গোপালগঞ্জে হদিস নেই পানির বিলের ২৪ লাখ টাকার
গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ২০:৫৩
গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার পাটগাতী ইউনিয়নের গওহরডাঙ্গা সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টে ভয়াবহ অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের অর্থ সরকারি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হওয়ার নিয়ম থাকলেও সিংহভাগ টাকাই চলে যাচ্ছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলীর পকেটে। ফলে একদিকে যেমন সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে চাহিদার চেয়ে অতিরিক্ত সংযোগ দেওয়ায় তীব্র পানি সংকটে ভুগছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
এলাকার মানুষের মধ্যে সুপেয় পানি সরবরাহের
কথা মাথায় রেখে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করে গওহরডাঙ্গা
সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট। ২০২৪ সালের জুন মাসে নির্মাণ কাজ শেষ হলেও আনুষ্ঠানিক
পানি সরবরাহ শুরু হয় ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাস থেকে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, পানির
প্ল্যান্ট চালু হওয়ার পর প্রথম দুই বছর এর রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার সব ব্যয় বহন
করবে নির্মাণকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। গ্রাহকদের মাসিক বিল জমা হওয়ার কথা পাটগাতী
ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের যৌথ ব্যাংক অ্যাকাউন্টে।
দুই বছর পর ইউনিয়ন পরিষদের কাছে হস্তান্তরের পর এই জমানো টাকা দিয়েই প্ল্যান্টের
স্থায়ী রক্ষণাবেক্ষণ করার বিধান রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বর্তমানে প্ল্যান্টটির
আওতায় প্রায় ৯০০ জন গ্রাহক রয়েছেন। এর মধ্যে মাত্র ৮০ থেকে ১০০ জন গ্রাহক পাটগাতী
বেসিক ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে সরাসরি বিল জমা দেন। বাকি অন্তত ৮০০ গ্রাহকের টাকা নেওয়া
হচ্ছে সরাসরি নগদ আকারে প্ল্যান্টের মাধ্যমে। গত ১৪ মাসে এই বাবদ প্রায় ৩০ লাখ টাকা
জমা হওয়ার কথা থাকলেও ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা আছে মাত্র ৬ লাখ টাকা। বাকি ২৪ লাখ টাকার
কোনো হদিস মিলছে না। অভিযোগের তীর টুঙ্গিপাড়া উপ-সহকারী প্রকৌশলী প্রদীপ মজুমদার এবং
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দিকে। তাদের যোগসাজশেই এই বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে
বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
পাটগাতি ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের সদস্য
মোহাম্মদ রঞ্জু খান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "প্রকল্পের শুরু থেকেই আমরা নানা অনিয়ম
দেখছি। তারা কতজন গ্রাহককে সংযোগ দিয়েছে তার কোনো সঠিক হিসাব আমাদের দেয় না। ৬০০
গ্রাহকের কথা বললেও বাস্তবে সংযোগ অনেক বেশি। গ্রাহকরা যখন বিল দেয়, সেই টাকা ব্যাংকে
জমা না দিয়ে সরাসরি হাতে নেওয়া হচ্ছে। আমি যখন তাদের কাছে হিসাব চাইলাম যে, টাকা
কেন ব্যাংকে যাচ্ছে না, তারা কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি। এছাড়া পানিতে সঠিক মাত্রায়
ওষুধ মেশানো হচ্ছে না এবং ঘোলাটে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে।
গ্রাহক মুরছালিন শেখ জানান, "আমরা
নিয়মিত বিল পরিশোধ করছি, কিন্তু সেবা পাচ্ছি না। আগে প্রতিদিন পানি পেতাম, এখন একদিন
পর পর পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে আমাদের দৈনন্দিন কাজ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।"
গ্রাহক আলেয়া বেগম বলেন, "পানি ছাড়ার কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। আমরা খুব বিপদে
আছি। আমাদের পানি জমিয়ে রাখার মতো বড় ড্রাম নেই। একদিন পর পর পানি দিলে আমরা খাবো
কী আর কাজ করবো কী করে? এই দুর্ভোগের শেষ চাই।" পানির বিল কখনও ব্যাংকে কখনো প্লান্টে
জমা দেন বলেও জানান তারা।
গ্রাহকদের অভিযোগ, একদিন পর পর পানি সরবরাহ
করার ফলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ বিল প্রতি মাসে প্রায় ১ লাখ টাকা কম আসছে।
সাশ্রয় হওয়া এই টাকার ভাগও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিজেদের মধ্যে
ভাগবাটোয়ারা করে নিচ্ছেন। ক্ষমতার অপব্যবহার করে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত সংযোগ দেওয়ায়
এখন প্রতিটি পরিবারকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
পাটগাতী ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান
সুভাষ বিশ্বাস বলেন, "চুক্তি অনুযায়ী দুই বছর পর্যন্ত রক্ষণাবেক্ষণ ও নিয়মিত
পানি সরবরাহের পূর্ণ দায়িত্ব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের।
পানি একদিন পর পর দেওয়া হচ্ছে কেন, তা তারা ভালো জানে। ইউনিয়ন পরিষদের এখানে করার
কিছু নেই বা আমাদের কোনো নির্দেশনা এখানে কার্যকর হচ্ছে না।"
অভিযুক্ত টুঙ্গিপাড়া উপজেলা জনস্বাস্থ্য
প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী প্রদীপ মজুমদার বলেন, বিলের টাকা ব্যাংকে না
থাকা ও পানি সরবরাহের দায় চাপিয়েছেন গ্রাহকদের ও ইউনিয়ন পরিষদের ওপর। তিনি বলেন,
"বর্তমানে ব্যাংকে ৫ লাখ ৯ হাজার ৯২০ টাকা জমা আছে। সব গ্রাহক বিল না দেওয়ায়
টাকা কম। আর একদিন পর পর পানি দেওয়ার বিষয়টি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের নির্দেশনা
অনুযায়ী করা হচ্ছে।" তবে ২৪ লাখ টাকার গরমিলের বিষয়ে তিনি কোনো স্পষ্ট প্রমাণ
দিতে পারেননি।
এলাকাবাসীর দাবি, প্ল্যান্টটি উদ্বোধনের
পর থেকেই দুর্নীতির এই চক্র সক্রিয়। এই লুটপাটের সুষ্ঠু তদন্তে উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ
তদন্ত কমিটি গঠনের জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন গওহরডাঙ্গাবাসী।
বাংলাদেশের
খবর/এম.আর

