‘মায়ের কথা ধরে বাবা আমাকে মারে, তবে তা ব্যাপার না’ লিখে কলেজছাত্রীর আত্মহত্যা
ডিজিটাল ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২১:০৬
আতিয়া ইবনাত চৌধুরী জয়িতা। ছবি : সংগৃহীত
‘পৃথিবী আমার জন্য নিরাপদ নয়। আমার থেকে চুরি করে কিছু খেতে হবে না। আমি মোবাইল নিলে বকা দিতে হবে না। আমার ভাগের খাবারগুলো তোমরা খাও। আমার ধর্ম পবিত্র, তোমাদের ধর্ম অপবিত্র। আমার টাকাগুলো তোমাদের রুহতে থাক। আমি কাউকে ভুলে যাই না। আমাকে বাঁচতে দাও। আমার বিড়াল কষ্ট পাবে, বাঁচবে না, তো আমিও মরব। সৃষ্টিকর্তা আমার পাশে থাকুন, আমাকে ক্ষমা করুন।’ এভাবেই একাধিক চিরকুটে নানা অভিযোগ করে শোয়ার ঘরে থাকা গাছের সঙ্গে ঝুলে আতিয়া ইবনাত চৌধুরী জয়িতা (১৭) নামে এক কলেজ ছাত্রীর আত্মহত্যার খবর পাওয়া গেছে।
তবে, তার মায়ের অভিযোগ, মেয়েকে সৎ মা ও বাবা পিটিয়ে হত্যা করে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। শনিবার বিকেলে চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার বাজালিয়া ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর বাজালিয়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। জয়িতা সাতকানিয়া সরকারি কলেজের মানবিক বিভাগের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী।
ওই দিন রাত ১০টার দিকে সাতকানিয়া থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) সুদীপ্ত রেজার উপস্থিতিতে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে মরদেহ থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। রোববার সকালে জয়িতার মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে বলে থানা পুলিশ জানিয়েছে। ঘটনার দিন রাতেই চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাতকানিয়া সার্কেল) মো. আরিফুল ইসলাম সিদ্দিকী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, জয়িতা উত্তর বাজালিয়া গ্রামের আবু বোরহান মো. জাহাঙ্গীর চৌধুরীর মেয়ে। তার মায়ের নাম জান্নাতুল ফেরদৌসী। ২০১৮ সালে তার মা-বাবার বিচ্ছেদ হয়। তখন জয়িতা চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী। এরপর থেকে তিনি লোহাগাড়া উপজেলার আমিরাবাদ এলাকায় তার মায়ের সঙ্গে বসবাস শুরু করেন। ২০২৪ সালে তিনি এসএসসি পাস করেন। তবে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে বাবা তাকে তার বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে তার সৎমা সাকিলা সুলতানা পুষ্প, এক শিশু সৎবোনসহ একসঙ্গে থাকতেন তারা।
জয়িতার শয়ন কক্ষের একটি ব্যাগ ও সার্টিফিকেটের ফাইল থেকে মা-বাবার প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখা একাধিক চিরকুট উদ্ধার করা হয়। চিঠিগুলো দেখে ধারণা করা হচ্ছে, সেগুলো বেশ কিছুদিন আগে লিখেছিল জয়িতা। তবে সম্প্রতি লেখা কিছু চিঠিও সেখান থেকে উদ্ধার করা হয়।
উদ্ধার চিরকুটগুলোতে জয়িতা লিখেন, ‘মা-বাবার বিচ্ছেদের কিছুদিন পর থেকে আমার মায়ের আমার প্রতি অসন্তুষ্টি দেখা দেয়। এর মধ্যে প্রধান হলো অশ্লীল গালাগালি ও মারধর। ঘরের অধিকাংশ কাজ সেরে বসে থাকলেও অসন্তুষ্টি। কোনো ছোটখাটো দোষেই বাবাকে নিয়ে, পরপুরুষ নিয়ে আমার নামে খারাপ কথা বলে এবং আমাকে গালাগালি করে। উঠতে বসতে শুধু অশ্লীল কথা। বাবাকে যদি এসব কথা বলি বাবা বিশ্বাস করে না। কেননা এসব কথা বিশ্বাসযোগ্য নয়। সেজন্য মায়ের যেসব অশ্লীল গালিগালাজ আমি দুই বছর ধরে রেকর্ডিং করতে থাকি।’
তিনি আরও লিখেন, ‘রেকর্ডিংয়ের ব্যাপারটি জানার পর মেমোরি কার্ড নিয়ে ফেলে এবং আমার ভাই ও মা মোবাইল ভেঙে ফেলে। তারপর থেকে এসব অশ্লীল গালিগালাজ আমি রেকর্ডিংয়ের বদলে খাতায় লিখতে থাকি। তখন মা সবাইকে জানিয়ে দেয়, আমি ছেলেদের সঙ্গে কথা বলছি তাই মোবাইল ভেঙেছে। অবশেষে একদিন লুকাতে না পারা খাতাগুলো পায় এবং পুড়িয়ে ফেলে। এছাড়া গালিগালাজ ও মারধর করে। তার প্রত্যেক গালিগালাজ ছিল ধর্মবিরোধী।’
জয়িতা চিরকুটে লিখেন, ‘একদিন সকালে অসুস্থবোধ করায় উঠতে না চাওয়ায় মা আমাকে জোর করে ইচ্ছামতো কাজ করায়। আমাকে বলে আমি মায়ের কামাই খাচ্ছি। মায়ের স্বামীর ভাগ খুঁজছি। সেই সাথে সে বাবাকে দিয়ে ধর্ষণের হুমকিও দেয়। এসব কথা আমি জনগণকে বলে দেব বললে, আমি হুমকি দিচ্ছি বলে আমাকে মারতে থাকে৷ কোনোদিন তার বদনাম করতে দেখিনি। তবে তিনি যে আমার সাথে এমন করে তা বান্ধবীদের বলি। তিনি তা আচঁ করতে পারেন এবং অপবাদ দেন আমি প্রেম করি। সেটা পাড়া-প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজন সবাইকে বলে। আমি যদি প্রেম করতাম তাহলে আইনের সাহায্য তো চাইতাম না।’
অপর একটি চিঠিতে বাবার কাছে কেন যাচ্ছি না শিরোনামে জয়িতা লিখেন, ‘মা আমার বাবাকে আমার নামে যা বলে তা বাবা শোনে। তবে আমি কিছু বলতে চাইলে কখনও কখনও মারধর করে কিছু বলতে দেয় না। বাবাকে একবার আমি লজ্জা ভেঙে এসব বলেছিলাম। বাবা বলে মায়ের অভিশাপ নিচ্ছিস। মায়ের কথা ধরে বাবা আমাকে মারে, তবে তা ব্যাপার না। বাবা তো এমনিই খারাপ।’
এছাড়া জয়িতা একাধিক পৃষ্ঠায় সংক্ষিপ্ত আকারে কিছু কথা লিখে গেছেন। পৃষ্ঠাগুলো দেখে মনে হয়েছে ওই লেখাগুলো তিনি সাম্প্রতিক সময়ে লিখেছেন।
জয়িতার বাবা আবু বোরহান মো. জাহাঙ্গীর চৌধুরী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমি আসরের নামাজ পড়তে গিয়েছিলাম। এরপর আমার স্ত্রীর ফোন পেয়ে বাড়িতে এসে দেখি আমার মেয়ে মেঝেতে পড়ে আছে। তাকে সেখান থেকে উদ্ধার করে স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।’
জাহাঙ্গীর চৌধুরী বলেন, ‘আমার মেয়ে দীর্ঘদিন তার মায়ের সঙ্গে ছিল। সেখানে মায়ের অনৈতিক কাজ দেখে সে ক্ষোভ প্রকাশ করত। শুধু তাই নয়, মেয়েকে সে অনৈতিক কাজ করতে বাধ্য করত। মেয়ে এতে রাজি ছিল না। এসব সহ্য করতে না পেরে মেয়ে মায়ের ঘর থেকে পালিয়ে এক বান্ধবীর ঘরে দেড় বছর ছিল। পরে গত বছরের ১ ডিসেম্বর মেয়ের মা আমাকে ফোন করে বলে তুমি এসে তোমার মেয়েকে নিয়ে যাও। আমি বলি ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়েকে নজরবন্দি রাখো। ৫ ডিসেম্বর ভোরে গিয়ে টেক্সিযোগে মেয়েকে আমার বাড়িতে নিয়ে আসি। সে সময় তার মা’ও সঙ্গে ছিল। তবে সে কেরানিহাট টেক্সি থেকে নেমে যায়।’
জাহাঙ্গীর আরও বলেন, ‘মেয়ের মা আমার বাড়ির আশপাশে এসে অনেক সময় মেয়ের চরিত্র খারাপ বলে বদনাম করত। আমি একটা ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করতাম। যার ফলে আমার হাতে বলতে গেলে টাকা-পয়সা নাই, অভাব অনটনে চলছে সংসার। মায়ের বদনাম ও আমার অভাব সব মিলিয়ে মেয়ে সব সময় ডিপ্রেশনে ভুগত। তাই ধারণা করছি- ডিপ্রেশন থেকে মেয়ে আত্মহত্যা করেছে।’
জয়িতার সৎমা সাকিলা সুলতানা পুষ্প বলেন, ‘জয়িতা সকালে কোচিংয়ে যাওয়ার জন্য পুরানগড় এলাকার এক বান্ধবীকে কল দিয়েছিল। কিন্তু কোচিংয়ে আর যায়নি। তবে সকাল থেকে সে রুমে ছিল। হঠাৎ করে আমি তাকে ডাকতে গিয়ে দেখি সে রুমে একটি গাছের সঙ্গে ঝুলছে। পরে আমি তাকে নামিয়ে তার বাবাকে কল দিলে তিনি বাড়িতে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন। এরপর প্রতিবেশীরা এসে জড়ো হন।’
এদিকে শনিবার রাত ৯টার দিলে জয়িতার মা জান্নাতুল ফেরদৌসী লোহাগাড়া থেকে উত্তর বাজালিয়া গ্রামে গিয়ে মেয়ের মরদেহ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন। এ সময় তিনি আর্তনাদ করে তার প্রাক্তন স্বামী ও জয়িতার সৎমাকে উদ্দেশ্য করে গালিগালাজ করতে থাকেন। তিনি বলেন, ‘আমার মেয়েকে তার বাবা ও সৎ মা হত্যা করে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন।’ তিনি বলেন, আমি মেয়ে হত্যার বিচার চাই।
অতিরিক্ত সুপার মো. আরিফুল ইসলাম সিদ্দিকী বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে এটি আত্মহত্যা। ভিকটিমের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। তার শয়ন কক্ষ থেকে একটি ও সার্টিফিকেটের প্যাকেট থেকে বেশ কয়েকটি চিরকুট উদ্ধার করা হয়েছে। চিরকুটগুলো কখন লেখা হয়েছে এ বিষয়ে তদন্ত চলছে। তদন্তের মাধ্যমে এ ঘটনার মূল রহস্য বেরিয়ে আসবে।

