হলফনামা বিশ্লেষণ
খুলনা-৬ আসনের প্রার্থী বাপ্পী ও কালামের সম্পদের উত্থান
তরিকুল ইসলাম, খুলনা
প্রকাশ: ২২ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:১০
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনা-৬ (কয়রা-পাইকগাছা) আসনে চারজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে বিএনপির খুলনা জেলা ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিব মো. মনিরুল হাসান বাপ্পী এবং জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য আবুল কালাম আজাদকে ঘিরে ভোটারদের মধ্যে আলোচনা ও কৌতূহল বেশি। নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামা বিশ্লেষণে দুই প্রার্থীর আয়, সম্পদ, শিক্ষা ও ঋণ পরিস্থিতিতে স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
এক যুগে লাখপতি থেকে কোটিপতি বাপ্পী, আয় বেড়েছে ২১ গুণ
বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী মো. মনিরুল হাসান বাপ্পী এইচএসসি পাস। তিনি ঠিকাদারি ব্যবসার পাশাপাশি মৎস্য খামার ও কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। তিনি দুইবার রূপসা উপজেলার শ্রীফলতলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ স্বর্ণপদক লাভ করেন। ২০১৪ সালে রূপসা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করে পরাজিত হন। ওই নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।
২০১৪ সালে জমা দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী, সে সময় তার অস্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ ছিল ১৩ লাখ ২৪ হাজার ১৩৪ টাকা। সর্বশেষ হলফনামায় অস্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ দেখানো হয়েছে ১ কোটি ৩৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রায় এক যুগে তার সম্পদ বেড়ে তিনি লাখপতি থেকে কোটিপতি হয়েছেন।
ওই সময় তার ও তার স্ত্রীর কোনো স্বর্ণালংকার ছিল না। বর্তমানে উপহার হিসেবে পাওয়া সাড়ে ৪১ ভরি স্বর্ণালংকারের তথ্য হলফনামায় উল্লেখ করেছেন। আগে কৃষিজমি না থাকলেও এখন তার নামে ৩৬ শতক কৃষিজমি রয়েছে, যার একটি অংশ পৈতৃক সূত্রে পাওয়া।
ঢাকার কুড়িলে তার একটি বাড়ি রয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য ১ কোটি ২৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এ ছাড়া রূপসার শ্রীফলতলা ইউনিয়নের বাঁধালে পৈতৃক সূত্রে পাওয়া আরেকটি বাড়ির তথ্যও হলফনামায় উল্লেখ রয়েছে।
২০১৪ সালে তার বার্ষিক আয় ছিল ২ লাখ ১০ হাজার টাকা। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৪ লাখ ১০ হাজার টাকায়, যা প্রায় ২১ গুণ বৃদ্ধি। সে সময় তার ব্যাংক ঋণ ছিল প্রায় ১৫ লাখ টাকা। বর্তমানে তিনি ও তার স্ত্রী মিলিয়ে ১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ঋণগ্রস্ত।
হলফনামা অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে বর্তমানে আটটি ফৌজদারি মামলা চলমান এবং তিনি আগে ২৪টি মামলা থেকে খালাস পেয়েছেন। তার কাছে নগদ রয়েছে ৬১ লাখ ৫৯ হাজার ৬৬১ টাকা এবং তার স্ত্রীর কাছে রয়েছে ১১ হাজার ২০০ টাকা। ব্যাংকে তার নামে জমা রয়েছে ২০ লাখ ৫২ হাজার ১২৮ টাকা এবং তার স্ত্রীর নামে রয়েছে ২৮ হাজার ৬৭৪ টাকা।
তার ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকার ইলেকট্রনিক সামগ্রী ও আসবাবপত্র রয়েছে। পাশাপাশি ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা মূল্যের একটি আগ্নেয়াস্ত্রের তথ্যও হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যের কাছ থেকে লিজ নেওয়া জমিতে একটি মৎস্য খামার পরিচালনার কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন।
তার স্থাবর সম্পত্তির মোট মূল্য দেখানো হয়েছে ১ কোটি ৭৮ লাখ ৪৩ হাজার ৮৩৬ টাকা এবং তার স্ত্রীর স্থাবর সম্পত্তির মূল্য ১৫ লাখ টাকা। সর্বশেষ আয়কর রিটার্নে তার মোট সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ২ কোটি ২৮ লাখ ৬২ হাজার ৫২৮ টাকা। তিনি আয়কর প্রদান করেছেন ৯ লাখ ৭৬ হাজার ৮১৬ টাকা।
কালামের আয় ও সম্পদ বেড়েছে সীমিত হারে, বর্তমানে ঋণমুক্ত
জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোটের প্রার্থী হিসেবে এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন। ওই নির্বাচন নিয়েও স্বচ্ছতা প্রশ্নে বিতর্ক রয়েছে। তিনি কামিল পাস এবং পেশায় ব্যবসায়ী।
২০১৮ সালে জমা দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী, তার অস্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ ছিল ১৫ লাখ ৬৮ হাজার টাকা। সর্বশেষ হলফনামায় তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ১৪ হাজার ৫৮৮ টাকা। স্থাবর সম্পত্তিতে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। তার নামে রয়েছে ১ দশমিক ৮২ একর কৃষিজমি ও ১৬ শতক অকৃষিজমি, যা পৈতৃক সূত্রে পাওয়া বলে উল্লেখ করেছেন।
সাত বছর আগে তার বার্ষিক আয় ছিল ৩ লাখ ৪ হাজার টাকা, বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে ৪ লাখ ২০ হাজার টাকা। সে সময় তার ১২ লাখ টাকা ব্যাংক ঋণ থাকলেও বর্তমানে তিনি সম্পূর্ণ ঋণমুক্ত।
২০১৮ সালে তার স্ত্রীর নামে ১২ ভরি স্বর্ণালংকারের তথ্য থাকলেও সর্বশেষ হলফনামায় তা দেখানো হয়নি। তবে এবার তার নিজের নামে ১২ ভরি স্বর্ণালংকারের তথ্য উল্লেখ করেছেন। তার বিরুদ্ধে বর্তমানে তিনটি ফৌজদারি মামলা চলমান এবং তিনি আগে ৩১টি মামলা থেকে খালাস পেয়েছেন।
হলফনামা অনুযায়ী, তার কাছে নগদ অর্থ রয়েছে ৬ লাখ ৩২ হাজার ৫৮৮ টাকা এবং তার স্ত্রীর কাছে রয়েছে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। তার নামে ১১ লাখ ৪০ হাজার টাকার বন্ড ও শেয়ার রয়েছে। ৪২ হাজার টাকার ইলেকট্রনিক সামগ্রীসহ উপহারসূত্রে পাওয়া আসবাবপত্রের তথ্যও উল্লেখ রয়েছে।
তার নামে ১২ শতক অকৃষিজমি রয়েছে, যার অর্জনকালীন মূল্য ৯ লাখ ২৯ হাজার টাকা। তার স্ত্রীর নামে রয়েছে ৬ শতক অকৃষিজমি, যার মূল্য ৬০ হাজার টাকা। পৈতৃক সূত্রে পাওয়া ১ একর ৮২ শতক কৃষিজমি ও ১৭ শতক অকৃষিজমির তথ্যও হলফনামায় রয়েছে। তার একটি তিন কক্ষবিশিষ্ট পাকা টিনসেট ঘর রয়েছে। স্থাবর সম্পত্তির অর্জনকালীন ও বর্তমান মূল্য একই দেখানো হয়েছে।
সর্বশেষ আয়কর রিটার্নে তার মোট স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ১৯ লাখ ১৮ হাজার ২৫০ টাকা। তিনি আয়কর প্রদান করেছেন ৪ হাজার টাকা।
হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা যায়, সম্পদের পরিমাণে এগিয়ে রয়েছেন বিএনপির প্রার্থী মনিরুল হাসান বাপ্পী, আর শিক্ষাগত যোগ্যতায় এগিয়ে জামায়াত প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ। আগ্নেয়াস্ত্রের মালিকানার ক্ষেত্রেও দুই প্রার্থীর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে— বাপ্পীর কাছে আগ্নেয়াস্ত্র থাকলেও কালামের নেই।
এমএইচএস

