Logo

সারাদেশ

নৌকায় জন্ম, নৌকাতেই মৃত্যু ভাসমান জীবন

Icon

লালমোহন (ভোলা) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৯ এপ্রিল ২০২৬, ২১:১৭

নৌকায় জন্ম, নৌকাতেই মৃত্যু    ভাসমান জীবন

ভোলার লালমোহন উপজেলার বদরপুর খাল এলাকায় নদীর বুকজুড়ে ১৫/২০ ভাসমান নৌকা সারিবদ্ধভাবে নোঙর করে আছে।  দৃশ্যটি যে কোন পথচারীর দৃষ্টি আকর্ষন করবে। এই নৌকায় বসবাস করে জীবন নির্বাহ করে একটি সম্প্রদায়। যারা বেঁদে পরিবার হিসাবে পরিচিত।

এরা ভাসমান নৌকায় করে দেশের বিভিন্ন শহরে ঘুরে বেড়ায়। এই পরিবার গুলোর জীবনযাত্রা এক নির্মম চিত্র । প্রায় ২০টি পরিবার বছরের পর বছর ধরে নৌকাতেই ঘর বানিয়ে নিঃশব্দে বেঁচে আছেন অমানবিক দুঃখ কষ্ট সহ্য করে। নৌকার ভেতরই  চলছে তাদের রান্না, খাওয়া-দাওয়া, ঘুম, সন্তানদের হাসি- কান্না, খেলাধুলা, জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। এরা নিজেদের মধ্যে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। জীবন যেন নদীর স্রোতের মতো ভাসমান, অনিশ্চিত আর প্রতিনিয়ত ঝুঁকিপূর্ণ অমানবিক জীবনযাপন যাদের নিত্য দিনের সাথী।

জোয়ার-ভাটার সঙ্গে শুধু নদীর পানি নয়, বদলায় তাদের ভাগ্যও। একসময় সিংগা দিয়ে গ্রামের সহজ সরল মেয়ে মানুষের চিকিৎসা করে তার বিনিময়ে চাল, ডাল, তেল, লবন বা টাকা নিয়ে নৌকায় এসে রান্না করে স্বামীও সন্তান নিয়ে খাওয়া দাওয়া করত। আর বেঁদে পরিবারের পুরুষ সাপের খেলা দেখিয়ে তাবিজ বিক্রি করে সংসার চালাতো। এখন আর গ্রামে গ্রামে কেউ সিংগা দিয়ে চিকিৎসা করায় না এবং সাপের খেলাও কেউ দেখেনা, সাপ থেকে বাঁচতে কেউ আর তারিজ নেয় না। তাই তারা তাদের পুর্ব পুরুষের পেশা পরিবর্তন করে জীবিকার তাগিদে নানাবিধ পেশায় জড়াচ্ছে।

এখন এই বেঁদেরা জড়াচ্ছে মাছ ধরা পেশায়। তাও আবার কখনো মাছ পেলে দু’বেলা খাবার জোটে, কখনো খালি হাতে ফিরতে হয় তীরে। নদীভাঙন, দুর্যোগ, দারিদ্র্য , রোগ আর অবহেলা তাদের জীবনের  অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাড়িয়েছে। খালের এ অঞ্চলে বৃষ্টি হলে নৌকার মধ্যে পানি ঢুকে পড়ে , শীতে কাঁপতে হয়, গরমে দম বন্ধ হয়ে আসে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে  পড়ে নারী ও শিশুরা । একেক রাতে নদীর স্রোত এতটাই ভয়ংকর হয়ে ওঠে যে সারা রাত জেগে থাকতে হয় তাদের সকলকে।

নদীর জোয়ার-ভাটার সঙ্গে তাল মিলিয়েই ওঠানামা করে তাদের ভাগ্য। কখনও খাবার আছে, কখনও নেই। ঝড়-জলের ভয়, অভাবের সঙ্গে প্রতিদিন লড়াই করে এই মানুষগুলো । তাদের এক সদস্য সাহারা বেগম বলেন, “সকালে পান্তা ভাত খাইছি। রাতে আল্লাহ যদি খাওয়ায় তবেই খেতে পারবো। স্বামী-স্ত্রী দুইজনে নদীতে মাছ ধরি, কিন্তু সবসময়  মাছ পাই না।  আমাদের কোন স্থায়ী কোন ঘরবাড়ি নাই - মরলে কবর দেওয়ার মতো কোন জায়গাও আমাদের নাই। আমাদের সন্তানের জন্ম হয় নৌকাতে - আর মৃত্যুও হয়  নৌকাতে ”।

সরজমিনে গিয়ে জানা যায়, ঘরহারা মানুষগুলো বাধ্য হয়েই নৌকাকে স্থায়ী ঠিকানা করেছেন। গরমে দমবন্ধ হয়ে যাওয়া , বৃষ্টিতে পানিতে ভিজে যাওয়া , শীতে হাড়কাঁপানো  অসহনীয় ঠান্ডা, প্রতিটি ঋতুই যেন তাদের নতুন শত্রু। বয়স্ক সদস্য আলিম  উদ্দিন বলেন, “এই নদী আমাদের বন্ধু, এই নদী আবার আমাদের শত্রু। নদীর পাড়ে বাসা থেকে কাঁধে সাপের ঝুড়ি নিয়ে খেলা দেখাতে বের হই, কখনও কিছু টাকা পাই আবার কখনো খালি হাতে নৌকায় ফিরিয়ে আসি। শেষ ঠিকানা এবং সম্বল আমাদের নৌকা ছাড়া আমাদের আর কিছু নাই কোন জায়গা নাই । শিশুদের নৌকায় বই-খাতা নিয়ে লেখা পড়া করা অনেক কঠিন। আমাদের ভাসমান জীবন তাই স্কুলে ভর্তি করানোর কোন সুযোগ নাই।

সাধারণ জ্বর, সর্দি, ডায়রিয়া সবই বড় বিপদ হয়ে দাঁড়ায়। মধ্য বয়সী মোহাম্মদ মামুন  সরদার বলেন, সৃষ্টিকর্তা আমাদের এই জীবন দিয়েছে, এটাই আমাদের নিয়তী। “নদীতেই আমাদের  বাচ্চারা জন্ম নেয়, নদীতেই বড় হয়। সারা বছরই আমরা সংগ্রাম কার। শুধু বর্ষা এলে  কষ্ট আরও দ্বিগুণ বেড়ে  যায় ।

বিকে/মান্নান
Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন