো দৃশ্যমান নয়। এতে করে প্রশ্ন উঠছে, তবে কি এই অনিয়মের পেছনে প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়া রয়েছে?
এ বিষয়ে বান্দরবান স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রতিপদ দেওয়ান বলেন, ‘ঠিকাদারকে আমরা কোনো পাহাড় কাটার অনুমতি দেওয়া হয় নাই। আর সড়কে পাহাড়ের মাটি ব্যবহারের কোনো প্রশ্নই আসে না। যদি সড়কে পাহাড়ের মাটি ব্যবহার করে থাকে তাহলে আমরা ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।’
তিনি আরো বলেন, ‘পাহাড়ের বালু অনেক সময় সড়ক নির্মাণে ভালো ভূমিকা রাখে। তবে পাহাড়ের মাটি কোনোভাবেই সড়কে দেওয়া যাবে না। তারপরও আমরা সরেজমিনে গিয়ে দেখবো এবং যদি সড়ক নির্মাণ কাজে পাহাড়ের মাটি ব্যবহার করা হয় তাহলে ঠিকাদারদের বিল দেওয়া হবে না বলে জানান এ প্রকৌশলী।’
শুধু এ সড়কই নয়, সদর উপজেলার টাইগার পাড়া হয়ে রুপালি ঝর্ণা পর্যন্ত এবং রেইছা বাজার থেকে গোয়ালিয়াখোলা সড়ক নির্মাণ কাজেও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে এলজিডির বিরুদ্ধে।
স্থানীয়দের দাবি, অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে দায়ী ঠিকাদার ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় উন্নয়নের নামে এই লুটপাট বন্ধ হবে না, আর জনগণ পাবে না টেকসই অবকাঠামো।
উন্নয়নের নামে রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাৎ আর পরিবেশ ধ্বংসের এই চিত্র বান্দরবানে শুধু একটি প্রকল্পের নয়— এটি পুরো ব্যবস্থার প্রতি একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন।
উল্লেখ্য, ২০২৪-২৫ অর্থ সালে এলজিডির অর্থায়নে সিএইচটি, আরআইডিপি প্রকল্পের অধীনে ৩ কোটি ১০ লক্ষ ৮৬ হাজার টাকা ব্যয়ে চিম্বুক সড়ক থেকে ফারুক পাড়া হয়ে বড় পাহাড় পর্যন্ত প্রায় ২ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ কাজটি বাস্তবায়ন করছেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স ইউটিমং।
সোহেল কান্তি নাথ/এনএ

