তিস্তা চুক্তির কাজ শুরু না হওয়ায় ক্ষুব্ধ নদীপাড়ের মানুষ
লালমনিরহাট প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২২ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:২৩
ছবি : বাংলাদেশের খবর
তিস্তা নদীর ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল প্রায় দুই কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা। অথচ বছরের পর বছর তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হওয়ায় চরম দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছেন নদীপাড়ের মানুষ। প্রতি বছর নদীভাঙনে ফসলি জমি ও বসতবাড়ি হারিয়ে হাজার হাজার পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে।
তিস্তা তীরবর্তী অসংখ্য গ্রাম ও চরাঞ্চলের মানুষ কৃষিকাজ, সেচ ও মৎস্য আহরণের জন্য পুরোপুরি এই নদীর ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু উজানে পানি প্রত্যাহার এবং পরিকল্পনাহীন ব্যবস্থাপনার কারণে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা রূপ নেয় মরা নদীতে। ফলে পানিসংকট, নদীভাঙন ও জীবিকার সংকট দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করছে।
জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসেই তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ শুরুর কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তত্ত্বাবধানে কাজ শুরু হওয়ার আশায় ছিলেন নদীপাড়ের মানুষ। তবে সম্প্রতি তিস্তা নদী পরিদর্শনে এসে জলবায়ু ও পানি সম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান চলতি মাসে তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু হচ্ছে না বলে জানালে সেই আশায় বড় ধরনের ভাটা পড়ে।
এই খবরে হতাশা ও ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন তিস্তা পাড়ের মানুষ। তাদের অভিযোগ, শুষ্ক মৌসুমে ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের কারণে নদীভাঙন কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। এতে কৃষিকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, সেচ সংকটে পড়ছে ফসলের মাঠ এবং মৎস্য আহরণে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ছেন জেলেরা।

দীর্ঘদিন ধরে পানিসংকট, নদীভাঙন ও কৃষি বিপর্যয়ে জর্জরিত উত্তরাঞ্চলের মানুষের কাছে তিস্তা মহাপরিকল্পনা ছিল শেষ আশার প্রতীক। কিন্তু বাস্তব অগ্রগতি না থাকায় সেই আশা এখন গভীর হতাশায় পরিণত হয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘ ৫৫ বছরেও তিস্তা নদীতে কোনো বড় ধরনের ড্রেজিং বা খননকাজ হয়নি। ফলে ধীরে ধীরে ভরাট হয়ে নদী তার স্বাভাবিক গতিপথ হারিয়েছে। বর্তমানে তিস্তা অসংখ্য শাখা নদীতে বিভক্ত। বছরে মাত্র ছয় মাস মূল নদীতে নৌকা চলাচল সম্ভব হলেও বাকি সময় চরাঞ্চলের মানুষকে পায়ে হেঁটে নদী পার হতে হয়।

নদীর বাম তীর রক্ষা কমিটির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, তিস্তা ব্যারাজ নির্মাণের পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৬০ হাজার পরিবার ভিটেমাটি হারিয়েছে। নদীভাঙনে বিলীন হয়েছে দুই লাখ ২০ হাজার হেক্টর জমি। শুধু লালমনিরহাট জেলার ১৩টি ইউনিয়ন প্রতি বছর ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

নদীপাড়ের মানুষ মনে করেন, সরকার দ্রুত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করলে তিস্তা ফিরে পাবে তার হারানো যৌবন। বাড়বে কৃষি উৎপাদন, নিশ্চিত হবে মানুষের জীবিকা, আসবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং রক্ষা পাবে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য।

তবে তিস্তা পাড়ের মানুষের এখন একটাই দাবি— আর কোনো রাজনীতি নয়। তারা দ্রুত দৃশ্যমান কাজ দেখতে চান, যাতে দীর্ঘদিনের দুঃখ-দুর্দশার অবসান ঘটে।
এমএইচএস

