গণধর্ষণের শিকার ছাত্রীকে নিরাপত্তা দেওয়ায় গবিসাস কার্যালয়ে গকসুর ‘মব’, কার্যালয় বন্ধের হুমকি
সাভার প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৫ মার্চ ২০২৬, ২২:২১
গবিসাস কার্যালয়/ ফাইল ছবি
ঢাকার সাভারের আশুলিয়ায় গণ বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (গবিসাস) বন্ধ করে সাংবাদিকদের বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে গণ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (গকসু) নেতাদের বিরুদ্ধে। তারা, প্রশাসনের অংশ হিসেবে গবিসাস বন্ধ করা হলো বলে হুঁশিয়ারি দেন। যদিও গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্পষ্ট জানিয়ে দেন, গকসু এই ধরণের কার্যক্রমের এখতিয়ার রাখে না।
সম্প্রতি গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণধর্ষণের শিকার এক ছাত্রী ভিপির হয়রানির শিকার হয়ে সংবাদ সম্মেলন করতে এলে তাকে তুলে নিয়ে হেনস্তার চেষ্টা করে গকসু ভিপির স্ত্রী পরিচয় দেওয়া এক ছাত্রীসহ কয়েকজন। সেদিন কার্যালয়েও ভাংচুর করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ভিপির নেতৃত্বে এবার গবিসাস কার্যালয়ে এসে বন্ধের হুমকি দিল গকসুর নেতারা।
বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) বিকেলে ক্যাম্পাসের একাডেমিক ভবনের নিচতলায় গবিসাস কার্যালয়ে এসে গকসুর ভিপি ইয়াসিন আল মৃদুল দেওয়ান, জিএস রায়হান খানসহ গকসুর নেতৃবৃন্দ এসে এই নির্দেশ দেন। তবে এই বিষয়ে কোনো লিখিত নির্দেশ দিতে রাজি হননি তারা। এমনকি এই বিষয়ে ভিডিও বক্তব্যও দিতে রাজি হননি নেতৃবৃন্দ।। তাদের দাবি, গকসু প্রশাসনের অংশ হিসেবে এই নির্দেশ দিয়েছে। আর উপাচার্য আবুল হোসেন এই বিষয়ে কিছু জানেন না বলে জানান।
প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থী ও গবিসাসের সদস্যরা জানান, বেলা আড়াইটার দিকে গকসু ভিপি ইয়াসিন আল মৃদুল দেওয়ান, জিএস রায়হান খান, এজিএস সামিউল হাসানসহ গকসুর প্রায় ১৭-১৮ জন প্রতিনিধি ও ৮-১০ জন শিক্ষার্থীসহ প্রায় ২৫-৩০ জন শিক্ষার্থী গবিসাস কার্যালয়ে আসেন। সে সময় গবিসাস কার্যালয়ে গবিসাস সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকসহ চারজন সাংবাদিক কার্যালয়ে উপস্থিত ছিলেন। গকসু জিএস রায়হান খান কার্যালয়ে ঢুকে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের উদ্দেশ্যে বলেন, গবিসাসের কাজে শিক্ষার্থীরা আস্থা হারিয়েছে, সিংহভাগ শিক্ষার্থীর মতে গবিসাস অকার্যকর হয়েছে। তাই কাজ বন্ধ থাকবে। এছাড়াও ভর্তি কমে যাওয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল নেতিবাচক প্রচারণা গবিসাস করে। এসকল কারণে অধিকাংশ শিক্ষার্থীর ম্যান্ডেটে গণ বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি আজ থেকে বন্ধ ঘোষণা করা হলো। এ সময় তিনি টেবিল চাপড়ে এ কথা বলতে থাকেন।
তারা আরও জানান, এরপর পাঁচ মিনিটের মধ্যে গবিসাস সদস্যদের অফিস ত্যাগ করতে আল্টিমেটাম দেন তারা। এ সময় তাদের সঙ্গে আসা এক শিক্ষার্থী গবিসাসের একটি বৈদ্যুতিক বাতি ভাংচুর করে। এছাড়া সেখানে থাকা আইন বিভাগের শিক্ষার্থী জুবায়ের গবিসাস সদস্যদের দিকে বই ছুড়ে মারেন। একপর্যায়ে গবিসাস নেতৃত্ব তাদের জিজ্ঞেস করেন, এভাবে বন্ধ করতে পারেন কিনা। তখন তারা জবাবে বলেন, গকসু প্রশাসনের একটি অংশ, তারা এটি করতে পারেন। এ সময় মৌখিক নয়, লিখিত দেন বললে, তারা লিখিত দিতে অস্বীকৃতি জানান। এ সময় কয়েক দফায় গকসুর ক্রীড়া সম্পাদক শীতল ও দপ্তর সম্পাদক শারমিন আক্তারসহ বেশ কয়েকজন গবিসাস সাধারণ সম্পাদককে শারীরিকভাবে আক্রমণ করতে চেষ্টা করেন। এরপর গবিসাস সদস্যরা, এই বিষয়ে গকসুর সভাপতি ও উপাচার্যের সঙ্গেসহ প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে ভিপি নিজেই ভিসিকে ফোন করেন। ভিসি জানান, আজকের মতো সবাইকে চলে যেতে। পরবর্তী দিন তিনি বিষয়টি দেখবেন। এরপর প্রক্টরকে ফোন করলে তিনি এসে, রবিবার বিষয়টি নিয়ে বসা হবে বলে জানান। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর বিকেল ৪টার দিকে গকসুর প্রতিনিধিরা কক্ষ ত্যাগ করে।
অপকর্মে ভিপির নাম, হুমকিতে গবিসাস
সম্প্রতি গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে গণধর্ষণ ও ব্ল্যাকমেইলের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের চার ছাত্রকে গ্রেপ্তার করে আশুলিয়া থানা পুলিশ। গ্রেপ্তারের মধ্যে একজন গকসুর ভিপি মৃদুল দেওয়ানের ভাই অন্তু দেওয়ান।
গেল সপ্তাহে ধর্ষণের শিকার সেই ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী আশুলিয়া থানা, গবি প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করেন, ভিপি মৃদুল দেওয়ান ও তার লোকজন তাকে নিয়মিত হয়রানি করছেন।
এ ঘটনায় গত সোমবার গবিসাসে সংবাদ সম্মেলন করতে আসেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী। তৎক্ষনাৎ ভিপি মৃদুল দেওয়ানের স্ত্রী পরিচয় দেওয়া এক নারীসহ কয়েকজন গবিসাস কার্যালয়ে এসে সেই ভুক্তভোগীকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করেন। সেদিন গবিসাস কার্যালয়েও ভাংচুর করা হয়। তবে গকসু ভিপি পর দিন এসে দুঃখপ্রকাশ করেন। বিষয়টি একাধিক গণমাধ্যমে উঠে আসে।
সেদিন থেকেই গুঞ্জন ছিল গবিসাস কার্যালয়ে পুনরায় হামলার। আজ বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শেষে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস ত্যাগ করার পর গকসুর নেতৃবৃন্দ গবিসাসে এসে কার্যালয় বন্ধ করে দেন।
তারা দাবি করেন, শিক্ষার্থীদের ম্যান্ডেট নিয়ে তারা গবিসাস কার্যালয়ে বন্ধ করতে এসেছেন।
গকসুর জিএস রায়হান খান বলেন,গণ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ শিক্ষার্থীদের ভোটে নির্বাচিত সংসদ। অবশ্যই শিক্ষার্থীদের সুরে সুর মিলিয়ে কথা বলার জন্য গণ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ। গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের যতগুলো ক্লাব যতগুলো সংগঠন আছে, বা সমিতি আছে৷ তাদের অবশ্যই শিক্ষার্থী বান্ধব হতে হবে৷ যদি কোনো সংসদ, সংগঠন, সমিতি তাদের রাইট ট্রাক থেকে সরে যায় বা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয় সেই ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের মননের উপর শ্রদ্ধা রেখে আমরা সেই সংগঠনকে আপাতত স্থগিত রাখতে পারি। যেহেতু শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় আমারা শিক্ষার্থীদের সংসদ। আমরা মনে করছি যে, গবিসাস তাদের রাইট ট্রাক থেকে সরে গেছে। সাংবাদিকতা একটি মহৎ পেশা ওই জায়গাতে গবিসাস আর নেই৷ এর অনেক কারণ রয়েছে। আমার মনে হয় আমাদের একটা একটা নিয়ে রবিবার আমার সামনা সামনি বসা উচিত। সাংবাদিক সমিতির সন্মানিত সদস্যরা থাকবে আমরাও থাকবো।
অরাজনৈতিক গকসু: গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন করে রাজনৈতিক নেতৃত্ব
২০১৮ সালে সবশেষ গকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তারপর টানা সাত বছর নির্বাচন হয়নি। গকসু নির্বাচনের দাবি তুলে ধরে নিয়মিত বিরতিতে প্রায় সাত বছর যাবত টানা সংবাদ পরিবেশন করে এসেছে গবিসাস। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে গকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
নির্বাচন পরবর্তী সময়ে গকসুর জিএস রায়হান খান ও, এজিএস সামিউল হাসানকে শিবির নেতৃবৃন্দ নিজেদের প্যানেলের উল্লেখ করে পোস্ট করে। এছাড়া পরবর্তীতে এই দুই নেতা শিবিরের একাধিক কর্মসূচিতে যোগ দেন। এসব ঘটনায় সংবাদ প্রকাশ করলে এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা।
এছাড়া সম্প্রতি ভিপি মৃদুল দেওয়ান বিএনপি চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করে ছাত্রদলে যোগ দিলে এনিয়েও সংবাদ পরিবেশন করে গবিসাস। ওই ঘটনায় জিএস, এজিএস প্রতিবাদ জানিয়ে গকসুর প্যাডে বিবৃতি দিলে ‘‘রাজনীতি নিষিদ্ধ গকসু: ছাত্রদলে যোগ দেওয়া ভিপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা চান ‘শিবির সমর্থিত জিএস-এজিএস’’। এই প্রতিবেদনের জেরে গকসুর ভিপি, জিএস, এজিএসের রোষানলে পড়ে গবিসাস সদস্যরা।
উল্লেখ্য, গকসুর গঠনতন্ত্রের ১৭.১ (খ) ধারা অনুযায়ী, কোনো রাজনৈতিক সংগঠনে যোগ দিলে অথবা ওই সংগঠনের কোনো পদে নির্বাচিত বা মনোনীত হলে তার সদস্যপদ বাতিল হবে। এছাড়া ১১ ধারায় বলা হয়েছে, দলীয় রাজনীতিতে সাথে জড়িত প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছাত্র গণ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের নির্বাহী কমিটির যে কোনো পদে নির্বাচনের অযোগ্য হইবেন। আর গঠনতন্ত্রের ১ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, গকসু একটি অরাজনৈতিক ছাত্র সংসদ, যা কোনো দলীয় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত হবে না।
তবে এসব ঘটনায় গণ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।
প্রসঙ্গত, গকসু নির্বাচনে ভোট ছিল ৪ হাজার ৭৬১ জনের। এরমধ্যে প্রায় এক সপ্তমাংশেরও কম ছয় শতাধিক ভোট পেয়ে ভিপি হন মৃদুল দেওয়ান। আর এক চতুর্থাংশের কম এগারোশ ভোট পেয়ে জিএস হন রায়হান খান।
এমন কাজের এখতিয়ার নেই গকসুর, ট্রাস্টি বোর্ড সদস্য
এদিকে এমন ঘটনার এখতিয়ার নেই গকসু সদস্যদের বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।
তিনি বলেন, এ ধরণের কোনো কার্যক্রম পরিচালনার এখতিয়ার গকসু রাখে না।
তবে ক্যাম্পাসে না থাকায় বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করেননি গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আবুল হোসেন। তিনি বলেন, এ বিষয়ে তিনি জেনেছেন। তবে তিনি ক্যাম্পাসে না থাকায় তিনি কোনো বিষয়ে মন্তব্য করেননি তিনি।
এদিকে সাংবাদিক সমিতি বন্ধের ঘটনাকে গণমাধ্যমের ওপর হামলা হিসেবে উল্লেখ করে বিচারহীনতার কারণেই ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীলতার সৃষ্টি হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন গণ বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক তাহমিদ হাসান।
তিনি বলেন, গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্নদ্রষ্টা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর তৈরি করা নিয়ম অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের স্বার্থে গবিসাস কাজ করে। সম্প্রতি বিভিন্ন নিউজের পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্ট হুমকির পর আজ অবৈধভাবে নিজেদের প্রশাসনের অংশ দাবি করে গবিসাস বন্ধের নির্দেশ দেয় গকসু প্রতিনিধিরা। এটি গণমাধ্যমের ওপরও এক ধরনের হুমকি। ছাত্র প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতে গকসুর দাবিতে আমরা প্রতিবেদন করেছি। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের এমন আচরণ দুঃখজনক। ভাংচুর ও এমন বাকস্বাধীনতা বিরোধীদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানাই।
উল্লেখ্য, ২০১৩ সালে দেশের প্রথম বেসরকারি বিশ্বিবদ্যালয়ে সাংবাদিক সংগঠন হিসেবে যাত্রা শুরু করে গবিসাস।
এএস/

