Logo

সারাদেশ

মেহেদি দেওয়া হাত ও আংটিতে মিলল মাথাবিহীন নারীর পরিচয়

Icon

ডিজিটাল ডেস্ক

প্রকাশ: ০৩ মার্চ ২০২৬, ২১:২১

মেহেদি দেওয়া হাত ও আংটিতে মিলল মাথাবিহীন নারীর পরিচয়

ছবি: সংগৃহীত

খুলনার কাজিবাছা নদী থেকে গত বছরের ১৯ আগস্ট মাথা ও পোশাকবিহীন এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। হাত পচে যাওয়ায় আঙুলের ছাপ দিয়ে তাঁর পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। এ ঘটনায় ২০ আগস্ট বটিয়াঘাটা থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা করে পুলিশ। আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে অজ্ঞাতপরিচয় লাশটি নগরীর গোয়ালখালী কবরস্থানে দাফন করা হয়। এরপর বিষয়টি অনেকটাই চাপা পড়ে যায়।

মরদেহ উদ্ধারের দেড় মাস পর গত ৮ অক্টোবর খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার সাজিয়াড়া গ্রামের সালেহা বেগম নামের এক নারীকে অপহরণের অভিযোগ তুলে নারী নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন তাঁর ছেলে শামীম ফকির। আদালত মামলাটি পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দেন। তদন্তের দায়িত্ব পান সংস্থাটির উপপরিদর্শক রেজোয়ান।

তদন্ত কর্মকর্তা জানান, মামলার বাদী তাঁদের বলেন, তাঁর মা ২০১৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সৌদি আরবে গৃহকর্মীর কাজ করতেন। দেশে ফিরে ২০২৪ সালে ঢাকায় আরেক বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ নেন। গত ১৯ আগস্ট থেকে তাঁর মোবাইল নম্বর বন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। প্রতিবেশী লালন গাজীর সঙ্গে তাঁর মায়ের ভালো সম্পর্ক ছিল। এ কারণে তাঁরা লালনকে সন্দেহ করেন।

পিবিআই ওই নারীর মোবাইলের কললিস্ট উদ্ধার করে। তাতে দেখা যায়, এক বছর ধরে নম্বরটি পিরোজপুরের ইন্দুরকানীতে সক্রিয় ছিল; যার সর্বশেষ অবস্থান ছিল বটিয়াঘাটার গজালিয়া গ্রামে। ওই নারীর ছবিসহ ইন্দুরকানীর চারাখালী বালুর রাস্তা এলাকায় পাঠানো হয় তাঁর ছেলেকে। স্থানীয় মুদি দোকানগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সালেহা বেগম এক বছর ধরে তাঁর স্বামীর সঙ্গে ওই এলাকার একটি বাড়িতে ভাড়া থাকতেন।

খবর পেয়ে তদন্ত কর্মকর্তা ওই ভাড়া বাড়িতে যান। সালেহা বেগম ও লালনের ছবি দেখানো হলে প্রতিবেশীরা তাঁদের শনাক্ত করেন। তাঁরা জানান, ওই নারী একাই বাড়িতে থাকতেন। ১০-১৫ দিন পরপর স্বামী পরিচয় দেওয়া ব্যক্তি সেখানে আসতেন। গত ১৯ আগস্ট তাঁরা একসঙ্গে মামাবাড়িতে বেড়াতে যান। এরপর ২৫ আগস্ট লালন একা ফিরে এসে ঘরের মালপত্র নিয়ে বাড়ি ছেড়ে দেন। মুদি দোকানের বাকি টাকাও পরিশোধ করেন।

উপপরিদর্শক রেজোয়ান বলেন, সন্দেহজনক তথ্য পেয়ে তাঁরা বটিয়াঘাটার সর্বশেষ লোকেশন খুঁজতে থাকেন। একই সঙ্গে থানায় খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, ১৯ আগস্ট রাতে নদী থেকে এক নারীর মাথাবিহীন লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় পানিতে থাকায় চেহারা বিকৃত হয়ে যায়। থানায় সংরক্ষিত ছবি দেখে পরিচয় শনাক্ত করা যাচ্ছিল না। পরে তাঁর হাতের একটি ছবি পাওয়া যায়, যেখানে মেহেদি দেওয়া এবং আংটি পরা ছিল। ওই ছবি নিয়ে ডুমুরিয়ার সাজিয়াড়া গেলে স্বজনেরা হাতটি সালেহা বেগমের বলে সন্দেহ করেন। এরপর আদালতে ডিএনএ পরীক্ষার আবেদন করা হয়। পরীক্ষায় তাঁর ছেলেদের ডিএনএ ও পুলিশের কাছে সংরক্ষিত অজ্ঞাত নারীর ডিএনএ মিল পাওয়া যায়। নিশ্চিত হওয়া যায়, অজ্ঞাত লাশটি সালেহা বেগমের। পরে বটিয়াঘাটা থানায় দায়ের করা হত্যা মামলাটি পিবিআইয়ে নেওয়া হয়। এ মামলার দায়িত্বও দেওয়া হয় রেজোয়ানকে।

এরপর সর্বশেষ লোকেশন অনুযায়ী বটিয়াঘাটার গজালিয়া গ্রামে লালনের মামাতো ভাই সিজার মোল্লার বাড়ি থেকে সালেহা বেগমের জামাকাপড় উদ্ধার করা হয়। প্রযুক্তির সহায়তায় গত ১৯ ডিসেম্বর লালন গাজীকে গ্রেপ্তার করা হয়।

আদালতে ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে লালন স্বীকার করেন, দেশে ফেরার পর সালেহা বেগমের জমানো ১৫-১৬ লাখ টাকা হাতিয়ে নিতে তিনি তাঁকে প্রেমের ফাঁদে ফেলেন। ইন্দুরকানীতে তাঁর ব্যবসা ছিল। সেখানে সালেহা বেগমকে নিয়ে ভাড়া বাসায় রাখেন। এক বছর পর সালেহা তাঁকে রেজিস্ট্রি বিয়ে করার জন্য চাপ দেন এবং বিয়ে না করলে তাঁর বাড়িতে গিয়ে উঠবেন বলে জানান। তখন লালন গাজী হত্যার পরিকল্পনা করে তাঁকে বটিয়াঘাটায় মামাতো ভাই সিজার মোল্লার বাড়িতে নিয়ে যান। ১৯ আগস্ট সিজার মোল্লার সঙ্গে মিলে সালেহা বেগমকে হত্যা করা হয়। লাশের পরিচয় গোপন করতে মাথা কেটে ফেলা ও জামাকাপড় খুলে ফেলা হয়। পরে সবকিছু নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।

তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, মামলার অন্যতম আসামি সিজার মোল্লাকে গ্রেপ্তার করা না যাওয়ায় তদন্ত আটকে ছিল। সিজার মোল্লা অত্যন্ত ধুরন্ধর হওয়ায় মোবাইল ফোন ব্যবহার করতেন না এবং নিজের পরিবারসহ এলাকার কারও সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন না। অনেক চেষ্টার পর গত ১ মার্চ রাজধানীর হাতিরঝিল থানার মগবাজার এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর স্বীকারোক্তিতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি হাঁসুয়া উদ্ধার করা হয়েছে। গত ২ মার্চ রাতে সিজার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে হত্যার পুরো ঘটনা স্বীকার করেন। তদন্ত শেষ হওয়ায় আনুষ্ঠানিকতা শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হবে।

নিহতের ছেলে শামীম ফকির বলেন, ‘মাকে তো ফেরত পাব না। হত্যাকারীদের ফাঁসি হলে কিছুটা শান্তি পাব।’

এএস/

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর