চাঁদপুরে ২৫ প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত
আলআমিন ভূঁইয়া, চাঁদপুর
প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৭:৪৩
ছবি : বাংলাদেশের খবর
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চাঁদপুরের পাঁচটি সংসদীয় আসনে অংশ নেওয়া ৩৬ প্রার্থীর মধ্যে ২৫ জনেরই জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন নারী প্রার্থী রয়েছেন।
নির্বাচন কমিশনের বিধান অনুযায়ী, কোনো প্রার্থী মোট বৈধ ভোটের আট ভাগের এক ভাগের কম, অর্থাৎ ১২ দশমিক ৫ শতাংশের কম ভোট পেলে তার জামানত বাজেয়াপ্ত হয়।
ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২৫ প্রার্থীই এই সীমা অতিক্রম করতে পারেননি। তাদের মধ্যে কেউ কেউ এক হাজার ভোটও পেতে পারেননি।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের চার প্রার্থী ও ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের সেক্রেটারি জেনারেল সৈয়দ মোহাম্মদ মাহাদুর শাহ জামানত হারিয়েছেন।
একসময়ের প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল জাতীয় পার্টি চারটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মাত্র ৩ হাজার ৭৪৬ ভোট পেয়েছে। অপরদিকে গণফোরাম তিনটি আসনে মোট ভোট পেয়েছে ৮৭৬টি।
নির্বাচন কমিশনের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চাঁদপুর জেলায় মোট ভোটারের সংখ্যা ২৩ লাখ ৩১ হাজার ১৯৫ জন। এবারের নির্বোটে ভোট পড়েছে ৫৩ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ।
জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট গঠন নিয়ে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের মধ্যে থাকা ইসলামী আন্দোলন চারটি আসনে পেয়েছে ৩৮ হাজার ৬৩০ ভোট। অপরদিকে ২০০৪ সালে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়া বাংলাদেশ ইসলামিক ফ্রন্ট 'মোমবাতি' প্রতীক নিয়ে তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পেয়েছে ৭ হাজার ১৫৪ ভোট। এই দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ মোহাম্মদ বাহাদুর শাহ 'চেয়ার' প্রতীক নিয়ে চাঁদপুর-৫ আসনে পেয়েছেন ১৩ হাজার ১৭৮ ভোট। তিনিও জামানত হারিয়েছেন।
জামানত হারানো অন্যান্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন—গণঅধিকার পরিষদের 'ট্রাক' প্রতীকের তিন প্রার্থী মো. জাকির হোসেন, মো. এনায়েত হোসেন ও মো. গোলাপ হোসেন। এ ছাড়া স্বতন্ত্র 'ঘুড়ি' প্রতীকের জাকির হোসেন, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) 'কাস্তে' প্রতীকের মো. জাহাঙ্গীর হোসেন, স্বতন্ত্র 'ফুটবল' প্রতীকের জাকির হোসেন প্রধানিয়া, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের 'আপেল' প্রতীকের মো. মাহমুদুল হাসান নয়ন, বাংলাদেশ লেবার পার্টির 'আনারস' প্রতীকের নাসিমা নাজনিন সরকার, বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির 'হাতি' প্রতীকের মো. ফয়জুন্নূর ও নাগরিক ঐক্যের 'কেটলি' প্রতীকের মো. এনামুল হক।
আসনভিত্তিক ফলাফল
চাঁদপুর-১ (কচুয়া) : এই আসনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) 'ধানের শীষ' প্রতীকের প্রার্থী আ ন ম এহছানুল হক মিলন ১ লাখ ৩ হাজার ৩২ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আবু নছর মোহাম্মদ মকবুল আহমেদ পেয়েছেন ৭০ হাজার ৩৬৮ ভোট। এ আসনে জামানত হারানো প্রার্থীরা হলেন—গণফোরামের মোহাম্মদ আজাদ হোসেন (৩২৯ ভোট), বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন (৪ হাজার ৩৭১ ভোট), গণঅধিকার পরিষদের মো. এনায়েত হোসেন (২১৭ ভোট) ও জাতীয় পার্টির হাবিব খান (৬৫২ ভোট)।
চাঁদপুর-২ (মতলব উত্তর ও মতলব দক্ষিণ) : এই আসনে বিএনপির ‘ধানের শীষ’ প্রতীকের প্রার্থী মো. জালাল উদ্দিন ১ লাখ ৭২ হাজার ৫০৬ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) 'ছাতা' প্রতীকের প্রার্থী মো. বিল্লাল হোসেন পেয়েছেন ৫৭ হাজার ৪৭৩ ভোট। এ আসনে জামানত হারানো প্রার্থীরা হলেন—বাংলাদেশ লেবার পার্টির নাসিমা নাজনিন সরকার (২৮৩ ভোট), বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির মো. ফয়জুন্নূর (৫০৯ ভোট), গণঅধিকার পরিষদের মো. গোলাপ হোসেন (৩১৫ ভোট), নাগরিক ঐক্যের মো. এনামুল হক (১৪৩ ভোট), ইসলামী আন্দোলনের মানসুর (১২ হাজার ৩০৭ ভোট) ও জাতীয় পার্টির এমরান হোসেন মিয়া (১ হাজার ৩২৮ ভোট)।
চাঁদপুর-৩ (সদর ও হাইমচর) : এই আসনে বিএনপির 'ধানের শীষ' প্রতীকের প্রার্থী শেখ ফরিদ আহমেদ ১ লাখ ৬৫ হাজার ৪০৪ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর 'দাঁড়িপাল্লা' প্রতীকের প্রার্থী মো. শাহজাহান মিয়া পেয়েছেন ১ লাখ ৮৬৫ ভোট। এ আসনে জামানত হারানো প্রার্থীরা হলেন—বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের এ এইচ এম আহসান উল্লাহ (২ হাজার ২৭৪ ভোট), ইসলামী আন্দোলনের মো. জয়নাল আবদিন শেখ (১৪ হাজার ১৮১ ভোট), গণঅধিকার পরিষদের মো. জাকির হোসেন (১৩২ ভোট), বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) মো. জাহাঙ্গীর হোসেন (৬৭৬ ভোট) ও গণফোরামের সেলিম আকবর (৩০৭ ভোট)।
চাঁদপুর-৪ (ফরিদগঞ্জ) : এই আসনে স্বতন্ত্র 'চিংড়ি' প্রতীকের প্রার্থী এম এ হান্নান ৭৪ হাজার ১৭৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির ‘ধানের শীষ’ প্রতীকের মো. হারুনুর রশিদ পেয়েছেন ৬৯ হাজার ১৫৫ ভোট। জামায়াতে ইসলামীর ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকের মো. বিল্লাল হোসেন মিয়াজী পেয়েছেন ৬৬ হাজার ৬৯২ ভোট। এ আসনে জামানত হারানো প্রার্থীরা হলেন—স্বতন্ত্র জাকির হোসেন (১৮৪ ভোট), ইসলামী আন্দোলনের মকবুল হোসাইন (৫ হাজার ২৬১ ভোট), জাতীয় পার্টির মাহমুদুর হাসান (২৭৭ ভোট), বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের মো. আবদুল মালেক (৫০৯ ভোট) ও গণফোরামের মো. মুনীর চৌধুরী (২৪০ ভোট)।
চাঁদপুর-৫ (হাজীগঞ্জ ও শাহরাস্তি) : এই আসনে বিএনপির ‘ধানের শীষ’ প্রতীকের প্রার্থী মো. মমিনুল হক ১ লাখ ৮৫ হাজার ৪০৪ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী এলডিপির ‘ছাতা’ প্রতীকের প্রার্থী মো. নেয়ামুল বশির পেয়েছেন ৭৫ হাজার ৬৬০ ভোট। এ আসনে জামানত হারানো প্রার্থীরা হলেন—জাতীয় পার্টির মির্জা গিয়াস উদ্দিন (১ হাজার ৫১৬ ভোট), ইসলামী আন্দোলনের মোহাম্মদ আলী পাটোয়ারী (৬ হাজার ৬৮১ ভোট), স্বতন্ত্র মো. জাকির হোসেন প্রধানিয়া (২৬৮ ভোট), ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের মো. মাহমুদুল হাসান নয়ন (২৫৬ ভোট) ও ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের সৈয়দ বাহাদুর শাহ মুজাদ্দেদী (১৩ হাজার ১৭৮ ভোট)।
জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়া চাঁদপুর-৩ আসনের প্রার্থী এ এইচ এম আহসান উল্লাহ মনে করেন, জামানত হারানো প্রার্থীদের নিজ নিজ দলের তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক দুর্বলতা থাকায় তারা নির্বাচনে ভালো করতে পারেননি। তিনি বলেন, 'সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও সক্রিয় করা প্রয়োজন।'
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) চাঁদপুর জেলা শাখার সভাপতি অধ্যক্ষ মোশারেফ হোসেন বলেন, 'অনেকেই নিজেদের পরিচিতি তৈরির লক্ষ্যে নির্বাচনে অংশ নেন। আবার নির্বাচন কমিশনের শর্ত পূরণ ও দলকে টিকিয়ে রাখতেও ছোট দলগুলো নিয়মরক্ষার প্রার্থী দেয়। এই সব দলের কাছে জয়–পরাজয় বা জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়া মুখ্য বিষয় নয়।'
এআরএস

