‘ফাঁসির মঞ্চ’ থেকে ফিরে ছোট ভাই টুকুকে নিয়ে সংসদে সালাম পিন্টু
রেজাউল করিম, টাঙ্গাইল
প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৭:৩৯
ছবি : বাংলাদেশের খবর
প্রায় ১৭ বছর কারাভোগের পর ফাঁসির মঞ্চ থেকে মুক্তি পেয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে সংসদ সদস্য হয়েছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু। একই সঙ্গে তার ছোট ভাই বিএনপির প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকুও নির্বাচিত হয়েছেন।
টাঙ্গাইল-২ (ভূঞাপুর-গোপালপুর) আসনে ধানের শীষ প্রতীকে অংশ নিয়ে আবদুস সালাম পিন্টু ১ লাখ ৯৪ হাজার ৩৫৮ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর হুমায়ুন কবির পান ৫৭ হাজার ৫১৬ ভোট।
অপরদিকে টাঙ্গাইল-৫ (সদর) আসনে ছোট ভাই সুলতান সালাউদ্দিন টুকু ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ২৯ হাজার ৯৪৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আহসান হাবিব মাসুদ পান ৭৮ হাজার ৫১৫ ভোট। একই পরিবারের দুই সদস্য এবারের নির্বাচনে জনমতের পরীক্ষা দিয়ে সংসদে যাচ্ছেন।
সালাম পিন্টুর বিরুদ্ধে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় বাতিল হওয়ায় তিনি মুক্তি পান। ওই মামলায় তার ফাঁসির দণ্ড হয়েছিল। সম্পূরক অভিযোগপত্রের ভিত্তিতে বিচারিক আদালতের এই রায় অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করে হাইকোর্ট। বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে ডেথ রেফারেন্স নাকচ করে এবং আসামিদের আপিল মঞ্জুর করে ২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর এ রায় দেওয়া হয়।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জিয়া পরিবারের পাশাপাশি দেশব্যাপী বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা হয়রানি ও গায়েবি মামলার শিকার হন। টাঙ্গাইলেও বিএনপি নেতাকর্মীরা নিপীড়নের শিকার হন। জেলায় সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত ও হয়রানির শিকার হতে হয় সালাম পিন্টু-টুকু পরিবারের সদস্যদের।
রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক উপমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আবদুস সালাম পিন্টু। ২০০৮ সালের জানুয়ারিতে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় গ্রেপ্তারের পর থেকে তিনি কারাগারে ছিলেন।
২০২৩ সালের ১৩ আগস্ট আবদুস সালাম পিন্টু ও সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর মা সালমা বেগম চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকার একটি হাসপাতালে মারা যান। তখন টুকু বলেন, 'মৃত মাকে শেষবার দেখার জন্য প্যারোলে মুক্তি মিললেও আমার বড় ভাই আবদুস সালাম পিন্টুকে আসতে দেওয়া হয়নি। এই নির্যাতন-নিপীড়ন কখনোই ভালো পথ দেখায় না। এলাকার একজন জনপ্রতিনিধি ছিলেন আমার ভাই। সবাই তাকে ভালো মানুষ হিসেবে চেনেন। আমার ভাই তার মায়ের মরা মুখটা দেখতে পারবে না, এটা কি হতে পারে!'
সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বিএনপির বর্তমান প্রচার সম্পাদক। তিনি কেন্দ্রীয় ছাত্রদল ও যুবদলের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনিও অসংখ্যবার কারাভোগ করেছেন। ২০০৯ সালের ১ জুলাই তাকে ছাত্রদলের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ছাত্রদলের সভাপতি টুকুর নেতৃত্বে ২০১০ সালের ১৯ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির সাথে নবগঠিত কমিটি সাক্ষাৎ করতে গেলে ছাত্রলীগ টুকুর ওপর হামলা চালায়। রক্তে রঞ্জিত হয় ঢাবি ক্যাম্পাস। মুমূর্ষু টুকুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর থেকে টুকুর বিরুদ্ধে হামলার মামলা লেগেই থাকে।
আরেক ভাই শামছুল আলম তোফা। তিনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের নির্বাচিত জিএস ছিলেন। পরবর্তীতে টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আন্দোলন-সংগ্রামে সবসময় রাজপথে থাকতেন। তার নামেও অসংখ্য মামলা হয়।
নির্বাচনী এলাকায় সালাম পিন্টু-টুকুদের বাসা ও সম্পত্তিতে তাণ্ডব চালানোর অভিযোগ রয়েছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। এছাড়া গ্রেনেড হামলা মামলায় আসামি হওয়ায় তাকে রাজনৈতিক অঙ্গনে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে জেলা আওয়ামী লীগ। তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয় দলটি।
আবদুস সালাম পিন্টু টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৯১ ও ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে টাঙ্গাইল-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার গঠনের পর তিনি শিক্ষা উপমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।
২০১৯ সালের ১৬ মে আবদুস সালাম পিন্টুর বিরুদ্ধে টাঙ্গাইলের আদালতে গরু চুরিসহ লুটপাটের মামলা হয়। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন ভূঞাপুর উপজেলার ভদ্রশিমুল গ্রামের এক আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িতে ঢুকে ভাঙচুর, চুরি ও মারপিটের অভিযোগ আনা হয় পিন্টুসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে। এভাবে অসংখ্য মামলা দিয়ে হয়রানি, রাজনৈতিক ও পারিবারিকভাবে হেনস্তাসহ নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হন পিন্টু।
আবদুস সালাম পিন্টু টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার গুলিপেচা গ্রামের ডা. মরহুম মহিউদ্দিন মিয়ার জ্যেষ্ঠ সন্তান। ডা. মহিউদ্দিন এলাকায় 'মহু ডাক্তার' নামে পরিচিত ছিলেন। ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি কাদেরিয়া বাহিনীর আঙ্গুর কোম্পানি, হাকিম কোম্পানি, ভোলা কোম্পানি ও আরজু কোম্পানির সব সদস্যকে বিনামূল্যে চিকিৎসা দেন।
সিরাজকান্দির চরে যমুনা নদীতে পাকবাহিনীর ভারী যুদ্ধাস্ত্র বহনকারী একটি জাহাজ মুক্তিবাহিনী ডুবিয়ে দেয়। ওই সময় এটি ছিল আলোড়ন সৃষ্টিকারী এক ঘটনা। রাতারাতি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে কাদের সিদ্দিকীকে 'বাঘা সিদ্দিকী' উপাধি দিয়ে সংবাদ প্রচার করা হয়। এই খবরে গোটা দেশবাসী উৎফুল্ল হয়ে ওঠে। মুক্তিযোদ্ধাদের মতে, ভারী সমরাস্ত্র বোঝাই ওই জাহাজটি উত্তরবঙ্গ সীমান্তে পৌঁছতে পারলে মুক্তিযুদ্ধে জয়লাভ অনেকটা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ত।
জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার সঙ্গে জড়িত মুক্তিযোদ্ধারাও এসে মহু ডাক্তারের বাড়িতে আশ্রয় নেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন ছিলেন টাইফয়েডে আক্রান্ত। মহু ডাক্তার তাদের সবাইকে বিনামূল্যে চিকিৎসা করেন।
মহু ডাক্তারের বড় ছেলে আবদুস সালাম পিন্টু। ১৯৭১ সালে পাকবাহিনী যেদিন প্রথম ঢাকা থেকে টাঙ্গাইল মার্চ করে, সেদিন নাটিয়াপাড়া ব্রিজে পিন্টুর নেতৃত্বে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়। সেখানে কিছু সময় যুদ্ধ চলার পর পাকবাহিনীর আক্রমণে টিকতে না পেরে প্রতিরোধকারীরা পিছু হটতে বাধ্য হন। পরে পিন্টু বাড়ি ফেরার সময় পাকুটিয়া এলাকায় দুর্ঘটনার কবলে পড়েন। তাকে বহনকারী গাড়ি পুকুরে পড়ে যায়। এতে তিনি গুরুতর আহত হয়ে দীর্ঘদিন বাড়িতে চিকিৎসা নেন।
স্বাধীনতার পর তিনি আইন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে টাঙ্গাইলে আয়কর আইনজীবী হিসেবে প্র্যাকটিস শুরু করেন। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিএনপি গঠন করলে তিনি টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। সেই থেকে তিনি বিএনপিতেই আছেন। তিনি টাঙ্গাইল-২ আসন থেকে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বর্তমানে তিনি শেখ হাসিনার সমাবেশে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে দায়েরকৃত গ্রেনেড হামলা মামলার আসামি হিসেবে ১৭ বছর কারাগারে ছিলেন। এই পরিবারের আরো দুই ভাই মাওলানা তাজ ও বাবু। তাদের নামেও গ্রেনেড হামলার মিথ্যা মামলা রয়েছে।
মুক্তি পাওয়ার পর একাধিক সভায় সালাম পিন্টু কারাগারে তার ওপর নির্যাতনের বিষয়টি বর্ণনা করেন। সুলতান সালাউদ্দিন টুকু তাকে ও তার পরিবারের সদস্যদের হয়রানি ও নির্যাতনের কথা বিভিন্ন সভায় তুলে ধরেন। এবারের জয়ের পর বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতৃবৃন্দ, সমর্থকসহ সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, নতুন মন্ত্রিসভায় স্থান পাবে নির্যাতিত এই পরিবারের দুই ভাই।
টাঙ্গাইল জেলা যুবদলের সাবেক আহ্বায়ক আশরাফ পাহেলী বলেন, 'জিয়া পরিবারের পর সারা দেশের নেতাকর্মীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন সালাম পিন্টু-টুকুদের পরিবার। ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে নানাভাবে তাদের নিপীড়ন করা হয়েছে। বারবার তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সামাজিক, অর্থনৈতিকভাবে তাদের নির্যাতন করা হয়েছে। পিন্টু সাজানো মিথ্যা মামলায় কারাভোগ করেছেন।'
এআরএস

